বিশ্বের যে গুটিকয়েক দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, বাংলাদেশ তার অন্যতম। যে দেশ ছিল দুর্ভিক্ষ ও মঙ্গার দেশ হিসেবে পরিচিত, সে খাদ্যে এখন আর পরনির্ভর নয়। ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলায় এবং স্বাধীনতার পর ছিয়াত্তরে দুর্ভিক্ষের ধকল সইতে হয়েছে বাংলাদেশকে। সেই দেশ ইতিমধ্যে চাল উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থার ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০১৫’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনের বক্তব্য হলো, জাতিসংঘের সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্য (এমডিজি) পূরণের ক্ষেত্রে কৃষি ও খাদ্যে নিরাপত্তা অর্জনে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে সফল দেশ। এটা সম্ভব হয়েছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ফলে। আমাদের দেশটি আয়তনে ছোট, কিন্তু লোকসংখ্যা অত্যন্ত বেশি। তাছাড়া বন্যা-খরাসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই থাকে। এমন পরিস্থিতিতেও আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি এবং খাদ্য উত্পাদনে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলেছি। এটা আমাদের বিরাট অর্জন ও গৌরবের বিষয়।
১৯৭২ সালে দেশে খাদ্য উত্পাদন ছিল ১ কোটি ১০ লাখ মেট্রিক টন। সাড়ে সাত কোটি মানুষের জন্য তা পর্যাপ্ত ছিল না। গত ৪৮ বছরে একদিকে জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণেরও বেশি, আর আবাদি জমি কমেছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। অথচ দেশে এখন চাল উত্পাদিত হচ্ছে তিন গুণ বেশি। বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। এত মানুষের খাদ্যের জোগান দেওয়া সহজ কথা নয়। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে যাচ্ছেন এ দেশের কৃষক ও কৃষিবিজ্ঞানীরা। অতীতের তীব্র খাদ্যঘাটতির বাংলাদেশ বর্তমানে উদীয়মান অর্থনীতির নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। অতীতে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে খ্যাত বাংলাদেশ এখন উদ্বৃত্ত খাদ্যের দেশ। ধান উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে চতুর্থ। কৃষিতে এ দেশের সাফল্য আজ ঈর্ষণীয়। কৃষিজমি কমতে থাকা, জনসংখ্যা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বন্যা, খরা, লবণাক্ততার মতো নানা প্রাকৃতিক বৈরিতা মোকাবিলা করেও খাদ্যশস্য উত্পাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও দুর্যোগসহিষ্ণু শস্যের জাত উদ্ভাবনেও শীর্ষে রয়েছে এ দেশের নাম।
এ দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বা উদ্বৃত্ত উত্পাদন একদিনে অর্জিত হয়নি। এর পেছনে রয়েছে সরকারের কৃষিবান্ধব নীতি, ধানবিজ্ঞানীদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং কৃষকের নিরলস পরিশ্রম। ২০৩০-এ ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব বিনির্মাণে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশও নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের অন্যান্য সেক্টরের তুলনায় কৃষি এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। এসডিজিসহ ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ অর্জনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবং মাননীয় কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ড. আব্দুর রাজ্জাকের নিরলস প্রচেষ্টায় দেশ ইতিমধ্যেই দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। এ ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়সহ কৃষিবিদদের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
দুই যুগ আগেও দেশের অর্ধেক এলাকায় একটি এবং বাকি এলাকায় দুটি ফসল হতো। বর্তমানে দেশে বছরে গড়ে দুটি ফসল হচ্ছে। সরকারের যুগোপযোগী পরিকল্পনা, পরিশ্রমী কৃষক এবং মেধাবী কৃষি বিজ্ঞানী ও সম্প্রসারণবিদদের যৌথ প্রয়াসেই এসেছে এ সাফল্য। স্বাধীনতার পর দেশে প্রতি হেক্টর জমিতে দুই টন চাল উত্পাদিত হতো। এখন হেক্টরপ্রতি উত্পাদিত হচ্ছে চার টনেরও বেশি। ধান ধরে হিসাব করলে তা ছয় টন। খাদ্যশস্যে প্রতি হেক্টরে ১০ দশমিক ৩৪ টন উত্পাদন করে বাংলাদেশের ওপরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর বাংলাদেশের পরে রয়েছে আর্জেন্টিনা, চীন ও ব্রাজিল। এভাবেই প্রধান খাদ্যশস্যের উত্পাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশের তালিকায় উঠে এসেছে বাংলাদেশ।
আমন, আউশ ও বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলনে গত অর্থবছরে চালের উত্পাদন ছিল ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন। এতে খাদ্যশস্য উত্পাদনের রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। অন্যান্য খাদ্য মিলিয়ে উত্পাদনের পরিমাণ এখন পাঁচ কোটি মেট্রিক টনের বেশি। কৃষির এ সাফল্য সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
চীন বিশ্বে সবচেয়ে বেশি চাল উত্পাদন করে। বছরের পর বছর ধরে তারা রেকর্ডের জায়গাটি ধরে রেখেছে। তারা ১৪ কোটি ৮৮ লাখ ৭৩ হাজার টন চাল উত্পাদন করে। চীনের পরেই আছে ভারত। ভারতও জনসংখ্যার দিক থেকে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে, সেটা চাল উত্পাদনেও। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশটির চাল উত্পাদন ছিল ১১ কোটি ২৯ লাখ ১০ হাজার টন। তালিকার পরের দেশটি জনসংখ্যাবহুল একটি দেশ, ইন্দোনেশিয়া। অবশ্য জনসংখ্যার দিক থেকে চীন ও ভারতের চেয়ে অনেক পিছিয়ে, সেটা চাল উত্পাদনেও। ইন্দোনেশিয়ার মোট উত্পাদন ঐ দুই দেশের তুলনায় কম, ৪ কোটি ২০ লাখ টন। বাংলাদেশ ৩ কোটি ৮৬ লাখ টন চাল উত্পাদন করে বিশ্বে চতুর্থ স্থান দখল করেছে। চাল উত্পাদনের শীর্ষ দশের বাকি দেশগুলো হলো ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ফিলিপাইন, ব্রাজিল ও জাপান। উত্পাদনের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালে চালের উত্পাদন হবে ৪ কোটি ৭২ লাখ টন। বিপরীতে ২০৫০ সালে ২১ কোটি ৫৪ লাখ লোকের খাদ্যচাহিদা পূরণে চাল প্রয়োজন হবে ৪ কোটি ৪৬ লাখ টন। বিশ্বে গড় উত্পাদনশীলতা প্রায় তিন টন। বর্তমান সরকারের জনবান্ধব কৃষিনীতি ও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বিগত বছরগুলোয় চালের উত্পাদন ৩ দশমিক ৪ লাখ টন হারে বেড়েছে। ২৬ ডিসেম্বর ২০১৪ সালে শ্রীলংকায় প্রথমবারের মতো চাল রপ্তানির মাধ্যমে রপ্তানি শুরু করে সরকার। কৃষিবান্ধব নীতি প্রণয়ন ও সময়োপযোগী বিভিন্ন প্রযুক্তি ব্যবহার করায় দেশ খাদ্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ইতিমধ্যে একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলানোয় চাষের দিক থেকেও বিশ্বে পথিকৃত্ বলে বিবেচিত হচ্ছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বের জন্য উদাহরণ হিসেবে প্রচার করছে। চাল উত্পাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কৃষিতে বিজ্ঞানভিত্তিক নানা পদক্ষেপের কারণেই খাদ্য উত্পাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে পা রাখতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।
বর্তমান সরকারের সময় দফায় দফায় সারের দাম কমানো হয়েছে। সারকে কৃষকের জন্য সহজলভ্য করা হয়েছে। এ ছাড়া করা হয়েছে ১০ টাকার বিনিময়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা এবং সেচের পানির ভর্তুকির টাকা সরাসরি কৃষকের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফারের ব্যবস্থা। সেই সঙ্গে ১ কোটি ৮২ লাখ কৃষকের মাঝে উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। যুগান্তকারী এসব পদক্ষেপের ফলে কৃষিতে এসেছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। সরকার কৃষকদের সম্ভাব্য সব রকম উপকরণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের প্রবর্তিত কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড দেশ ও বিদেশে বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়েছে। বাংলাদেশের অনুসরণে ভারত সরকার কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে। কৃষি পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় বিনামূল্যে সার ও বীজ সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। আউশের প্রণোদনা প্যাকেজও অব্যাহত আছে। বিভিন্ন উদ্যোগ ও কার্যক্রমের ফলে বর্তমানে দেশের কৃষিজমি চাষাবাদের ক্ষেত্রে প্রায় ৯৫ পার্সেন্ট যান্ত্রিকীকরণ সম্ভব হয়েছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিশেষ কর্মসূচির আওতায় কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে ৫০-৭০ শতাংশ উন্নয়ন সহায়তা (ভর্তুকি) প্রদান করা হচ্ছে।
পৃথিবীর অনেক দেশের অধিবাসীরা বাংলাদেশের মতো তিন বেলা ভাত খেলেও তাদের মাথাপিছু দৈনিক চালের প্রয়োজন বাংলাদেশিদের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশের বেশি নয়। বাংলাদেশের মানুষের যেখানে মাথাপিছু দৈনিক চালের প্রয়োজন প্রায় ৭৫০ গ্রাম, সেখানে অন্যান্য দেশের মানুষের মাথাপিছু দৈনিক প্রয়োজন ২৫০ থেকে ৩০০ গ্রামের মতো। এর মূল কারণ ঐসব দেশের মানুষ ভাতের পাশাপাশি নানা ধরনের সহজলভ্য সম্পূরক খাদ্য প্রতিদিন কিছু কিছু করে কয়েকবার খেয়ে থাকে। এসব অল্প দামের সম্পূরক খাদ্যপণ্যের সরবরাহ সারা বছর ধরে যথেষ্ট পরিমাণে থাকে বলেই সবাই এগুলো খেতে পায়। দেখা যায়, সেসব দেশের মানুষেরা পুষ্টিহীনতার শিকারও হয় অনেক কম। সম্ভবত এককভাবে ভাতের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে মিশ্র খাদ্যে অভ্যস্ত হওয়াতেই বিভিন্ন খাদ্য থেকে পাওয়া পুষ্টি উপাদানের মাধ্যমে তাদের দেহের পুষ্টিচাহিদা পূরণ হয়। অনেকটা সুষম খাদ্য গ্রহণের মতোই। অথচ বাংলাদেশের অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত প্রায় শতভাগ মানুষই তাদের পুরো খাদ্যচাহিদা মেটায় ভাত দিয়েই। দেশের ক্রমবর্ধমান মানুষের টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা বিধানের তাগিদে ভাতের পাশাপাশি সম্পূরক খাদ্য যুক্ত হওয়া এখন সময়ের দাবি। কারণ, খাদ্যচাহিদা মেটানোর জন্য একমাত্র চালের ওপর যে চাপ এবং ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর চাহিদা মেটানোর জন্য যে বর্ধিত নির্ভরশীলতা সৃষ্টি হবে, তা একমাত্র চাল উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে মেটানো কখনোই সম্ভব হবে না।
খাদ্য উত্পাদনে বাংলাদেশের এ সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব এ দেশের কৃষকের। অথচ তারা উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। কৃষকদের উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্যের নিশ্চয়তা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। খাদ্য উত্পাদন বৃদ্ধির এই ধারাবাহিকতাকে টেকসই করার পাশাপাশি কৃষকদের উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও সরকারকে সচেষ্ট হতে হবে। কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি সরকারের ধান ক্রয় নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি খাদ্য গুদামের ধারণক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করতে হবে। সেই সঙ্গে এর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। রাইস মিলার, চাতাল কল মালিকদের আরো অধিক পরিমাণ ধান-চাল ক্রয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। উত্পাদন খরচ হ্রাসের জন্য বিভিন্ন কৃষি উপকরণে সরকারপ্রদত্ত ভর্তুকি ও উন্নয়ন সহায়তাকে আরো প্রসারিত করতে হবে। টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের বড়ো চ্যালেঞ্জ ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, ক্রম হ্রাসমান সম্পদ (কৃষিজমি, শ্রমিক, পানি ইত্যাদি) এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাত (বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা প্রভৃতি)। টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুচিন্তিত পরিকল্পনার বিকল্প নেই।
লেখক :ভাইস-চ্যান্সেলর, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
