সরিষা ফুল

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:০১

বিন্তিরা এ বছর শীতে গ্রামের বাড়িতে এসেছে। গ্রামে ওর সবচেয়ে ভালো বন্ধু হচ্ছে ওর সেজো কাকা। সে এখান থেকে সেখান থেকে নানান জিনিস নিয়ে এসে বিন্তিকে দেখায়। সেদিন একটা কাচের বোতল দেখিয়ে সেজো কাকা জিজ্ঞাসা করল, ‘এইডে কী কথি পার?’ বিন্তি বলল, ‘বটল।’ ‘ভিতরে কী?’ কাকা বোতলের ভেতরে ইঙ্গিত করল। বিন্তি বলল, ‘অয়েল।’

‘কী অয়েল?’

‘আই থিংক মাস্টার্ড অয়েল, দ্যাট’স ইউজড উইথ স্ম্যাশড পটেইটো।’

কাকা বলল, ‘এইডে সরিষার তৈল।’ তারপর বোতলটা কাত করে বাম হাতের তালুতে খানিকটা সরিষার তেল ঢেলে ডান হাতের তালু দিয়ে ঘষল। বিন্তির মাথাটা কাছে টেনে নিয়ে ডলে ডলে চুলে মাখিয়ে দিল। শেষে নাকে মুখে ও দুই গালে ঘষে দিলে বিন্তি বুঝল, সরিষার তেলের গন্ধটা ঝাঁঝাল, চোখ জ্বলে। কিন্তু গন্ধটা শুঁকতে ওর দারুণ লাগল। ও বলল, ‘সেজো কাকা, সরিষার তেল কোথায় পাওয়া যায়?’ কাকা চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, ‘গাছে—সরিষা গাছে।’ বিন্তি কাকার কাছে আবদার করল, ‘আমি সরিষাগাছ দেখব, সেজো কাকা।’

বিকেলে বিন্তি কাকার সাথে বিলের দিকে রওনা দিল। শীতের বিকেল বেশিক্ষণ থাকে না। বিকেল আসতে আসতেই সন্ধে নেমে আসে। জমির আলের ওপর দিয়ে হাঁটতে গিয়ে বিন্তি কেবল পড়ে যাচ্ছিল। ঘাসে ওর পা জড়িয়ে আসছিল। কাকা বলল, ‘বিন্তি, তুমার আরেকটু জোরে হাঁটতি হবি, না হলি বিলি যাতি যাতি সইন্ধে লাইগে যাবি।’

হাঁটতে হাঁটতে রোদ যখন পড়ে এসেছে, তখন বিন্তিরা একটা উঁচু বাঁধের কাছে চলে এসেছে। বিন্তি জিজ্ঞাসা করল, ‘এটা কী? এত উঁচু কেন?’ কাকা বলল, ‘এইডে ক্যানাল।’ বিন্তি বোধহয় বুঝল না, ও কাকার দিকে একবার তাকিয়ে, উঁচু বাঁধের দিকে তাকাল। কাকা ওর হাত ধরে বাঁধের ওপরে নিয়ে গেল। বাঁধের ওপরে দাঁড়িয়ে ও বুঝল, ক্যানাল মানে হচ্ছে খাল। খালের পানি ধরে রাখার জন্য দু পাশে উঁচু পাড় বেঁধে দেওয়া হয়। এতক্ষণ ও বুঝতে পারেনি, ওরা যে বিলের মাঝখানে চলে এসেছে। ক্যানালের উঁচু পাড়ের ওপরে দাঁড়িয়ে বুঝল, ওরা অনেক দূর চলে এসেছে। কাকা দু হাতে বিন্তির মাথা ধরে আঙুল দিয়ে দূরে দেখাল, ‘উই দ্যাখো, আমাগের বাড়ি।’ বিন্তি তাকাল কিন্তু বাড়িটা চিনে বের করতে পারল না। চারদিকে যতদূর চোখ যায় শুধু মাঠ আর মাঠ। দূরে গাছগাছালির সারি। দু-একটা নারিকেল আর তাল গাছের মাথা দেখা যাচ্ছে। 

ক্যানালে অল্প পানি। কয়েকটা হাঁস তাদের বাচ্চাদের নিয়ে খেলা করছে। হাঁসগুলো পানিতে ডুবে ডুবে শামুক তুলে নিয়ে আসছে। ছোট বাচ্চাদের মুখে তুলে দিচ্ছে। বাচ্চারা গলা টানটান করে শামুক খাচ্ছে। কাকা বলল, ‘ওই পাড়ে যাতি হবি।’ বিন্তি দেখল কাছেই একটা ছোট ব্রিজ আছে। কাকার হাত ধরে ব্রিজটা পার হয়ে ক্যানালের ওপারে গেল। তারপর ক্যানালের পাড় বেয়ে ওরা বিলের ভেতরে নেমে গেল।

এখানে বিলের রং হলুদ। চারপাশে হলুদ ফুলের মাঠ। বিন্তি কাকার দিকে তাকাল। কাকা বলল, ‘এই হলোগে’ সরিষা ফুল।’ বিন্তি কাকার হাত ছেড়ে দিয়ে হলুদ মাঠের ভেতরে ঢুকে গেল। ফুলের গাছ থেকে দু-একটা সাদা প্রজাপতি উড়ে এসে ওর গায়ে পড়ছে। ওর দু গালে বিকেলের রোদ লেগেছে। ও আল বেয়ে দৌড়াচ্ছে। পিঠের ওপরে ওর বেণি দুলছে।

বিন্তি ফুলগুলোকে কাছে থেকে দেখার জন্য মাঠের ভেতরে এক জায়গায় নুয়ে দাঁড়াল। ফুলগুলো খুব ছোট ছোট। ইনসেক্টের পাখার মতো ওদের পাপড়ি। গায়ে মিষ্টি বুনো গন্ধ। গাছগুলো ওর বুকসমান উঁচু। নিচের দিকে সবুজ পাতা আর ওপর দিকে হলুদ ফুল। মধ্যেখানে সবুজ পাতার গা ঘেঁষে ঘেঁষে সরু সরু সিডপড উঁকি দিয়ে আছে। বিন্তি ফুল ছেঁড়ে না, ফল ছেঁড়ে না, পাতা ছেঁড়ে না। কাকা কয়েকটা সিডপড ছিঁড়ে আঙুলে চাপ দিয়ে দেখাল ভেতরে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বলের মতো ব্রাউন কালারের সিড। কাকা বলল, ‘এই ফল পাকলি পর, রোদি শুকোতি হয়। শুকোলি পাওয়া যায় সরিষার দানা। সেই দানা মেশিনি দিয়ে ছেঁচলি তেল বাইর হয়—সরিষার তেল।’ বিন্তি জানে, অনেক শক্ত ও শুকনো সিড থেকেই লিকুইড তেল হয়। ও ব্যাপারটা বুঝল। ও এতে তেমন অবাক হয়নি। ও অবাক হয়েছে ঝাঁঝাল মাস্টার্ড অয়েল যে এমন সুন্দর একটি গাছে হয়, যার ফুল এমন নরম হলুদ, যার পাপড়ি ইনসেক্টের পাখার মতো তুলতুলে—এসব দেখে।

সন্ধে নামতে নামতে ওরা সেই মেঠোপথ বেয়ে ঘরে ফিরে এল। নিশ্বাস নিলেই কেমন সরিষা ফুলের ঘ্রাণ। সরিষা ফুল ওর ভালো লেগেছে। ফুলরাও ওকে খুব ভালোবেসেছে। ঘরে এসে ড্রেস চেঞ্জ করার সময় ও দেখল, ওর দু পায়ের মোজায়, জুতার ফাঁকে ফাঁকে, স্কার্ট ঘিরে সরিষা ফুল জড়িয়ে রয়েছে—ওরা ওর পায়ে পায়ে ঘরে চলে এসেছে। বিন্তি মাকে গিয়ে দেখাল।