চা ম ড়া শি ল্প
শুধু চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে এমন কারখানার সংখ্যা ২০৭টি। বাংলাদেশ হয়ে উঠছে বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের প্রধান আকর্ষণ। কারণ, এ শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সস্তা শ্রম ও জুতা তৈরির জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে আমাদের। এছাড়া চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে সরকারের ১৫ ভাগ ভর্তুকি সুবিধার ফলে বিদেশি উদ্যোক্তারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। যার ফলে অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এই খাতে। চামড়া শিল্পে রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে বিনিয়োগ। বিদেশি বিনিয়োগও আসছে দেশে। আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানিতে সুবিধা থাকায় ডলারেও টান পড়ছে না
মীর আব্দুল আলীম
দেশীয় চামড়া শিল্পের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে চামড়ার অবদান ৯ শতাংশেরও বেশি। তাই বিশ্বব্যাপী চামড়ার বাজারে বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে তুলে ধরতে এবং বাংলাদেশের চামড়া শিল্পকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চলছে নানা পরিকল্পনা। আশাজাগানিয়া একটি বিষয় হলো, ফরাসিদের ‘ফ্রেঞ্চ কাফের’ পর মানের দিক থেকে আমাদের দেশের চামড়াই দুনিয়ার সেরা। চামড়া শিল্পের বোদ্ধারা তাই মনে করেন। এ রকম স্মুথ গ্রেইনের চামড়া বিশ্বের অন্য কোথাও মেলে না। গুণগত মানের কারণে গত এক দশকে সমানতালে বৃদ্ধি পাচ্ছে চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির পরিমাণ। এটাও সত্য, সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এ শিল্প যতটা এগোনোর কথা, ততটা কিন্তু এগোয়নি এখনো। এ শিল্পকে অনেক সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। আশার কথা হলো, আমাদের দেশের চামড়া দিয়ে বিশ্বমানের হুগো বসের মতো প্রতিষ্ঠান জুতা তৈরি করে বিশ্ব বাজারে বিক্রি করছে। আমার জানা মতে, প্রতিষ্ঠানটির তৈরি এক জোড়া জুতা বাংলাদেশের অর্থমানে ৩০/৪০ হাজার টাকা।
আরো আশার কথা হলো, ইউরোপের সবচেয়ে বড়ো জুতা বিক্রেতা ডাচম্যানের ৩ হাজার ৮ শতাধিক শোরুম রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটি এখন বাংলাদেশ থেকে চামড়াজাত জুতা আমদানি শুরু করেছে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতির শিরদাঁড়া শক্ত হতে শুরু হয়েছে। আমেরিকা ছাড়াও বাংলাদেশের জুতা যাচ্ছে ইউরোপের জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ইতালি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়ামে। রাশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপানেরও খুব পছন্দ বাংলাদেশি জুতা। চামড়ার গুণগত মান তুলনাহীন হওয়ায় রপ্তানি বেড়েছে, বেড়েছে চাহিদাও। চামড়ার জুতা তৈরির সকল ধরনের সুবিধা দিতে প্রস্তুত এ শিল্পে ঝুঁকছে বিদেশি নামীদামি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানও। আমরা মনে করি, গার্মেন্টস শিল্পের পর চামড়া শিল্পই এখন বিদেশি বিনিয়োগ আসার সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত।
দেশে বর্তমানে ১১০টি রপ্তানিমুখী কারখানায় চামড়ার পাদুকা তৈরি হয়। এর মধ্যে এপেক্স, এফবি, পিকার্ড বাংলাদেশ, জেনিস, আকিজ, আরএমএম, বেঙ্গল ও বে’র রয়েছে নিজস্ব ট্যানারি ও চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। এর বাইরে
শুধু চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে এমন কারখানার সংখ্যা ২০৭টি। বাংলাদেশ হয়ে উঠছে বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীদের প্রধান আকর্ষণ। কারণ, এ শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত কাঁচামাল, চামড়া প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, সস্তা শ্রম ও জুতা তৈরির জন্য যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা রয়েছে আমাদের। এছাড়া চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিতে সরকারের ১৫ ভাগ ভর্তুকি সুবিধার ফলে বিদেশি উদ্যোক্তারা ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। যার ফলে অপার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এই খাতে। চামড়া শিল্পে রপ্তানি বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে বিনিয়োগ। বিদেশি বিনিয়োগও আসছে দেশে। আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানিতে সুবিধা থাকায় ডলারেও টান পড়ছে না। সরকারি শুল্কে ছাড় রয়েছে বেশ পর্যাপ্ত পরিমাণে। আশার কথা হলো, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এরই মধ্যে অন্তত ৫১টি বিদেশি প্রতিষ্ঠান যৌথ বিনিয়োগে বাংলাদেশের পাদুকা শিল্পে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্ভাবনার দুয়ার সামনে আরো খুলে যাবে। জানা গেছে, চামড়ার জুতা উত্পাদনকারী প্রধান দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও ব্রাজিল এ খাত থেকে ধীরে ধীরে নিজেদের
গুটিয়ে নিচ্ছে। ফলে গার্মেন্টসের মতো আমাদের দেশে এখন এ খাতের ব্যবসা খুব দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। বিপুল সম্ভাবনাও আছে এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়ার। চীনের চামড়া শিল্প নিয়ে রিসার্চ অ্যান্ড মার্কেট ডটকমের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১২-১৩ সালে চীনে চামড়ার তৈরি জুতা শিল্পের উত্পাদন ৫ দশমিক ২৯ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ কমেছে। চীনের ছেড়ে দেওয়া বিশ্বের জুতার বাজারের ওই অংশটিই ধরতে চাইছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছর পাদুকা রপ্তানি করে ৪১ দশমিক ৯৩ কোটি ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ। কিন্তু ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা বেড়ে হয়েছে ১২৯ কোটি ডলার, যা মোট রপ্তানি আয়ের ৪ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি ২০১৪-১৫ অর্থবছরেও এই ধারা অব্যাহত রয়েছে, ২৩৪ কোটি ডলার আয় হয়েছে চামড়াজাত পণ্য থেকে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ৩০৯ কোটি ৩৬ লাখ ডলারে, যা মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ১০ ভাগ। চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এইএসবাংলা গ্রুপের চেয়ারম্যান বন্ধুবর আব্দুল্লাহ আল মামুনের তথ্য মতে, বিশ্ববাজারে মোট প্রক্রিয়াজাত চামড়ার দশমিক ৯৫ শতাংশ, জুতার জন্য দশমিক ৩২ শতাংশ এবং চামড়াজাত পণ্যেও জন্য দশমিক ০৬ শতাংশ বাংলাদেশ থেকে যায়। বিশ্বে বছরে ২ হাজার ১০০ কোটি জোড়া জুতার চাহিদা রয়েছে। এর ৬১ শতাংশই সরবরাহ করেছে চীন। তবে সে দেশে শ্রমিকের মজুরি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায়, চীনের জুতার ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়নের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক আরোপ, ডলারের বিপরীতে চীনের মুদ্রার মান বেড়ে যাওয়ায় দেশটির চামড়াশিল্প বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, পাকিস্তান, ভারত ও মিয়ানমারে স্থানান্তর হওয়ার সুযোগ এসেছে। চীনের বাজারের ১০ শতাংশও যদি ধরা যায়, তাহলে দেশের চামড়াজাত পণ্যের বর্তমান ১০০ কোটি ডলারের রপ্তানি ১ হাজার ৬০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব। আব্দুল্লাহ আল মামুন আরো জানান, বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ বাংলাদেশ থেকে চামড়া আমদানি করে নিজেদের দেশে জুতা প্রস্তুত করে তা রপ্তানি করে থাকে। তবে এদেশ থেকে চামড়া আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা থাকার পরও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) না থাকায় এ সুবিধা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। চামড়া বিশ্লেষকদের ধারণা, হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলো স্থানান্তর করা হলে রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকা হওয়াও বিচিত্র মনে হবে না।
বর্তমানে বাংলাদেশের চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। এসব দেশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো যুক্তরাষ্ট্র, স্পেন, যুক্তরাজ্য, ইতালি, জার্মানি, নেদারল্যান্ড, চীন, জাপান, হংকং, তাইওয়ান, ব্রাজিল প্রভৃতি। বাংলাদেশে প্রতি বছর এসব দেশে চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য সামগ্রী রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হয়। ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য রপ্তানি করে আয় করেছে ২ শত ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১৯৯৫-৯৬, ১৯৯৬-৯৭, ১৯৯৭-৯৮, ১৯৯৮-৯৯, ১৯৯৯-২০০০, ২০০০-০১ এবং ২০০১-২০০২ অর্থবছরে বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য রপ্তানি করে আয় করেছে যথাক্রমে ২ শত ১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ১ শত ৯৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ১ শত ৯০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ১ শত ৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ১ শত ৯৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, ২ শত ৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ২ শত ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০০৭-০৮ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত, এ ৯ মাসের চামড়া রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২ শত ১৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। শিল্পজাত পণ্য যথা : ১. পাটজাত দ্রব্য সমুহ, ২. ন্যাপথা, ফার্নেস অয়েল ও বিটুমিন, ৩. তৈরি পোশাক, ৪. নিটওয়্যার, ৫. রাসায়নিক দ্রব্য, ৬. কাগজ ও সহজাত দ্রব্য, ৭. হস্তশিল্পজাত দ্রব্য, ৮. ইঞ্জিনিয়ারিং দ্রব্য এবং ৯. অন্যান্য শিল্পজাত পণ্য হতে ১৯৯১-৯২ আর্থিক বছরে বাংলাদেশ মোট রপ্তানি আয় করে ১ হাজার ৭ শত ২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার; যার মধ্যে চামড়া শিল্পের অবদান ছিল ১ শত ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। সুতরাং এ হিসাব হতেই দেখা যায়, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের এক উল্লেখযোগ্য অংশ আসে চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্যসমূহ রপ্তানি করে।
এ শিল্পে একটা বড়ো সমস্যা আছে, তা হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য। কোরবানির ঈদে যে পশু কোরবানি হয়, তা হলো কাঁচা চামড়ার অন্যতম উত্স। গ্রামের বা ঢাকার বাইরে চামড়া ক্রয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো না থাকায় চামড়ার সঠিক মূল্য পাওয়া যায় না। দালাল-ফড়িয়ারা এগুলো বাড়ি বাড়ি ঘুরে বিভিন্ন দামে সংগ্রহ করে। গ্রাম থেকে উপজেলা ও জেলা হয়ে ঢাকা পর্যন্ত কয়েক স্তরবিশিষ্ট মধ্যস্বত্বভোগী রয়েছে। চামড়ার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করার ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বা দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। কাঁচা চামড়া থেকে চর্বি বা গোশত ছাড়ানোর সময় চামড়া কেটে যায়, যা চামড়ার গুণগতমান কমিয়ে দেয়। গ্রাম বা পল্লি এলাকায় প্রাচীন বা গতানুগতিক পদ্ধতিতে পশু থেকে চামড়া খোলা হয়। কাঁচা চামড়া সঠিক নিয়মে প্রক্রিয়াজাতকরণ না করার কারণে এর গুণগতমানও হ্রাস পায়।
চামড়া শিল্পের জন্য অধিক শ্রমশক্তির প্রয়োজন, যা বাংলাদেশে আছে। এ খাতে বর্তমানে ৬০ শতাংশেরও বেশি নারী কর্মী রয়েছে। বর্তমানে এই শিল্পে প্রায় ২ লাখ কর্মী নিযুক্ত রয়েছেন এবং ভবিষ্যতে আরো কয়েক লাখ কর্মী নিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে প্রায় ২২০টি ট্যানারি, ৩,৫০০টি ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান, প্রায় ৯০টি বড়ো সংস্থা এবং ১৫টি বড়ো প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে চামড়া শিল্প গঠিত। দেশে বছরে ৩১০ মিলিয়ন বর্গফুট চামড়ার কাঁচামাল উত্পাদিত হয়। দেশের প্রায় ৭৬ শতাংশ ট্যানারি রপ্তানিমুখী। বর্তমানে আমাদের রপ্তানি আয় ১ বিলিয়নের বেশি এবং এটি আরএমজির পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে তৈরি হয়েছে। গত এক দশকে দেশের চামড়া শিল্পের রপ্তানি ৫০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ উত্পাদনে বিশ্বে ষষ্ঠ স্থান এবং বিশ্বব্যাপী রপ্তানিতে ২০তম স্থান অর্জন করেছে। বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৮টি দেশে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে আরো ১০টি দেশে জিএসপি সুবিধা পাচ্ছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চামড়া শিল্পে রপ্তানি আয় হয়েছে রেকর্ড ১০১৯.৭৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে অন্যান্য পাদুকা (চামড়াবিহীন) শিল্পের রপ্তানি আয় ১১.২৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ২০২২ সালের মধ্যে এ খাত থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করা সম্ভব হবে। বিশ্বে বাংলাদেশি চামড়াজাত পণ্যের সবচেয়ে বড়ো ক্রেতা হলো জাপান। মোট রপ্তানি পণ্যের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশই যায় জাপানের বাজারে। এর অন্যতম কারণ হলো বাংলাদেশি চামড়ার জুতার ক্ষেত্রে শুরু থেকেই জাপান ‘ডিউটি ফ্রি’ ও ‘কোটা ফ্রি’ সুবিধা দিয়ে আসছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা ১৩৭ কোটি ডলারের বিপরীতে আয় হয়েছে ১০৮ কোটি ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২২ শতাংশ কম। চলতি অর্থবছরে, অর্থাত্ ২০১৮-২০১৯-এ এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১২৮ কোটি ডলার। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ কোটি ৬৫ লাখ পিস কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ছাগলের চামড়া ১ কোটি, গরু ৫০ লাখ এবং ভেড়া ও মহিষ মিলে ১৫ লাখ পিস। অর্থাত্ সব মিলিয়ে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। আর এই চামড়ার প্রায় অর্ধেকই পাওয়া যায় কোরবানি ঈদের সময়। সঠিক কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও প্রতি বছর ২০০ থেকে ২৫০ মিলিয়ন জোড়া জুতা তৈরি হয় বাংলাদেশে। বলা বাহুল্য, অভ্যন্তরীণ চাহিদার শতকরা ৫০ ভাগই মেটানো হয় দেশে তৈরি জুতা দিয়ে। বর্তমানে বিশ্ববাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের ২২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজার রয়েছে। বিশাল ওই বাজারে বাংলাদেশ মাত্র ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য রপ্তানি করে।
বাংলাদেশ এ শিল্পের কাঁচামাল সমৃদ্ধ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। উত্কৃষ্ট মানের পশু চামড়া উত্পাদনে বহুকাল ধরে এদেশের সুখ্যাতি রয়েছে সারা পৃথিবীতে। চামড়া শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে ২০২১ সালের মধ্যে এ খাতে ৫ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির পাশাপাশি সম্ভাবনাময় এ শিল্প খাতে ৫০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব।
তবে বাংলাদেশের চামড়া শিল্প নিয়ে বড়ো অভিযোগ হলো, এটা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এবং এখানে অবাধ শিশুশ্রম দেখা যায়। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের চামড়া শ্রমিকদের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে হয়। যেখানে চামড়া শিল্প রয়েছে, সেখানে বছরের পর বছর মাটি, পানি, বাতাস বিষাক্ত করছে। পরিবেশগত সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলে চামড়া হবে রপ্তানির প্রধান পণ্য। ভাবা কি যায়, চামড়া শিল্প থেকে বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র দেশ বছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি রোজগার করে থাকে। এ খাতের সম্ভাবনা দিন দিন বাড়ছেই। পরিবেশগত সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারলে চামড়া চলে আসবে সোনালি আঁশ পাটের জায়গায়। ট্যানারি শিল্প খাতের প্রধান কাঁচামাল চামড়া। আমাদের দেশে চামড়া শিল্প সম্ভাবনাময় এবং উল্লেখযোগ্য খাত হিসেবে চিহ্নিত। দুঃখজনক হলেও সত্য যে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যর্থতার চক্করে ঘুরপাক খাচ্ছে এ শিল্প খাতটি। এ খাতের বিকাশ এবং স্থায়ীকরণের জন্য ২০০ একর জমিতে চামড়া শিল্পনগরী গড়ে তুলতে দীর্ঘ ১৬ বছর পাড় করেছে সরকার। এতে পর্যায়ক্রমে চামড়া রপ্তানির আয় কমে যাচ্ছে এবং কাঁচা চামড়ার দামের ধস নেমেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সারা বছর ট্যানারির জন্য চামড়া এলেও কোরবানির পশুর চামড়ার আধিক্য প্রতি বছরই পরিলক্ষিত হয়। অথচ চামড়া শিল্পের প্রধান এই কাঁচামাল চামড়ার দাম বাজারে সবচেয়ে কম। এবারও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার কাঁচা চামড়ার দাম বেঁধে দিলেও দাম নির্ধারণে ব্যবসায়ীদের স্বার্থই সংরক্ষিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের দেশে চামড়ার দাম কমে যাওয়া অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। মধ্যস্বত্বভোগী ও দলীয় প্রভাবমুক্ত করা গেলে চামড়া শিল্পে আমরা এগিয়ে যাব বহুদূর।
তাই চামড়া শিল্পের মানোন্নয়নে সরকারের আর্থিক সহযোগিতা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশিক্ষিত জনবল তৈরির লক্ষ্যে আরো লেদার টেকনোলজি ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে। চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা গ্রহণ, চামড়া শিল্পের জন্য আলাদা শিল্পনগরী প্রতিষ্ঠা, চামড়া শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয় গড়ে তোলা, ব্যবসায়ীদের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানির বিপরীতে পাওনা শুল্ক ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব দূরীকরণ, চামড়া প্রক্রিয়াকরণে লবণ ও অন্যান্য ব্যবহূত কেমিক্যালের মূল্য না বাড়ানো, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে আরো কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাছাড়া চামড়া শিল্পের উন্নয়নে অবশ্যই বড়ো আকারের খামার গড়ে তোলতে সরকারকে সহযোগিতা করতে হবে। চামড়া শিল্পকে টেকসই করতে নানামুখী উদ্যোগের পাশাপাশি চামড়া ও চামড়াভিত্তিক শিল্পের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত নীতিমালা থাকা দরকার। চামড়া আমদানিকারক দেশ থেকে প্রযুক্তি ধার করা যেতে পারে। চামড়ার মৌসুমে সরকারের পক্ষ থেকে সহজ শর্তে ঋণসহ চামড়া চোরাচালান বন্ধে পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে কাঁচা চামড়ার বার্ষিক চাহিদার প্রায় শতকরা ৪৫ ভাগ আসে কোরবানির পশু থেকে। আসছে কোরবানির ঈদে সঠিক ব্যবস্থাপনা, বাজার মনিটরিং, দ্রুত সংরক্ষণ, পরিবহন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে এ খাতের বিভিন্ন স্তরে ব্যবসায়ীরা যাতে লাভবান হতে পারেন এবং উন্নতমানের চামড়া প্রস্তুত করার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। শুধু চামড়া উত্পাদন নয়, বহুমুখী চামড়াজাত পণ্য উত্পাদনে উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হলে সম্ভাবনাময় চামড়া খাত উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। চামড়া খাতে ২ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। আমরা জানি, আগামী ২০২১ সালের মধ্যে ৫০০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। আর এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারকেই এ শিল্পের প্রতি যত্নবান হতে হবে। চামড়া শিল্পের উন্নয়নে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হলে চামড়া শিল্পে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই সারা বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে থাকবে এবং এই খাত থেকে রপ্তানি আয়ও বৃদ্ধি পাবে বলে আমরা আশাবাদী। এ খাতের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি ঘটুক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
লেখক :সাংবাদিক, গবেষক ও কলামিস্ট।
