হালদা ভ্যালি বাংলাদেশে নতুন ধরনের চা উত্পাদন করছে। চা শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করা এই প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নাদের খান-র সঙ্গে কথা হয় ‘ইত্তেফাক’-এর। এখানে সেই কথোপকথন পত্রস্থ হলো
নাদের খান
আপনারা এদেশে এমন চা উত্পাদন করছেন, আগে যেসব চা আসত বাইরে থেকে। এই যে উত্কৃষ্ট চা; এর উত্কৃষ্টতা কী কী উপকরণের ওপর নির্ভর করে?
নাদের খান : বর্তমানে হালদা ভ্যালি চা বাগানে ড্রাগন ওয়েল গ্রিন টি, সিলভার নিডল হোয়াইট টি ও গোল্ডেন আইব্রো ব্ল্যাক টি-সহ উত্কৃষ্ট মানের চা উত্পাদন করছে। ইতিপূর্বে অর্থাত্ স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে এই মানের চা আর উত্পাদিত হয়নি। হালদা ভ্যালি টি কোম্পানি লিমিটেড বাংলাদেশে সর্বপ্রথম চীনা বিশেষজ্ঞদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই ধরনের স্পেশাল চায়ের উত্পাদন শুরু করেছে এবং তা ধীরে ধীরে প্রসারিত হচ্ছে। আমাদের উত্পাদিত এই চা ২০১৭ সালে সর্বপ্রথম ১০০০ কেজি চা চীনে রপ্তানি হয়েছে এবং গুণগত মানের জন্য ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। সাধারণত উত্কৃষ্ট চায়ের গুণগত মান অনেক উপাদানের যথাযথ উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। যেমন আর্দ্রতা, প্রোটিন, ফ্যাট, আঁশ, ক্যাফেইন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়ামসহ অন্যান্য উপাদান। আমাদের হালদা ভ্যালি চা বাগানের উত্পাদিত চা সমূহের মধ্যে এই সকল উপাদানের যথাযথ উপস্থিতি বিদ্যমান। যা বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষিত ও সনদপ্রাপ্ত।
হালদা ভ্যালি বাগান যেখানে, তা এর আগে চা উত্পাদনে সফল হয়নি। তেমন একটা জায়গা কীভাবে সেরা চা বাগানে পরিণত করলেন?
নাদের খান : হালদা ভ্যালি চা বাগানটি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ঋণের দায়ে এক যুগেরও অধিক সময় ধরে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। যে কারণে এই বাগানটি সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায় এবং অবকাঠামোগত এর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ২০০৩ সালে এই চা বাগান আমাদের কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় আসে। পরবর্তী সময়ে আমরা এই বাগানের উন্নয়নের জন্য এক বিশাল কর্মসূচি গ্রহণ করি। আমরা উন্নত প্রজাতির দ্রুতবর্ধনশীল চায়ের চারা রোপন করি। চায়ের চারা রোপনে পূর্বের সনাতন পদ্ধতির পরিবর্তে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত আধুনিক ও ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার নিশ্চিত করেছি। অন্যান্য অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে শ্রমিকদের জন্য স্থায়ী গৃহনির্মাণ, খাদ্য ও সুপেয় জলের ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করা, চা চাষের আওতাধীন শতভাগ জায়গায় বিদেশ থেকে আমদানিকৃত পাইপ ও আনুষঙ্গিক ফিটিংস-এর মাধ্যমে আধুনিক ইরিগেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি। অন্যান্য উন্নয়নের অংশ হিসেবে আধুনিক ফ্যাক্টরি নির্মাণ করা হয়েছে। মূলত সঠিক ও সুদক্ষ ব্যবস্থাপনা, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, শতভাগ জায়গায় ভূগর্ভস্থ আধুনিক ইরিগেশন ব্যবস্থার প্রয়োগ ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে বর্তমানে এই বাগানটি বাংলাদেশের একটি অন্যতম মডেল চা বাগান হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে।
আপনারা ‘সিলভার নিডল হোয়াইট টি’ বা ‘ড্রাগন ওয়েল গ্রিন টি’ জাতের উত্কৃষ্ট চা তৈরি করছেন। এসব চায়ের জন্য মাটি কীভাবে তৈরি করেছেন, মান নিয়ন্ত্রণইবা কীভাবে করছেন?
নাদের খান : উত্কৃষ্ট জাতের চা উত্পাদনের জন্য যথাযথ মাটি নির্বাচনের পর বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের নির্দেশনা মোতাবেক চা চাষের জন্য মাটির মুখ্য পুষ্টি উপাদান যেমন—কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাসিয়াম ইত্যাদির যথাযথ উপস্থিতিসহ ও অন্যান্য উপকারী উপকরণসমূহের মিশ্রণ নিশ্চিত করা হয়। পরে নির্ধারিত সময় পর্যন্ত নার্সারিতে রেখে যথাযথ পরিচর্যা শেষে চা চারা রোপন করা হয়। রোপনের পর প্রয়োজনীয় পরিচর্যা ও প্রয়োজনীয় সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। উত্পাদিত চা-সমূহ বিশেষ করে—ড্রাগন ওয়েল গ্রিন টি, সিলভার নিডল হোয়াইট টি ও গোল্ডেন আইব্রো ব্ল্যাক টি-সহ সকল পণ্যের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। মান বজায় রাখার জন্য নিজেদের ব্যবস্থাপনা ছাড়াও বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে বিভিন্ন সময় পরীক্ষা করা হয়।
এসব চায়ের প্রসেসিং কি ব্ল্যাক টি থেকে আলাদা? প্রসেসিং ফ্যাক্টরি কি নিজেদের?
নাদের খান : ড্রাগন ওয়েল গ্রিন টি ও সিলভার নিডল হোয়াইট টি-র প্রসেসিং নিয়ম সিটিসি কালো চায়ের বিপরীতে কিছুটা ভিন্ন রকম। বর্তমানে আমরা এই চায়ের প্রসেসিং-এর জন্য আলাদা ফ্যাক্টরি নির্মাণ করেছি।
হালদা ভ্যালি চায়ের বাজার কি শুধু স্থানীয়, না আন্তর্জাতিকভাবেও আপনারা সমপ্রসারণ করছেন?
নাদের খান : আমরা আনন্দের সাথে জানাচ্ছি, হালদা ভ্যালি চা বাগানের উত্পাদিত চা স্থানীয় বাজার ছাড়া ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।
