ন দ - ন দী

নদীকে সম্মান দেখিয়ে স্বস্তিতে চলতে দিন

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৯:৪৬

বাংলাদেশকে নদীমাতৃক দেশ বলা হয়। অর্থাত্ নদীগুলোই এ দেশের জন্ম দিয়েছে। কথাটা অত্যন্ত সত্যি। ভূতাত্ত্বিক সময়ের স্কেলে বাংলাদেশের বয়স খুবই অল্প। যেখানে পুরনো মাটি আছে, যেমন বরেন্দ্র অঞ্চল কিংবা মধুপুর অঞ্চল—এগুলোর বয়স এক/দুই লক্ষ বছরের বেশি নয়। আর বাকি অংশ যেটা পলি দ্বারা গঠিত ফরিদপুর, বরিশাল, যশোর কিংবা নোয়াখালী—এগুলোর বয়স সাত হাজার থেকে ১০ হাজার বছরের বেশি নয়। অর্থাত্ পৃথিবীর সাড়ে তিনশ লক্ষ কোটি বছরের ইতিহাসে ১০ হাজার বছর কোনো সময়ই না। অতি সম্প্রতি পুরনো জমি যেখানে আছে যেমন নরসিংদী অঞ্চল, সেখানে আমরা সভ্যতার নিদর্শন পাচ্ছি—যেটা আড়াই থেকে তিন হাজার বছরের পুরনো। ওয়ারী-বটেশ্বরে। কাগজে দেখলাম রামুতে দেড় হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার চিহ্ন পাওয়া গেছে। কুমিল্লার লালমাই পাহাড় এলাকাতে ময়নামতি, এটাও পুরনো গঠন, এক-দেড় হাজার বছর আগের স্থাপনা। একই অবস্থা মহাস্থানগড় কিংবা পাহাড়পুরে। অর্থাত্ যে জমিগুলো অনেক পুরনো সেখানে হয়তো দু’হাজার, তিন হাজার, চার হাজার বছর আগে মানুষের বসতি হয়েছিল। আর বাকি অংশে বসতি হয়েছে বোধহয় আরো অনেক পরে। খুলনা অঞ্চলের একেবারে দক্ষিণে শ্যামনগর কিংবা কয়রা—এগুলোতে আমার ধারণা মানুষের ঘনবসতি স্থাপিত হয়েছে ষাটের দশকে। তার আগে সেখানে মানুষই ছিল না। সুন্দরবন একসময় কিছুটা উঁচু ছিল। সেখানে কিছু কিছু স্থাপনা ছিল। মূল কথা যেটা বলছি, এই যে বাংলার ডেল্টা বা বদ্বীপ, এটা গঠন হয়েছে গঙ্গা এবং ব্রহ্মপুত্র থেকে আসা পলি দিয়ে। ভারতের বিহার হয়ে রাজমহল হিলস-এর ভেতর দিয়ে গঙ্গা এসে হয়তো এখন থেকে লক্ষ বছর আগে দিনাজপুর-বগুড়া অংশে পড়ত। আর ব্রহ্মপুত্র আসামের ভেতর দিয়ে এসে এই একই জায়গায় যদি পড়ত ধরে নিই তাহলে বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃতি ছিল দিনাজপুর পর্যন্ত এবং এই দুই নদীর সঙ্গমস্থলে স্বাভাবিকভাবেই সুন্দরবনের মতো বন গড়ে উঠেছিল। এটা হচ্ছে আমার ব্যাখ্যা যে, দিনাজপুরে-বগুড়াতে প্রচুর কয়লা পাওয়া যাচ্ছে। যে প্রাকৃতিক বন গড়ে উঠেছিল, পরবর্তীকালে তা পলিচাপা পড়ে হয়তো কয়েক লক্ষ বছরে কয়লায় পরিণত হয়েছে। কিন্তু তারপর আস্তে আস্তে এই নদীগুলোর পলি জমা হতে হতে ধীরে ধীরে বঙ্গোপসাগর কিছুটা সরে গেছে এবং ভূমি গঠন হয়েছে। এই গঠনপ্রক্রিয়া কি সম্পন্ন হয়েছে? উত্তর হচ্ছে—না। আমরা আজও দেখি সন্দ্বীপ থেকে উড়িরচর উঁচু। উড়িরচর থেকে নোয়াখালীর লক্ষ্মীপুর এলাকা নিচু। কারণ লক্ষ্মীপুর এলাকা গঠন হতে হতে মানুষ চলে এসেছে। মানুষ বসতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য হয় ভিটা উঁচু করেছে, অথবা প্রবহমান নদীর পাশে বাধ নির্মাণ করেছে। একই অবস্থা যশোর খুলনা বরিশাল বরগুনা অঞ্চলে। 

মূল কথায় ফিরে যাই। একটা নদী শুধু পানি বহন করে না। পানি এবং সেডিমেন্ট বহন করে। আমি পলি শব্দটা ব্যবহার করছি না। কারণ পলির ইংরেজি হচ্ছে সিলট। একটা নদীর তলদেশে নুড়ি পাথর, মোটা বালু, চিকন বালু, পলি এবং কাদামাটি সবই প্রবাহিত হয়। কিছুটা তলদেশ দিয়ে প্রবাহিত হয়, কিছুটা একটু ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। আর কাদামাটি কলয়ডাল পার্টিক্যাল হিসেবে পানিকে ঘোলা করে। কিন্তু সবই নদীর প্রবাহের একটা অংশ। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে, একটি নদীর অবয়ব পুরোপুরি নির্ভর করে পানি এবং সেডিমেন্টের কম্বিনেশনের ওপর।

এখানে দুটি বিষয় আছে। আমি যখন নদীর অবয়বের কথা বলছি তখন নদীর প্রশস্ততা, গভীরতা এবং নদীর প্রবাহের ঢালের কথা বলছি। নদীতে যদি প্রবাহ বাড়ে তাহলে নদীর প্রশস্ততা বাড়বে। একই সঙ্গে নদীর গভীরতা বাড়বে। ঢালটা অ্যাডজাস্ট হবে। অনেক সময় ঢালু অংশ কমানোর জন্য সোজা নদী আঁকাবাঁকা হতে থাকে। নদী যত আঁকাবাঁকা হবে তত তার ঢালটা কমে যাবে। নদী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করার জন্যই কিন্তু এ কাজটা করে থাকে। একইভাবে সেডিমেন্টও কিন্তু এই প্রভাবটা রাখে। পানির প্রবাহ বছরের একসময় বেশি থাকে আরেক সময় কমে যায়, ঠিক একইভাবে সেডিমেন্টের পরিমাণও কমবেশি হয়। এই কমবেশি হওয়াটা নদীর গতি এবং প্রকৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। সরলকৃত নদী হতে পারে আঁকাবাঁকা নদী হতে পারে। নদীতে প্রচুর চর পড়ে বিনুনিযুক্ত নদী হতে পারে। নদীর আরো প্রকারভেদ আছে। সাধারণ পাঠককে আমি নদী বিজ্ঞানের জটিলতায় ঢুকাতে চাই না। কিন্তু যতটুকু সাধারণভাবে না বুঝলেই নয় ততটুকু বলতেই হবে। আমি খুব লজ্জার সঙ্গে লক্ষ করি, বাংলাদেশের পানি প্রকৌশলীরা, কিংবা পানি নিয়ে যারা কথা বলেন, এমনকি নদী নিয়ে যারা হৈচৈ করেন তারাও বুঝতে চান না যে, নদীতে সেডিমেন্ট লোড আছে এবং নদীর গতি-প্রকৃতিতে তার প্রভাব আছে।

যে নদীতে জোয়ারভাটা নেই অর্থাত্ একমুখী প্রবাহ, উজান থেকে ভাটিতে পানি যাচ্ছে সেখানে নদীর আকৃতি পুরোপুরি নির্ভর করে প্রবাহ ও সেডিমেন্টের পরিমাণের ওপর। আর যেখানে জোয়ারভাটার ব্যাপার আছে, সেখানে বিষয়টা আরো জটিল। কারণ সেক্ষেত্রে কিছু সেডিমেন্ট শুধু উজান থেকে আসে না, ভাটার সময় ভাটি থেকেও আসে। এই বিষয়টা বুঝতে হবে। এখন যারা নদী নিয়ে কাজ করেন, তাদের একটা গ্রুপের কমপ্লেইন হচ্ছে নদী ভাঙছে। সেই ভাঙন থেকে রক্ষা করতে হবে। আমার বক্তব্য হচ্ছে অবশ্যই ভাঙন রক্ষা করতে হবে। কাজেই নদী ব্যাবস্থাপনা করতে গেলে প্রবাহের পরিমাণ যেমন জানা দরকার তেমনি সেডিমেন্টের গুণাগুন, অর্থাত্ সেডিমেন্টের সাইজ ও পরিমাণ দুটোই।

নদীর গতি-প্রকৃতি ঠিক হয় বর্ষাকালে আর বর্ষার পর পর। বর্ষাকালে যখন প্রধান প্রবাহটা প্রবাহিত হয় তখন পানি ও সেডিমেন্টের পরিমাণ অনেক। বর্ষার শেষে যখন শরত্-হেমন্তে পানি নেমে শীত-বসন্তে শান্ত নদীটি—হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান আছে পটে আঁকা ছবিটি। তখন কিন্তু সেডিমেন্টের পরিমাণ এবং সেডিমেন্ট বহনের ক্ষমতাও কমে যায়। তখন নদীতে আবার পলি জমা হতে থাকে। একটা মজার প্রশ্ন করি। শীতকালে একটা নদীতে গেলাম। নদী প্রবাহ বহতা। পানির স্তর দেখলাম। পানির তলদেশটাও দেখলাম। ধরা যাক ৫ ফুট/ ১০ ফুট বা ১৫ ফুট গভীরতা পেলাম। বর্ষাকালে উজান থেকে যখন পানি নেমে এল পানির যে স্তর ছিল সেটি ১০ ফুট বেড়ে গেল। নদীটির গভীরতা যদি ৫ ফুট থেকে থাকে, পানির স্তর ১০ ফুট বেড়েছে। তাহলে গভীরতা কি ১৫ ফুট? উত্তর হচ্ছে—না। যিনি নদীর সাথে পরিচিত তিনি বলবেন যে, পানির প্রবাহ বেড়ে স্তর যখন ওপরে উঠেছে তখন নদীর তলদেশও নিচে নেমে গেছে। অর্থাত্ নদীর প্রবাহের পরিমাণ বাড়ার সাথে সাথে নদীর গভীরতা বেড়েছে। আর যদি নদীর দুই পাড়ে নরম মাটি থাকে, তাহলে পাড় ভাঙতে পারে। অনেক সময় দেখা যায় নদীর দুই পাড় খাড়া ছিল, তখন নদী পাড়ে গর্ত করে ভেতরে ঢুকে যায় এবং ওপর থেকে মাটিটা ধসে পড়ে। এজন্য নদীর ভাঙন বর্ষার শুরুতে হয়। কিন্তু বর্ষার পরে আরেকটু বেশি হয়। তাহলে যে নদীটা ৫ ফুট গভীরতায় তখন যদি ১০ ফুট পানির প্রবাহ বাড়ে তখন নদীর গভীরতা ১৫ ফুটের পরিবর্তে ২০ ফুট কিংবা ২২ ফুট হয়ে গেল। তলদেশ নিচে চলে গেল। অর্থাত্ তলদেশ নদীকে সেডিমেন্ট সরবরাহ করছে। বর্ষার পরে পানি কমে যখন আবার ৫ ফুটের স্তরে এল তখন তলদেশ ওপরে উঠে আসে। অর্থাত্ তলদেশের একটা এক্টিভিটি আছে। নদীর ধর্ম, নদীর সেডিমেন্ট, মুভমেন্ট, নদীর পানির প্রবাহ, সেডিমেন্টের সাইজ, আকৃতি এগুলোকে পুরোপুরি না বুঝে নদীতে হাত দিলে নদীর যে স্বাভাবিক স্টিবিলিটি ছিল সেটা নষ্ট হবে।

নদীতে শুধু পানি থাকে না, এর ভেতরে একধরনের প্রাকৃতিক জীবন আছে। নদীতে মাছ, কচ্ছপ, সাপ, ব্যাঙ, পোকামাকড় ও বিভিন্ন ধরনের অণুজীব সবকিছু মিলে কিন্তু একটা জগত্ তৈরি হয়। এই জগেক বুঝতে হলে বর্ষাকালের নদী আর শুকনাকালে নদীর জীবনকে বোঝা দরকার। বর্ষার একেবারে প্রথমে যখন প্রথম কালবৈশাখীতে সৃষ্ট ঢল আসে তখন মাছ উজানে ছোটে। স্রোতের উল্টাদিকে ছুটে যায়। এই উজানে যাওয়ার ব্যাপারটি হচ্ছে—মাছ প্রজননের জন্য অগভীর নদীতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। এর কিছুদিন পর দ্বিতীয়বার ঢল যখন আসে তখন মাছ পোনা ছাড়ে। গ্রামের লোক বলে নতুন পানি। অর্থাত্ নতুন যে পানি নামবে এতে অক্সিজেনের পরিমাণ বেশি থাকে। সেখানে মাছ পোনা ছাড়ে। পোনা ছাড়ার পরে দুয়েকটি প্রজাতি ছাড়া কোনো মাছ আর পোনার খবর নেয় না। পোনাগুলো স্রোতের সঙ্গে ভাসতে ভাসতে ভাটিতে আসে। নদীকে কেটে সোজা করে দিলে স্রোতের পরিমাণ বাড়বে। এতে করে পোনাগুলোর প্রাকৃতিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। মাছ কোথায় পোনা ছাড়বে যারা প্রকৃত মত্স্য বিশেষজ্ঞ তারা বুঝতে পারে। একইভাবে নদীর বাঁকে বিভিন্ন জায়গায়; গ্রামে যেখানে দহ বলা হয়, দুয়ারও বলা হয়, সেগুলো একেকটা মাছের আলাদা আলাদা আবাসস্থল। সুনামগঞ্জে আলমের দুয়ার বলে একটা জায়গা আছে, এটা চিতলমাছের ঘাঁটি। রাজশাহীতে মহানন্দা যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে বোধহয় পাঙ্গাস মাছের ঘাঁটি। আবার যে নদীতে অনেক চর আছে, চরটার দুই পাশ দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে চরের একটু ভাটিতে একটা গর্তের মতো সৃষ্টি হয়। সিরাজগঞ্জ এলাকায় এগুলোকে বলে কোল। ওই কোলগুলোতেই মাছের ঘাঁটি থাকে। আবার বর্ষার সময় পোনা মাছটা যখন উজান থেকে ভাসতে ভাসতে আসছে তখন সে প্লাবনভূমিতে প্রবেশ করে। আমরা দ্বিতীয় যে ক্ষতির কাজটা করেছি, সেটা হচ্ছে নদীর সঙ্গে প্লাবনভূমির সংযোগগুলো পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছি।

১৯৮৭-৮৮’র বন্যার পরে ‘ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান’ নামে প্রকল্পটি যখন হাতে নেওয়া হয় তখন আমরা চেষ্টা করেছিলাম যে, বন্যা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নদীর দুই পাড়ে বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু প্লাবনভূমির সঙ্গে নদীর সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া ঠিক হবে না। টাঙ্গাইল এলাকায় এক্সপেরিমেন্ট করার কথা ছিল। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীরা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান না বুঝে পুরো প্রকল্পটার কনসেপ্ট নষ্ট করে দিয়েছে। অল্প পরিমাণ পানি প্লাবনভূমিতে ভালো। অর্থাত্ ভালো পানিটা যেন প্লাবনভূমিতে থাকতে পারে যখন তার মাত্রা বেড়ে গিয়ে ক্ষতির কারণ ঘটাতে পারে, তখন যেন বন্ধ করে দেওয়া যায়, সেই ব্যবস্থাটার কথাই বলা হয়েছিল।

আবার মূল কথায় ফিরে যাই, নদীমাতৃক দেশে নদী কর্তৃক প্রবাহিত পলি বর্ষার সময় প্লাবনভূমিতে জমা হয়ে আস্তে আস্তে জমি গঠন করেছে। এবং একটু বড়ো নদী হলে একেক জায়গায় একেক বছর জমি গঠন করেছে। যে কারণে ভূগর্ভস্থ মাটির গঠনও আলাদা। অর্থাত্ ভূগর্ভস্থ পানি নিয়ে কাজ করলেও নদীর গতি-প্রকৃতি বুঝতে হবে।

এখন আসি আরেকটা কথায়, নদীগুলো দখল হয়ে যাচ্ছে। কেন? উত্তর খুব সোজা—জনসংখ্যা বাড়ছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন বিদায় হলো তখন লোক ছিল চার কোটি। একাত্তরে যখন পাকিস্তানিরা বিদায় হলো তখন সাড়ে সাত কোটি। আজকে সাতচল্লিশের তুলনায় বোধহয় প্রায় পাঁচগুণ জনসংখ্যা। ১৮ কোটি লোকসংখ্যা তো বটেই, হয়তো আরো বেশি হতে পারে। চার কোটির লোকের দেশে দুইশ বছর আগে হয়তো দুই কোটি ছিল। তাহলে দুই কোটির দেশ যদি আমার আজকের বাংলাদেশ হতো তাহলে তো নদীকে কোনোভাবে আক্রমণ করা দরকার ছিল না। বন্যায় প্লাবনভূমি ডুবে যাবে। আমরা শীতকালে ফসল ফলাব। বর্ষাকালে যে আমন ধান হয় যেটা পানির সাথে সাথে বাড়তে পারে, অর্থাত্ ডিপ ওয়াটার ভেরাইটি রাইস। বাংলায় বলি জলিধান বা জলার ধান। তখন তো উচ্চ ফলনশীল ধানের দরকার হতো না। আর মানুষ নদী থেকে দূরে থাকত। নদীর কাছে আসত গোসল করতে, মাছ ধরার জন্য আসত। কিন্তু একেবারে নদীর পাড়ে বসতি করত না। আজকে যারা নদীর পাড়ে বসত করে তারা সবসময় আতঙ্কে থাকে এই বুঝি নদী ভাঙল।

নদী ভাঙবে এটাই স্বাভাবিক। আমি যদি ছোট চার/পাঁচ বছরের একটা বাচ্চাকে দেখি ঝিম মেরে বসে আছে, সে দুষ্টুমি করছে না, দৌড়াদৌড়ি করছে না—বুঝতে হবে বাচ্চাটা অসুস্থ। যে নদীর পাড় ভাঙে না সে ওই অসুস্থ বাচ্চার মতো ঝিম মেরে আছে। নদীর পাড় ভাঙতে হবে। তলদেশ ক্ষয় হবে, সেডিমেন্টের উত্পত্তি হবে। উজান থেকে সেডিমেন্ট আসবে। সবকিছু মিলেয়ে একটা ব্যালেন্স সিস্টেম আছে। হ্যাঁ, সেই নদী ভাঙে না যে নদীর দুই পাড় শক্ত মাটি দিয়ে গঠিত। যেমন বরেন্দ্র অঞ্চলের নদীপাড় ভাঙে না। কিন্তু যেখানে নরম সেডিমেন্ট দ্বারা গঠিত সেখানে নদী ভাঙবেই। কারণ বর্ষাকালে যখন পানির প্রচণ্ড চাপ আসে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় পাক খেয়ে খেয়ে পানি আসার কারণে পাড় ভাঙবে।

আমি আমার কথাগুলোকে গুছিয়ে বলি। নদীর প্রবাহ এবং সেডিমেন্টের সম্মিলিত প্রভাব পড়ে নদীর অবয়বের ওপর। তার গতি-প্রকৃতির সাথে তার আকৃতির সাথে। এখন থেকে ৫০ বছর আগে নদীর সেডিমেন্ট মাপার কাজ করা হতো। আমি অত্যন্ত লজ্জিত যে, নদীর সেডিমেন্ট মাপার যে প্রচেষ্টা ছিল সেটা এখন বহু জায়গায় বন্ধ হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে শুনেছি অর্থের অভাবে এই কাজটি বন্ধ করা হয়েছে। কয়েক লক্ষ টাকার ব্যাপার। যখন কোনো নতুন মন্ত্রী এসেছেন, কোনো নতুন সচিব এসেছেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিজির পরিবর্তন হয়েছে, আমি সকলের কাছে বিনীতভাবে বলেছি সেডিমেন্টের বিষয়টি বুঝতে চেষ্টা করুন। সেডিমেন্ট মাপার যে কর্মকাণ্ড ছিল সেটাকে পুনরুজ্জীবিত করুন। আমি পানি-সম্পদ মন্ত্রণালয়কে বলেছিলাম, সেডিমেন্টর বিষয়টা ইগনোর করেন না’। হয়তো তিনি চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের নড়াতে পারেননি। আজকে এই লেখার মাধ্যমে একই আপিল করছি। হার্ডিঞ্জ ব্রিজে হয়তো সেডিমেন্টের পরিমাণ মাপা হয়। বাহাদুরাবাদে সেডিমেন্ট মাপার যে কাজটি হতো, সেটাকে অবিলম্বে চালু করা উচিত। ভৈরববাজারে সেডিমেন্ট মাপার কাজটি পুনরুজ্জীবিত করা উচিত। মাঝে মাঝে সম্ভব হলে চাঁদপুরে এই কাজটি করা উচিত। অন্যথায় বাংলাদেশের নদীগুলোর পরিকল্পনা কোনো কাজে আসবে না। নদী ভাঙবে। ভাঙার কাজটি স্বাভাবিক। কাজেই নদীর এই স্বাভাবিক ধর্মকে যদি মানুষের প্রয়োজনে প্রতিহত করতে হয় তা করতে হবে। কারণ মানুষ তো আগে। কিন্তু যতদূর সম্ভব নদীর চাহিদাটাকে বুঝে ভাঙন আমরা ঠেকাই এবং নদীর শক্তিটাকে সমীহ করি যেটা আজকাল করা হয় না, তাহলে নদী ভাঙনের ঠেকানোর কাজটা সম্ভব হবে।

 

লেখক :পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ

 

অনুলিখন : সোহরাব শান্ত