তরুণ সমাজ :মাদকাসক্তি

আপডেট : ২৫ ডিসেম্বর ২০১৯, ২১:৪৬

মো. সাব্বির আহমেদ

তরুণ সমাজ একটি দেশের কর্ণধার ও ভবিষ্যত্। দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে এবং কি হবে এর ভবিষ্যত্ তা নির্ভর করে দেশের তরুণ সমাজের ওপর। তারুণ্য স্থবির নয়, সদা চঞ্চল। তারুণ্যের সাধনা, সৃষ্টি, ত্যাগ, মহিমা ইত্যাদি ব্যক্তি, সমাজ এবং দেশের কল্যাণ সাধন করে। কিন্তু যখন একটি দেশের তরুণ সমাজ মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে তখন সেই দেশের কল্যাণ ও ভবিষ্যত্ অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে।

যেসব খাদ্য পানীয় সুস্থ মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটায় ও জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ করে সেগুলোকে আমরা মাদকদ্রব্য বলি। এছাড়াও বিভিন্ন ওষুধ যাতে মাদকদ্রব্যের কিছু অংশ আছে যা বিশেষভাবে গ্রহণ করলে আসক্তি সৃষ্টি হয় এইসব মাদক বা ওষুধের ব্যবহার হলো মাদকাসক্তি। বর্তমানে তরুণেরা হেরোইন, আফিম, প্যাথেডিন, মরফিন, ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য গ্রহণ করছে। সম্প্রতি ইয়াবা তরুণ সমাজকে গ্রাস করেছে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে ইয়াবার প্রতি আসক্তি বেশি লক্ষ্য করা যায়। প্রতিদিন যেমন হাজার হাজার পিস ইয়াবা ধরা হচ্ছে, তেমনি হাজার হাজার পিস তরুণেরা গ্রহণ করছে।

তরুণদের মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ার প্রধান কারণ মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা। মাদকের সহজলভ্যতা মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ হলেও একমাত্র কারণ নয়। মাদকাসক্তির কারণ সম্পর্কে একটি প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে ব্যক্তিগত হতাশা, ব্যর্থতা এবং অপ্রাপ্তি। বিষয়টি এরকম হলে প্রায় সবাই মাদকাসক্ত হওয়ার কথা। বাস্তবে ব্যাপারটি অন্যরকম। মূলত সঙ্গদোষ, পারিবারিক ও সামাজিক অসচেতনতার কারণে তরুণেরা মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, মাদক ব্যবহারকারীদের দুই-তৃতীয়াংশই বয়সে তরুণ বা টিনএইজ। পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজন তরুণ মাদকাসক্ত। আমাদের দেশে জাতীয় পরিসংখ্যান না থাকলেও এটুকু বলা যায় এ হার কোনো অংশে কম নয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় অর্ধকোটি যাদের শতকরা ৮০ ভাগ কিশোর ও তরুণ। মাদকাসক্তির কারণে তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় ঘটছে। আর নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে তারা চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে সমাজে কিশোর অপরাধ ক্রমাগত বেড়ে চলছে। মূলত মাদক কেনার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তরুণ-তরুণীরা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, এমনকি নিজের বাবা-মাকেও হত্যা করতে দ্বিধাবোধ করছে না । আর এ সুযোগে মাদক ব্যবসায়ী ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র অপহরণ ও চাঁদাবাজিসহ নানা রকম অপরাধে মাদকাসক্তিকে ব্যবহার করছে। একবার মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে সহজে বেরিয়ে আসতে পারে না। কারণ আসক্ত হওয়ার পর মাদক ব্যবহার না করলে প্রত্যাহার জনিত বিভিন্ন অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হয়। এ কারণে মাদকাসক্ত ব্যক্তি একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে যায়। মাদকাসক্তির ফলে আত্মহত্যার প্রবণতাসহ বিভিন্ন রোগ যেমন, ম্যানিয়া, উদ্বেগজনিত সমস্যা, ঘুমের সমস্যা, সাইকোটিক ডিসঅর্ডার (অহেতুক সন্দেহ, অস্বাভাবিক চিন্তা, অসংলগ্ন কথাবার্তা ও আচরণ এবং হ্যালুসিনেশন ইত্যাদি) যৌন সমস্যা ইত্যাদি সৃষ্টি হয়। মাদকাসক্তি একটি রোগ। এর ফলে তরুণেরা মেধাশূন্য হয়ে যাচ্ছে এবং তাদের মনুষ্যত্ব লোপ পাচ্ছে। এছাড়াও এটি মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘটায়। তরুণদের মাদকাসক্তির নিয়ন্ত্রণ আনা প্রয়োজন। মাদকাসক্তি নিরাময়ের জন্য দরকার আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা এবং শিক্ষা ও পরিমিত জীবন-যাপন। যা পারে একটি সন্তানকে সুন্দর ও মাদকমুক্ত জীবন দিতে। প্রতিটি পরিবারের উচিত সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা প্রদান করা, মাদকের অপকারিতা সম্পর্কে সচেতন করা এবং সে কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, কার সঙ্গে মিশছে সেদিকে নজর রাখা। মাদকাসক্তির ভয়াবহ পরিণাম থেকে তরুণ সমাজসহ দেশের সবাইকে রক্ষা করতে হলে মাদকদ্রব্যের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

মাদকাসক্তি প্রতিরোধের সর্বাপেক্ষা কার্যকর উপায় হলো মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তোলা। মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করা এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং মাদক সেবনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে কারণ মাদকমুক্ত সমাজ ও তরুণেরা পারে দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিতে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়