নির্বাচন ও নারী ভোটারদের প্রত্যাশা

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ২১:১৮

বাংলাদেশের নারীরা আজ স্বাবলম্বী। তারা আত্মবিশ্বাসী ও আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার কৌশলও শিখেছে; যে-কোনো সমস্যার মোকাবিলা করতে পারে দৃঢ়ভাবে। আপন মহিমায় মহিমান্বিত করে তুলতে সক্ষম নিজের জীবনকে নিজস্ব চিন্তাচেতনা আর কর্মের মাধ্যমে। অন্যদিকে অর্থনীতির মূলধারায় পূর্ণ অংশগ্রহণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা, যে-কোনো চ্যালেঞ্জমূলক কাজে অংশগ্রহণে উত্সাহী হওয়া, পরিবারকে নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা অর্জন এবং রাষ্ট্রীয় যে-কোনো কাজে পুরুষের মতো সমান সুযোগ লাভের অধিকারী বর্তমান নারীসমাজ।

১৯৭৩ সালে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে মাত্র ২ জন নারী প্রার্থী ছিলেন; সেখানে ২০১৮ সালে ৬৮ জন নারী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন। এ রাষ্ট্রের গত ৪৭ বছরের মধ্যে প্রধান নির্বাহী হিসেবে ২৫ বছরই দায়িত্ব পালন করেছেন নারী। এবারের সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটারের মধ্যে নারী ভোটারের সংখ্যা ৫ কোটি ১৬ লাখ ৩০ হাজার ২৭৬ জন। সর্বমোট ভোটার সংখ্যা ১০ কোটি ৪১ লাখ ৪২ হাজার ৩৮১ জন। পুরুষের সংখ্যা ৫ কোটি ২৫ লাখ ১২ হাজার ১০৫ জন। অর্থাত্ নারী-পুরুষ ভোটারদের সংখ্যার ব্যবধান ৮ লাখ ৮১ হাজার ৮২৯ জন। আর পুরুষ ও নারী ভোটারের অনুপাত ৫০.৪২ : ৪৯.৫৮। উল্লেখ্য, ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ১৪ কোটি ৯৬ লাখের অধিক। এর মধ্যে নারী ৭ কোটি ৪৭ লাখ এবং পুরুষ ৭ কোটি ৪৯ লাখ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনে মোট ৯ কোটি ১৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৭৬ জন ভোটারের মধ্যে নারীর সংখ্যা ছিল চার কোটি ৫৮ লাখ ৪২ হাজার ৬৯৮ ও পুরুষের সংখ্যা ছিল চার কোটি ৬১ লাখ ২২ হাজার ৪৬৯ জন। অপর এক হিসাবে, এবারের জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ৪১টি জেলার ১০১টি আসনেই পুরুষের তুলনায় নারী ভোটার বেশি। এর মধ্যে দেশের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৩২টি জেলার ১২৯ আসনের মধ্যে ৬৩টি আসনেই নারীর তুলনায় পুরুষ ভোটার কম। অন্যদিকে ২২টি জেলার কোনো আসনেই নারী ভোটার পুরুষের তুলনায় বেশি নয়। তবে কয়েকটি এলাকায় পারিবারিক ও সামাজিক কারণে নারীদের অন্তর্মুখী অবস্থান থাকলেও কিংবা ভোটার না হলেও তারা এখন তাদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার।

 

২.

বাংলাদেশে মোট নারী-পুরুষ ভোটারের অনুপাত কাছাকাছি হলেও সংখ্যায় দেশের বেশকিছু জেলায় নারী ভোটাররা পুরুষের তুলনায় এগিয়ে আছেন। নারী ভোটারের সংখ্যা যেসব জেলায় বেশি সেগুলো হচ্ছে— বরগুনা, বগুড়া, চুয়াডাঙ্গা, গাইবান্ধা, হবিগঞ্জ, জয়পুরহাট, জামালপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, মানিকগঞ্জ, মেহেরপুর, নওগাঁ, নড়াইল, পটুয়াখালী, রাজশাহী, রংপুর, শেরপুর ও টাঙ্গাইল। অবশ্য পার্বত্য এলাকায় নারী ভোটার পুরুষদের চেয়ে বেশি না হলেও তাদের উপেক্ষা করা অসম্ভব। রাঙ্গামাটি-২৯৯ আসনটি বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল, কাউখালী, নানিয়ারচর, কাপ্তাই, রাজস্থলী, বিলাইছড়ি, জুরাইছড়ি ও রাঙামাটি সদর— এই ১০টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ১৮ হাজার ২৪৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৫৩ জন এবং পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২০ হাজার ৩৯৫ জন। খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪১ হাজার ৭৪৪ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ২,১৫,৭৪৬ জন। নতুন ভোটার হওয়া ৬১ হাজারের মধ্যে প্রায় অর্ধেক নারী। অন্যদিকে বান্দরবান জেলায় ১,৭৪,৩৫৯ জন ভোটারের মধ্যে পুরুষ ৯২,৪১৭ জন এবং নারী ভোটার ৮১,৯৪২ জন। অর্থাত্ তিন পার্বত্য এলাকায় নারী ভোটারের সংখ্যা ৪ লাখেরও বেশি। ইতোমধ্যে এই নারী ভোটাররা রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে পাহাড়ে নারীর নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দাবি জানিয়েছে। তিন পার্বত্য জেলায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা পুরুষের পাশাপাশি অর্থনীতিতে এবং দেশের উন্নয়নে প্রায় সমানভাবে সম্পৃক্ত। এজন্য এসব নারীর কর্মক্ষেত্রসহ সর্বত্র নিরাপত্তা দাবির বিষয়টি যৌক্তিক। প্রায়শ ধর্ষণসহ যৌন নির্যাতন ও অপহরণের শিকার হয় নারীরা। অনেক নির্যাতনের ঘটনার খবর আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী পর্যন্ত পৌঁছায় না। মূলত দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সহসাই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যাতায়াত করতে না পারা এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ও সামাজিক সচেতনতার অভাবে পাহাড়ে এসব ঘটনা বেশি ঘটে। এজন্য দরকার পাহাড়ে নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা। নিরাপত্তা ছাড়াও কোনো কোনো নারী স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে পড়লে বিনা চিকিত্সায় মারা যান। ফলে পাহাড়ে নারীবান্ধব পরিবেশ সৃজন ভোটারদের দাবি হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমরা জানি, নারী ভোটারদের ভোট পেতে ৫০টি সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি সরাসরি আসনেও নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। এরই মধ্যে বহু নারী কর্মী নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন। এখন নারীর নিরাপত্তা বিধানে প্রতিশ্রুতি প্রদানের পালা।

 

৩.

উপরের পরিসংখ্যান থেকে বলা যায়, ৩০ ডিসেম্বর (২০১৮) অনুষ্ঠিতব্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি বেশি দেখা যেতে পারে। অতীতেও দেখা গেছে, নারী ভোটাররা ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকলে ব্যাপকভাবে ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে যান। তাই ফলাফল নির্ধারণে বড় ফ্যাক্টর তারা। আবার নারী ভোটারের মধ্যে অনেকেই এবার জীবনে প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। নতুন এই ভোটারদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ভিন্ন মাত্রার। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে, এসব নারী তুলনামূলকভাবে সত্, যোগ্য ও শান্তিপ্রিয় প্রার্থীকেই ভোট দিবেন। তবে নির্বাচনে এই নারীসমাজের রয়েছে স্বতন্ত্র প্রত্যাশা। ভোটাধিকার প্রয়োগে সুন্দর পরিবেশ এবং নির্বাচনোত্তর নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত জীবন তাদের কাম্য। যে সরকারই নির্বাচনে জয়ী হোক না কেন, নারীসমাজের প্রত্যাশা থাকবে হয়রানিমুক্ত জীবন-যাপন এবং নিরাপদ পরিবেশে দেশের উন্নয়নে অংশগ্রহণ।

n লেখক : সরকারি কর্মকর্তা