আমাদের দেশে জনসংখ্যার তুলনায় যোগাযোগ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। ঢাকাসহ অন্যান্য বড়ো শহরের সড়ক এবং মহাসড়ক মিলিয়েও পর্যাপ্ত রাস্তা আছে বলা যাবে না। বিশেষ করে ঢাকা শহরের কথা যদি বলি, রাস্তার খামতি আছে। কোনো শহরের মোট আয়তনের ১৫ পার্সেন্ট সড়ক ব্যবস্থা (রোড নেটওয়ার্ক) থাকলে সেটাকে আমরা চলনসই বলতে পারি। আদর্শ শহর হতে গেলে মোট আয়তনের ২০ পার্সেন্ট সড়ক থাকতে হয়। ঢাকা শহরে সড়ক আছে মাত্র ৮ পার্সেন্ট। সেই ৮ পার্সেন্টও আমরা ইফেকটিভলি ব্যবহার করতে পারছি না। যে কারণে ঢাকা শহরে অসহনীয় যানজট (টেকনিক্যাল ভাষায় ‘কনজেশন’) লেগে থাকে। অন্যান্য দেশের তুলনায় যদি বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থার তুলনা করি, প্রতি ১ হাজার জনসংখ্যার জন্য যত মিটার সড়ক থাকার প্রয়োজন—বাংলাদেশ তারচেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। সে কারণে আমাদের দেশের সড়কে বিশৃঙ্খলা সবসময়ই পরিলক্ষিত হয়। একই সঙ্গে এ কারণে সড়কের দুর্ঘটনার হারও অনেক বেশি।
ঢাকা শহরের যে রোড নেটওয়ার্ক আছে এর ২০ পার্সেন্ট আমরা ব্যবহারই করতে পারছি না। ২০০৭-০৮ সালে করা আমার এক গবেষণায় দেখেছি, শহরাঞ্চলে প্রচুর নির্মাণ কাজ চলে। কনস্ট্রাকশনের মেটেরিয়ালসগুলো রাস্তার উপরে রাখা হচ্ছে। কোথাও কোথাও ফুটপাতসহ রাস্তাও অবৈধভাবে দখল হয়ে আছে। সেখানে অস্থায়ী দোকানপাটও আছে। কোথাও রাস্তার উপর অবৈধ পার্কিংয়ের ব্যবস্থা। এমন নানা কারণে আমাদের ঢাকা শহরের সড়কের ২০ পার্সেন্ট অব্যবহূত থাকে। এর ফলে কনজেশন বা যানজটের প্রকটতা বাড়ছে।
ঢাকা শহরের ক্ষেত্রে যদি আমরা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করতে চাই, তাহলে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। বর্তমানে গণপরিবহন ব্যবস্থা যেভাবে চলছে, তাতে নৈরাজ্য দিনে দিনে বাড়ছে। কারণ বাসের মালিকরা চালকদের কাছে চুক্তিতে বাস প্রতিদিনের জন্য দিয়ে দেয়। এর ফলে চালকদের মধ্যে সবসময় একটা প্রতিযোগিতার মনোভাব থাকে। কাজেই তার যে টার্গেট রয়েছে—সেই টার্গেটটা তাকে ফুলফিল করতে হয়। সেই প্রতিযোগিতার মনোভাব থেকেই কিন্তু অনেক সময় সড়কে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সেই বেপরোয়া মনোভাব থেকে অনেক সময় মারাত্মক দুর্ঘটনাও ঢাকা শহরে ঘটে, যার উদাহরণ আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখেছি। এই নৈরাজ্য যদি দূর করতে চাই, তাহলে রোড ফ্রাঞ্চাইজ বা কোম্পানিভিত্তিক সলিউশনে যেতে হবে। তাহলে এই নৈরাজ্য অনেকাংশে দূর হবে এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। ঢাকা শহরের প্রায় ৪০ পার্সেন্ট-এর বেশি ট্রিপ হয় পায়ে হেঁটে, পথচারীরা হেঁটেই পার হন। পথচারীবান্ধব পরিবেশ যদি আমরা করে দিতে পারি, তাহলে এক-দুই কিলোমিটারের যে দূরত্ব সেটা মানুষ হেঁটে চলে যেতে পারবে। তার জন্য মানুষকে নিরবচ্ছিন্ন ফুটপাত দিতে হবে। ফুটপাতের পরিবেশটা ভালো রাখতে হবে। নিরাপত্তার বিষয়টিও দেখতে হবে। বিশেষ করে রাতে পর্যাপ্ত স্ট্রিট লাইট থাকতে হবে, যেন পথচারীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারেন। একইসঙ্গে আমাদের এসটিপি’র (স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্টেশন প্ল্যান) যে সুপারিশগুলো রয়েছে, বিআরটি বা এমআরটি করার, সেগুলো যত দ্রুত সম্ভব করে ফেলতে পারলে ঢাকা শহরের অসহনীয় যানজট ও নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মিলবে।
ঢাকা শহরকে ৬টি রুটে ভাগ করে কোম্পানিভিত্তিক বাস চলাচলের ব্যাপারে আগে থেকেই একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া আছে। সেটার জন্য বড় যে সমস্যা; মালিকদের কাছ থেকে সেরকম সহায়তা পাওয়া যায়নি বলেই এই পরিকল্পনাটা বাস্তবায়ন করা যাচ্ছিল না। মালিকরা আসলে কী কারণে রাজি হচ্ছিল না, সেটা বোধগম্য নয়। কোম্পানিভিত্তিক বাস চালানো হলে মালিকদের যে আয়, সেটি কিন্তু অনেকাংশে বাড়বে। আমরা যদি মুম্বাই আর ঢাকা শহরের বাস চলাচল ব্যবস্থার তুলনা করি—মুম্বাইয়ে প্রতিটি বাস প্রতিদিন ১,৩০০ করে যাত্রী পরিবহন করতে পারে। সেখানে ঢাকা শহরে পারছে মাত্র ৫০০ জন। কোম্পানিভিত্তিক সিস্টেমে গিয়ে সেই ক্যাপাসিটি বাড়িয়ে তোলা যায়। এতে বাস মালিকদের আয় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে বা তার বেশিও হতে পারে। কারণ বাসের টাইমিং মেইনটেইন করা সম্ভব হবে। এখন যেখানে তারা প্রতিদিন তিনটি ট্রিপ দিচ্ছে, সেখানে ৫ থেকে ৬টি ট্রিপ দিতে পারবে। স্বাভাবিকভাবেই আয় বাড়বে। ৬ কোম্পানির অধীনে বাস চলাচলের যে সিদ্ধান্ত—এটা ঢাকার সড়ক শৃঙ্খলায় ভালো প্রভাব ফেলবে।
ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে পথচারীদের কারণে। ঢাকা শহরে প্রায় ৫৮ পার্সেন্ট দুর্ঘটনার শিকার হন পথচারীরা। তার মানে সড়ক দুর্ঘটনায় পথচারীদেরও কমবেশি দায় রয়েছে। আমরা যদি পথচারীদের সতর্ক করতে পারি এবং তাদের জন্য নিরাপদ ফুটপাত, জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস এগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি করতে পারি তাহলে ৫৮ পার্সেন্ট দুর্ঘটনা অনেকাংশেই কমে যাবে।
দেশের মহাসড়কগুলোর মূল ৬টি উপাদান রয়েছে। সড়ক, গাড়ি, চালক, গাড়ির নির্দিষ্ট গতি, যাত্রী-পথচারী ও সড়কের পরিবেশ—এই ৬টির কম্বিনেশন। ৬টি উপাদানের একটি বা দুইটির যখন ত্রুটি থাকে তখনই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। দুর্ঘটনা চালকের কারণে ঘটতে পারে। রাস্তার ত্রুটির কারণে ঘটতে পারে। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে ঘটতে পারে। গাড়ি ফিট না থাকলে ঘটতে পারে। যদি মহাসড়কের পরিবেশ ভালো না থাকে, তাতেও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে যদি আমরা আদর্শ মহাসড়ক ডিজাইন করি, চালক যদি প্রপার লাইসেন্স নিয়ে সুস্থ মনমানসিকতায় গাড়ি চালায়, পথচারীরা নিয়ম-কানুন মেনে চলেন তাহলে দুর্ঘটনা ঘটবে না। আমাদের দেশে মহাসড়কে প্রধান দুর্ঘটনা ঘটে মূলত মুখোমুখি সংঘর্ষে। এই মুখোমুখি সংঘর্ষ আমরা দূর করতে পারি সব মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করে এবং সড়ক বিভাজক (ডিভাইডার) তৈরি করে। মহাসড়কগুলোতে দ্রুত গতির গাড়ি এবং স্লো মুভিং (কম গতির) স্থানীয় বা লোকাল গাড়ি একই লেনে চলতে দেখা যায়। এটিও কিন্তু দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। আমরা যদি লোকাল গাড়ির জন্য আলাদা লেন (সার্ভিস লেন) করে দিতে পারি, তাহলে গতির পার্থক্যজনিত কারণে যে দুর্ঘটনা, সেটি কমে যাবে। শুধু ডিভাইডারসহ চার লেনের মহাসড়ক এবং সার্ভি লেন করে ৮০ পার্সেন্ট দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব।
সড়ক শৃঙ্খলায় সুবিধা আনতে পারে শহরের বিকেন্দ্রীকরণ। এটা তখনই ফলপ্রসূ হবে যখন যোগাযোগ ব্যবস্থাটা সহজ হবে। যেহেতু আমাদের অনেকের জীবিকা ঢাকা শহরকেন্দ্রিক, সে কারণে আমরা ঢাকা শহরে থাকতে চাই। অন্যান্য শহরের তুলনায় ঢাকা শহরে বেশি মানুষ আসার কারণে এই শহরের যে ধারণক্ষমতা তার কয়েকগুণ লোক এখানে বসবাস করছে। এর প্রভাব যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সবকিছুতেই পড়ছে। আমরা যদি ঢাকা শহরের সঙ্গে আমাদের অন্যান্য বড়ো শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাটা এমনভাবে করে ফেলতে পারি; অন্যান্য শহর থেকে ঢাকায় এক থেকে দেড় ঘণ্টার মধ্যে চলে আসা যায়, তাহলে ঢাকা শহরে থাকার জন্য মানুষের যে প্রবণতা; সেটা কমে আসবে। বাইরের দেশে আমরা দেখি—যেখানে কর্মস্থল এবং বাসস্থান কিন্তু অনেক দূরে দূরে। এক-দেড় ঘণ্টার জার্নি করে মানুষ তার কর্মস্থলে যান। যারা ময়মনসিংহে আছেন, নারায়ণগঞ্জ আছেন বা নরসিংদীতে আছেন, তারা যদি ঢাকা শহরে ৩০-৪০ মিনিটের মধ্যে চলে আসতে পারেন, এরকম ব্যবস্থা উন্নীত হলে ঢাকা শহরে মানুষ থাকার প্রবণতা অনেকাংশে কমে যাবে।
বিকেন্দ্রীকরণ ফলপ্রসূ করতে শুধু সড়ক যোগাযোগ নয়, রেলপথের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে অনেকগুলো বছর রেল ব্যবস্থা অবহেলায় ছিল। ২০০৮-০৯-এর পরে থেকে; বিশেষ করে যখন আলাদা রেল মন্ত্রণালয় করা হলো, তখন থেকে রেলের প্রতি একটু নজর দেওয়া হয়েছে। রেলের বাজেটও বাড়ছে। রেলের সিঙ্গেল লাইনগুলো ডবল লাইনে উন্নীত করার কাজ চলছে। এ কাজগুলো যখন কমপ্লিট হয়ে যাবে তখন আমার ধারণা যে—আমরা রেলের সুফলটা আরও ভালোভাবে পাব।
ঢাকা শহর নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রায়ই নেতিবাচক খবর আসতে দেখা যায়। এর মূল কারণ ঢাকা শহরের যে ক্যাপাসিটি এর চেয়ে কয়েকগুণ বেশি জনসংখ্যা এই শহরে রয়েছে। এই কারণেই কিন্তু নাগরিক সেবাগুলো ওইভাবে দেওয়া যাচ্ছে না। ২০-২৫ লাখ লোকের সেবা দেওয়ার জন্য যে প্ল্যান বা ক্যাপাসিটি আছে, সেখানে যদি দেড় কোটি বা দুই কোটি লোক চলে আসে, তখন সেভাবে সেবা দেওয়া যায় না। যে কারণে আমরা বারবার বলছি যে, বিভিন্ন শহর থেকে মানুষের ঢাকা শহরে আসার যে স্রোত, সেটা বন্ধ করতে হবে। তা করার একমাত্র উপায় হলো যোগাযোগ ব্যবস্থাটা খুব ভালো করে দেওয়া। ঢাকা থেকে দেশের সবচেয়ে দূরের শহরটি হয়তো চারশ কিলোমিটার দূরত্বের। যদি দ্রুত গতির (হাই স্পিড) ট্রেন হয়, সেই চারশ কিলোমিটার আসতে দুই-আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় লাগবে না। কাছাকাছি শহর যেগুলো আছে দেড়শ-দুশো কিলোমিটারের দূরত্বে, সেগুলো থেকে দেড়-দুই ঘণ্টার মধ্যে ঢাকায় চলে আসা খুব সহজ। আমরা যদি ঢাকার সঙ্গে সব বিভাগীয় শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক করে দিতে পারি, তবেই ঢাকায় মানুষের আসার স্রোত রোধ করা যাবে। ঢাকা শহরে নাগরিক সুযোগ-সুবিধাও অনেকাংশে বাড়বে। ঈদের সময় ঢাকায় যে জনসংখ্যা থাকে—সেটাই কিন্তু ঢাকা শহরের আদর্শ জনসংখ্যা। তখন ১৫ থেকে ২০ বা ৩০ লাখ লোক ঢাকা শহরে থাকে। রাস্তায় বেরোলে এতটা জ্যাম বা কনজেশন পাওয়া যায় না। সবকিছুতেই ভালো পরিবেশ লক্ষ করা যায়। যখন সবাই তাদের ঈদের ছুটি কাটিয়ে চলে আসে তখন ঢাকা আগের অবস্থায় ফিরে যায়। সবকিছুরই একটা ক্যাপাসিটি থাকে। ঢাকা শহরের এখন যে জনসংখ্যা এটা ক্যাপাসিটির তুলনায় অনেক বেশি। বিকেন্দ্রীকরণ করে এটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ঢাকা নিয়ে নেতিবাচক খবর শুনতে হবে অনেকদিন।
২০২৪ সালের মধ্যে আমরা বিশ্বে উন্নত দেশ হিসাবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব—সেই স্বপ্ন আমরা দেখছি। কিন্তু একটা উন্নত দেশে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য আমাদের যে আধুনিক রোড নেটওয়ার্ক বা পর্যাপ্ত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা উচিত, সেটার দিক দিয়ে এখনও কিন্ত আমরা অনেকটা পিছিয়ে আছি। সেই যোগাযোগ ব্যবস্থা শুধু বাড়ানোয় নয়, আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় যদি আমরা যেতে না পারি তাহলে ২০২৪ সালে উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন কষ্টকর হতে পারে। বিদ্যুতে আমরা স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। বিদ্যুতে উন্নত হওয়ার অর্থই হলো আরও বেশি কল-কারখানা গড়ে উঠবে। সেখান থেকে যে প্রোডাকশন হবে, সেগুলো মার্কেটে ডিস্ট্রিবিউশন হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সড়ক যোগাযোগ না থাকলে সেই সুফলটা আমরা পাব না। তাই আধুনিক ও উন্নত সড়ক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে সরকারের আরও কাজ করার সুযোগ আছে।
লেখক :অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)
পরিচালক, এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট
অনুলিখন : সোহরাব শান্ত
