ফিরে দেখা ২ ০ ১ ৮

বছরজুড়ে প্রযুক্তি খাত :দেশেই তৈরি হচ্ছে মোবাইল

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ২০:৩২

তথ্যপ্রযুক্তির এই সময়ে সারাবিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এগিয়ে চলছে। এই খাতের সাথে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে দেশীয় অর্থনীতির বৃহত্তম খাতে পরিণত হবে তথ্যপ্রযুক্তি। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণার বাস্তবায়নে গৃহীত বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে আরও বেগবান করেছে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। সেইসাথে ব্যক্তিগত বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ তো রয়েছেই। সবমিলিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অগ্রসরমান বাংলাদেশেরএগিয়ে যাওয়ার সয়য় খারাপ কাটেনি। ২০১৮ সালে দেশে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলো নিয়ে আমাদের এবারের আয়োজন। সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন মাহবুব শরীফ

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণের মধ্যে দিয়ে মাহাকাশে বাংলাদেশের নাম পৌছে দিতে সক্ষমহয়েছে চলতি বছরের ১১মে।  বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। ওই স্থানীয় সময় শুক্রবার বিকাল ৪টা ১৪ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা রাজ্যের অরল্যান্ডোর কেনেডি ষ্পেস সেন্টারের কেপ কেনাভেরাল থেকে সম্পূর্ণ নতুন একটি ফ্যালকন-৯ রকেটের মাধ্যমে এটি উেক্ষপণ করে মহাকাশ অনুসন্ান ও মহাকাশ যান নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্পেস এক্স। মাত্র ৩ মিনিটের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ রকেট ফ্যালকন-৯ মহাকাশে পৌঁছে যায় এবং তা নির্ধারিত প্যাডে ফেরত আসে। স্পেস এক্স জানিয়েছে, উেক্ষপণ সম্পূর্ণ নির্ভুল ছিল। ৩৩ মিনিট পর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত কক্ষপথ ১১৯ দশমিক ১ দ্রাঘিমাংশে অবস্থান নিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। সফল উেক্ষপণের মধ্য দিয়ে সেই অবস্থার অবসান হলো। অন্যদিকে বিশ্বের ৫৭তম স্যাটেলাইটের অধিকারী দেশ হলো বাংলাদেশ।

ফাইভ-জি’র দিকে বাংলাদেশ

আনুষ্ঠানিকভাবে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক পরীক্ষা শুরু করেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ সরকারের ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং বেসরকারি দুইটি মোবাইল নেটওয়ার্কের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রথমবার দেশে ফাইভ-জি প্রদর্শীত হয়েছে। রাজধানীর প্যানপ্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে একটি অনুষ্ঠানে ফাইফ-জি প্রদর্শনীর আনুষ্ঠানিক উদ্ব্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। অনুষ্ঠানটির মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে ফাইভ-জি ইকোসিস্টেম কীভাবে কাজ করবে তা উপস্থাপন করা হয়েছে। এছাড়াও অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মোবাইল ফোন অপারেটরদের রূপান্তরে ফাইভ-জি’র ব্যবহারও প্রদর্শন করা হয়। পরবর্তী প্রজন্মে তারহীন প্রযুক্তি মানুষের প্রতিদিনের জীবনধারা পরিবর্তন করতে সহায়তা করবে বলে আশা করছের সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে,  চালকবিহীন গাড়ি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি, বিগ ডাটা, ইন্টারনেট অব থিংকস, স্মার্ট সিটি এবং নেটওয়ার্ক তৈরিতে ফাইভ-জি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

ন্যাশনাল ই-সার্ভিস ফ্রেমওয়ার্ক

সরকারি বিভিন্ন সেবাকে ডিজিটালাইজড করতে অনেক আগে থেকেই কাজ করছে বাংলাদেশ সরাকারের এক্সেস টু ইনফরমেশন (এটুআই)। সরকারের বিভিন্ন সেবা (ই-সেবা)’র পরিমাণ এতোই বেড়ে যাচ্চে যাতে হাজার হাজার ইউআরএল ব্যবহার হচ্ছে। হাজার হাজার ইউআরএল ব্যবহারের ফলে দেশের জনগণ ও সরকারি কর্মকর্তারা ই-সেবাগুলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ সরকার তথা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। সরকারি ই-সেবাকে আরো সহজ করতে ও বিভিন্ন সেবার জন্য একটি মাত্র ইউআরএল ব্যবহার করতে ইতোমধ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এই পদক্ষেপগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ‘অফিস ইনফরমেশন অ্যান্ড সার্ভিস ফ্রেমওয়ার্ক’ প্রকল্প। সরকারি বিভিন্ন সেবা ডিজিটালাইজড করাতে ই-সার্ভিস ফ্রেমওয়ার্ক নামে একটি প্রকল্পের কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে দেশে ই-স্বাস্থ্যসেবা, ই-কৃষি সেবা, আবহাওয়ার পূর্বাভাসসহ বেশ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য সার্ভিস সফলভাবে পরিচালনার মাধ্যমে দেশের জনগণকে বিভিন্ন সেবা দিতে সক্ষম হয়েছে বর্তমান সরকার। দেশের জনগণকে ই-সেবাগুলোকে আরো সহজ করতে বিভিন্ন উদ্যোগও গ্রহণ করেছে।

মোবাইল নম্বর পোর্ট্যাবিলিটি সার্ভিস

দেশে মোবাইল গ্রাহকদের বহুল প্রতীক্ষিত সেবা মোবাইল নম্বর অপরিবর্তিত রেখে অপারেটর পরিবর্তন করার সুবিধা তথা মোবাইল নম্বর পোর্ট্যাবিলিটি (এমএনপি)-এর অপারেশনাল এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম ১ অক্টোবর রাত ১২টা থেকে চালু করা হয়েছে। এখন থেকে মোবাইল গ্রাহকগণ তার ব্যবহূত মোবাইল নম্বর অপরিবর্তিত রেখে যে কোনো অপারেটরে বদল করে ভয়েস ও ডাটা সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। একজন সেবা গ্রহীতা নির্ধারিত ফি প্রদানের মাধ্যমে প্রতিবারের জন্য অপারেটর বদল করতে পারবেন। একজন গ্রাহক একবার অপারটের বদলরে ৯০ দিনের মধ্যে পুনরায় অপারটের বদল করতে পারবনে না। ইতোমধ্যে কমিশন কর্তৃক এমএনপি প্রসেস এর কারিগরী ও বাণিজ্যিক মডেল নির্ধারণ করা হয়েছে যার উপর ভিত্তি করে এমএনপি, মোবাইল অপারেটর, আইজিডব্লিউ, আইসিএক্স, আইপিটিএসপি, পিএসটিএন অপারেটর প্রতিষ্ঠানসমূহ তাদের সিস্টেম স্থাপন, আপগ্রেডেশন এবং এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কারগিরী পরীক্ষা- নিরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করেছে।

দেশে ৪টি মোবাইল ও ১টি ল্যাপটপ কারখানার যাত্রা

দেশে মোবাইল ফোনের বেশ চাহিদা লক্ষণীয়। এতদিন দেশের বাজারে যে মোবাইল ফোনগুলো পাওয়া যেত সেগুলো সবই বিদেশ থেকে আমদানি করে আনা হতো। ২০১৭ সালের ৫ অক্টোবর দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে মোবাইলফোন উত্পাদন কার্য শুরু হয়েছে। দেশের প্রথম মোবাইফোন উত্পাদন কারখানাটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সাবেক ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম। ধরাবাহিকভাবে গত ১৮ জানুয়ারি দেশের প্রথম কম্পিউটার হার্ডওয়্যার উত্পাদন কারখানা উদ্বোধন করেনে সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। ওয়ালটনের নতুন ওই কম্পিউটার কারখানাকে ‘হাইটেক পার্ক’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। কারখানায় নিজস্ব মাদারবোর্ড, ল্যাপটপ ও স্মার্টফোন সংযোজন করছে ওয়ালটন।

রাইডশেয়ারিং নীতিমালা ও বিদেশি বিনিয়োগ

চলতি বছরে ২৮ ফেব্রুয়ারি রাইডশেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালাটির গেজেট জারি করা হয় এবং ১৫ জানুয়ারি রাইডশেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এই নীতিমালায় ৮টি অনুচ্ছেদ এবং ১২টি শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ)এর নিকট হতে রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে ‘রাইড শেয়ারিং শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট’ এবং মোটরযান মালিককে ‘রাইড শেয়ারিং মোটরযান এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট’ গ্রহণ করতে হবে। রাইড শেয়ারিং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে পূর্ণ টিআইএন ও ভ্যাট পূর্ণ নম্বারধারী পাবলিক বা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হতে হবে এবং পাবলিক বা প্রাইভেট কোম্পানির সকল শর্তাদি মেনে চলতে হবে। যাত্রী চাহিদা, সড়কের নেটওয়ার্ক ক্যাপাসিটি, রাইড শেয়ারিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা, সার্ভিস প্রদানে নিয়োজিত মোটরযানের সংখ্যা ইত্যাদির রাইড শেয়ারিং সার্ভিস অধিক্ষেত্র বিআরটিও কর্তৃক নির্ধারিত হবে। রাইড শেয়ারিং সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস এলাকায় অফিস থাকতে হবেসহ আরো বেশ কয়েকটি শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে নীতিমালায়।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গোল্ডেন গেট ভেঞ্চারের কাছ থেকে বিনিয়োগ হিসেবে ১৫ মিলিয়ন ইউএসডি অর্থায়ন পেলো বাংলাদেশের অনলাইন রাইড শেয়ারিং ও টিকেটিং প্ল্যাটফর্মে জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ‘সহজ’। নতুন এই মূলধন নিজেদের গ্রাহক অর্জন ও রাইড শেয়ারিং ব্যবসার বিস্তৃতিতে কাজে লাগাবে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানায় সহজ।

কম্পিউটার পণ্যের এমআরপি নীতিমালা

দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম সংগঠন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) প্রযুক্তি পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (এমআরপি) এবং ওয়ারেন্টি নীতিমালা তৈরি করেছে। আগামী ১ জুলাই থেকে প্রযুক্তিপণ্যের ওপর এমআরপি এবং ওয়ারেন্টি নীতিমালা কার্যকর করা হবে। ৭ জুলাই, ২০১৮ তারিখ থেকে কম্পিউটারের সকল পণ্যের গায়ে এমআরপি উল্লেখ করার বধ্যবধকতা চালু করা হয়েছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি সংশ্লিষ্ট সকলের মতামতের ভিত্তিতে একটি সমন্বিত ওয়ারেন্টি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ অনুভব করে এবং সকল পর্যায়ের অংশীদারদের মতামতের ভিত্তিতে তাদের গ্রহণযোগ্যতা অনুসারে একটি ওয়ারেন্টি নীতিমালা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এই নীতিমালা প্রণয়নের পর বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সদস্যদের জন্য এটি অবশ্য পালনীয় একটি নীতিমালা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।