বিশ্বজয়ী বাংলাদেশি কন্যা

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৯:৩৩

  মাহবুব নাহিদ

 

কেমন আছে ঢাকার জলদুর্গগুলো? ঢাকাকে বহিঃশত্রু থেকে রক্ষা করার জন্য মোগল আমলে ঢাকা পর্যন্ত কয়েকটি দুর্গ তৈরি করা হয়। কিন্তু এখন তা সম্পর্কে অনেকেই অবগত নয়। এই দুর্গগুলোকে মানুষের কাছে স্থাপন করতে, কর্তৃপক্ষকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কাজ করছেন বিশ্বপর্যটক এলিজা বিনতে এলাহী। তিনি বাংলাদেশের ৬৪টি জেলা ও এবং বিশ্বের ৪৮টি দেশের বিভিন্ন হেরিটেজ ভ্রমণ করেছেন। তিনি বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত হেরিটেজ ট্যুরিস্ট। তার সংগঠন কোয়েস্ট-এ হেরিটেজ জার্নি অফ বাংলাদেশ নিরলস কাজ করে যাচ্ছে বাংলাদেশের হেরিটেজ ট্যুরিজমকে বিশ্বমানের একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য।

এলিজার গ্রামের বাড়ি জামালপুরে হলেও তিনি জন্মেছেন ঢাকায়। মাধ্যমিক পাশ করেছেন শহিদ আনোয়ার গার্লস থেকে। উচ্চ মাধ্যমিক পড়েছেন লালমাটিয়া মহিলা কলেজ থেকে। ইডেন কলেজ থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়েছেন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ বাংলাদেশ থেকে মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে মাস্টার্স করেছেন। তিনি নেদারল্যান্ডসের দ্যা হেগ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তিনি বর্তমানে ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ এশিয়ায় সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তার বাবা এস এম এলাহী নেওয়াজ একজন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। মা রাহিমা খন্দকার একজন শিক্ষিকা ছিলেন। তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক একজন সংসদ সদস্য। স্বামী ফাইয়াজ আলম খান একজন ব্যবসায়ী। একমাত্র সন্তান নবী নেওয়াজ খান ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াশোনা করছেন।

হেরিটেজ ট্যুরিজম নিয়ে তার পথচলা ১৯৯৯ সাল থেকে। তখন নেপাল ভ্রমণ দিয়ে তিনি শুরু করেন ২০ বছরের এই দারুণ যাত্রা। মূলত ইংরেজি সাহিত্য পড়ার সময় তার হেরিটেজ সম্পর্কে আগ্রহ তৈরি হয়। তিনি তার জ্ঞান হবার পর থেকেই ঘোরাঘুরি শুরু করেছেন। তিনি মনে করেন ঘোরা হচ্ছে মন ও শরীরের শক্তি। তিনি ঘোরাকে কাজ মনে করেন আর জ্ঞান আহরণের উত্স বলে আখ্যা দেন। তিনি বাংলাদেশের সবগুলো জেলায় বহুবার ঘুরেছেন, জেলা গেজেট পড়েছেন। প্রত্যেকটি জেলার ঐতিহাসিক জায়গাগুলোতে গিয়েছেন, সেখানকার প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলেছেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন, বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছেন। সবার কাছ থেকে তিনি তথ্য সংগ্রহ করে লিপিবদ্ধ করেছেন।

দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য সংরক্ষণ করার জন্য তার সংগঠন কাজ করে যাচ্ছে। দেশের পাশাপাশি তিনি ঘুরেছেন ইউরোপের ২৫টি, এশিয়ার ২২টি এবং আফ্রিকার ১টি দেশে। তিনি বিশ্বের সপ্তাশ্চর্য তাজমহল, পিরামিড, কলুশিয়ামও ঘুরে ফেলেছেন। তিনি তার এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় হেরিটেজ সম্পর্কে লেখালেখি করে থাকেন। তিনি সব জায়গায় ছবি, ভিডিও করে মানুষের কাছে প্রচার করেন। মানুষকে হেরিটেজ সম্পর্কে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালি যাচ্ছেন তিনি। তিনি তার বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে দুইটি বই লিখেছেন, যার নাম ‘এলিজাস ট্রাভেল ডায়েরি- ১ ও ২’ বর্তমানে লিখছেন বাংলাদেশ নিয়ে। তিনি কোথায় ভ্রমণের আগে সেই জায়গা সম্পর্কে যথেষ্ট পড়াশোনা করে নেন, সেখানের ম্যাপ দেখে সবকিছু আগেই জেনে নেন।

বিভিন্ন দেশ, এলাকা ঘুরে তিনি প্রতিনিয়ত শিখছেন। নতুন মানুষ, নতুন সংস্কৃতি তার জ্ঞানের ভান্ডারকে করে তুলছে সমৃদ্ধ। তিনি মনে করেন জ্ঞানার্জন একটি আনন্দের বিষয় যা তাকে ভ্রমণ দিয়েছে। তিনি মনে করেন আমাদের দেশ হেরিটেজে অনেক পরিপূর্ণ। আমাদের প্রতিটি জেলায়ই রয়েছে হেরিটেজ নিয়ে কাজ করার মতো জায়গা। আমাদের দেশের প্রতিটি এলাকাই হেরিটেজ ট্যুরিজমের জন্য রোমাঞ্চকর। বিদেশে ওরা সুন্দর করে গুছিয়ে রাখে আর আমরা অযত্নে রাখি। যথাযথ ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ ব্যবস্থা-আবাসন ব্যবস্থার উন্নতি হলে হেরিটেজ ট্যুরিজমে বাংলাদেশ বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। আমাদের আর দেশের বাহিরে যেতে হবে না, আমাদের দেশেই বিদেশি পর্যটক ভরে যাবে। আমাদের অর্তজনীতি হয়ে উঠবে স্বয়ংসম্পূর্ণ, এমনটাই মনে করেন তিনি।

বর্তমানে তিনি ঢাকাকে নিয়ে কাজ করছেন। প্রতি শুক্রবার তিনি পুরান ঢাকায় গিয়ে ঐতিহ্য খুঁজে বেড়ানোর কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি কুমিল্লার সমতট কাগজ গুণিজন সম্মাননা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইয়ার থেকে সম্মাননাসহ বেশ কয়েকটি সম্মাননা পেয়েছেন। তবে তিনি মনে করেন বাংলাদেশ যখন হেরিটেজ ট্যুরিজমে বিশ্বে একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন সেটাই হবে তার জন্য বড়ো সম্মাননা।

টানা ২০ বছর ঘুরতে গিয়ে তার অনেক বাধা  পার করতে হয়েছে। অনেক পিছুটান এসেছে কিন্তু এলিজা এগিয়ে গেছেন আপন শক্তিতে। তিনি কখনো   একা ঘুরেছেন, আবার কখনো ঘুরেছেন পরিবার নিয়ে।            তিনি তার জীবনে কোনো অবসর দেখেন না। কারণ অবসরেও তিনি ঘুরেন, ঘোরার পরিকল্পনা করেন অথবা ভ্রমণের বই পড়েন।

তিনি স্বপ্ন দেখেন বাংলাদেশ একদিন হেরিটেজ ট্যুরিজম দিবস পালন করবে। সকল মাধ্যম থেকে হেরিটেজ ট্যুরিজমের ওপর গুরুত্ব দিবে। হেরিটেজ ট্যুরিজমের জন্য আমাদের দেশের বহু মানুষের কর্মসংস্থান হবে। তিনি আমাদের দেশের তরুণ প্রজন্মকে আহ্বান জানান এই কাজে এগিয়ে আসার জন্য। তিনি একজন সংসারী, একজন মা, একজন শিক্ষক হয়েও সকল কিছু সামলে, সকল কিছু ছাপিয়ে এগিয়ে গিয়েছেন। তিনি ভাবেননি যে তিনি মেয়ে, তিনি মানুষ হিসেবে লড়েছেন, গড়েছেন ইতিহাস। তিনি চান আমাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে হেরিটেজ নিয়ে কাজ হোক। এই বিষয়ে আরো বেশি বেশি পড়াশোনা চালু হোক বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কারণ ভ্রমণ নিজেই একটা বড়ো প্রতিষ্ঠান। আর তার স্বপ্ন সারা পৃথিবীর মানুষ জানবে   বাংলাদেশ হেরিটেজ ভ্রমণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং  নিরাপদ জায়গায়।