জাতীয় পার্টির (জাপা) কাউন্সিলকে ঘিরে দলের নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সৃষ্ট মতবিরোধ এখনো অমীমাংসিত। এরমধ্যেই আগামীকাল শনিবার দলের নবম কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সর্বাত্মক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ও তার অনুসারীরা। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদসহ পাঁচ নেতাকে মর্যাদার নতুন পদবি দিয়ে হলেও চেয়ারম্যান পদে বহাল থাকতে চান জি এম কাদের। এ লক্ষ্যে দলের গঠনতন্ত্রে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হচ্ছে।
কাউন্সিলকে সামনে রেখে গঠনতন্ত্র সংশোধনীর প্রস্তাব প্রণয়ন কমিটির সূত্রে জানা গেছে, জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান ধরেই সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তাকে চেয়ারম্যান করার পথ নির্বিঘ্ন করতে রওশন এরশাদকে সিনিয়র কো-চেয়ারম্যানের পরিবর্তে ‘প্রধান উপদেষ্টা’ বা ‘প্রধান পৃষ্ঠপোষক’ করা হতে পারে। আর দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ ও সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাকে কো-চেয়ারম্যান করার কথা শোনা যাচ্ছে। রওশনসহ এই পাঁচ জনের জন্য উল্লেখিত পদবি সৃজন করে গঠনতন্ত্রে সংশোধনী আনা হবে আগামীকালের কাউন্সিলে। দলের আরো দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু ও মুজিবুল হক চুন্নুকেও কো-চেয়ারম্যান করার কথা আলোচনায় আছে।
এছাড়া গঠনতন্ত্রে অতিরিক্ত মহাসচিব পদও সৃষ্টি করা হচ্ছে। জাপার দায়িত্বশীল নেতারা ইত্তেফাককে জানান, ওয়ান-ইলেভেনের সময়কার আলোচিত সেনা কর্মকর্তা ও বর্তমানে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এমপিকে অতিরিক্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা বেশি। গঠনতন্ত্রে এসব সংশোধনীর প্রস্তাবে দলীয় ফোরামের সমর্থন আদায়ে আজ শুক্রবার সকাল দশটায় প্রেসিডিয়ামের বৈঠক ডেকেছেন জি এম কাদের। জানা গেছে, রাজধানীর বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে অনুষ্ঠেয় এই প্রেসিডিয়াম বৈঠকে রওশন এরশাদ যাচ্ছেন না। তবে এইচ এম এরশাদের মৃত্যুর আগে থেকেই দলে নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকা সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার প্রথমবারের মতো আজকের প্রেসিডিয়াম বৈঠকে যোগ দিচ্ছেন। জি এম কাদেরের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে রওশনকে চেয়ারম্যান ঘোষণাকারী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদও আজকের সভায় থাকছেন।
তবে নিজেকে ‘চেয়ারপারসন’ ও দেবর জি এম কাদেরকে দলের ‘নির্বাহী চেয়ারম্যান’ করার ফরমুলা নিয়ে রওশন এরশাদ গত কয়েক দিন ধরে তত্পর থাকলেও হঠাত্ তিনি নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। ফরমুলা বাস্তবায়নে তার এখন আর কোনো তত্পরতা দৃশ্যমান নেই। তার ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, শনিবার দলের কাউন্সিলে রওশনের যোগদানের সম্ভাবনা নেই। এরমধ্যেই জাপার মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা বৃহস্পতিবার প্রকাশ্যে দলের এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘রওশন এরশাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, তিনিও চান জি এম কাদেরই চেয়ারম্যান হোন।’
এদিকে, কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের নতুন মহাসচিব কে হচ্ছেন সেটা নিয়েও জাপার নেতাকর্মীদের আলোচনা রয়েছে। বর্তমান মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গার সঙ্গে এই পদে এত দিন আরো কয়েক জনের আগ্রহের কথা শোনা গেলেও এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছেন দলের সদ্যনিযুক্ত প্রেসিডিয়াম সদস্য, জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা। কাউন্সিলে মহাসচিব পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাকরাইলে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বেশ তত্পর দেখা গেছে এমপি খোকাকে।
এ ব্যাপারে লিয়াকত হোসেন খোকা বলেন, আমি দলের এক নম্বর যুগ্ম মহাসচিব ছিলাম, জাতীয় যুবসংহতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছি, দুই মেয়াদে স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছি। সুতরাং দলের প্রতি আমার অবদান অন্য অনেকের চেয়েই বেশি। তার পরেও দলের কাউন্সিলররা, অর্থাত্ তৃণমূলের নেতাকর্মীরাই চেয়ারম্যান ও মহাসচিব নির্বাচিত করবেন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এরশাদের অবর্তমানে এখন জাপার হাল ধরার ক্ষেত্রে জি এম কাদেরের বিকল্প নেই।
কাউন্সিলে জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান করার লক্ষ্যে জাপার সকল অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনসমূহের নেতারা গতকাল কাকরাইল কার্যালয়ে বৈঠক করেছেন। স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সভাপতি লিয়াকত হোসেন খোকার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সবাই একমত পোষণ করেন যে, জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করতে কাউন্সিলে সকল অঙ্গ সংগঠন সক্রিয় থাকবে। এমনকি কাউন্সিল অধিবেশন থেকেই যেন দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিব পদে নাম ঘোষণা করা হয়, সেই দাবিও জানাবেন তারা।
আগামীকালের কাউন্সিলের বিষয়ে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের ইত্তেফাককে বলেন, আমাদের সকল প্রস্তুতি শেষ হয়েছে। বিভিন্ন উপকমিটিগুলোও তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। আশা করছি একটি সুন্দর ও সফল কাউন্সিল হবে। এখানে কারো ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ কোনো বিষয় নয়, তৃণমূলের নেতারাই দলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করবেন। তাদের সিদ্ধান্ত সবাইকে মেনে নিতে হবে, এটাই গঠনতান্ত্রিক নিয়ম।
মেয়র পদে ঢাকা উত্তরে ব্রিগেডিয়ার কামরুল, দক্ষিণে মনোনয়ন চান মিলন ও লোটন
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে জাপার মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন ব্রি. জে. (অব.) কামরুল ইসলাম। তিনি বুধবার দলের মনোনয়নফরম সংগ্রহ করেছেন। ডিএনসিসিতে মেয়র পদে জাপার আর কেউ মনোনয়নফরম সংগ্রহ করেননি। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে গতকাল জাপার মনোনয়নফরম সংগ্রহ করেছেন দলের দুই প্রেসিডিয়াম সদস্য হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন ও আলমগীর সিকদার লোটন।
