বাহুল্যবর্জিত কাজের মধ্যে সৌন্দর্যটা অন্যরকম

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:১১

মুস্তাফা খালীদ পলাশ

স্থাপত্য বিভাগ থেকে পাস করে বের হয়েছি প্রায় একত্রিশ বছর হয়ে গেল। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগ থেকে আমি বের হই। বের হওয়ার পর কিছুদিন স্থাপত্য পেশা নিয়ে চর্চা করি। পঞ্চম বর্ষের শেষ দিকে একটা জুরি হয়। মনে পড়ে, সে সময় একটা ভয়াবহ বন্যাও হয়েছিল। তাই আমরা জুরি দিতে পারিনি। কিন্তু আমরা আমাদের প্রজেক্ট সাবমিট করেছিলাম। ব্যাপারটা ছিল এরকম—ঐ প্রজেক্ট সবার সামনে উপস্থাপন করতে হয়। শিক্ষকদের সামনে কথা বলতে হয়। বলে রাখি, বরাবরই আমি ক্লাসের ভালো ছাত্র ছিলাম। আর রেজাল্টেও প্রথম দিকেই থাকতাম। আমরা ঠিক করলাম, ঐ জুরি বোর্ডে দাঁড়াব না। মডেল জমা দেব। আমাদের শ্রেণিশিক্ষক বললেন, ‘তোমাদের একটা পার্সেন্টিজ মার্কস কেটে দেব!’ শেষমেশ কোনো একটা কারণে আমাদের শূন্য দেওয়া হলো থিসিসে। ঐ শূন্য দেওয়াতে আমি দ্বিতীয় স্থানে চলে এলাম। আর বলা হলো দুই বছর পর্যন্ত কাউকে শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে না। তা নাহলে শিক্ষক হিসেবেই ওখানে জয়েন করতাম। আরেকটা ব্যাপার ছিল যে বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে কোনো রিকমেন্ডেশন দেওয়া হবে না। তখন আর কী করা, কিছুই করার নেই। ঐ অবস্থায় জীবনের একটা নতুন ইনিংস শুরু হলো। কারণ বাবা তখন সদ্য রিটায়ার্ড। উনার ওরকম অগাধ সম্পদ বা প্রাচুর্য ছিল না। তিনি শিল্পী ছিলেন। সব মিলিয়ে খুব কঠিন একটা সময়। খুব কষ্ট করে দুই-তিন বছর কাটিয়ে আমি বুয়েটে শিক্ষক হিসেবে জয়েন করি। ১৯৯৮ সালে বুয়েটে একটা আন্দোলন হয় ভর্তিপরীক্ষা নিয়ে। আগে স্থাপত্য ও প্রকৌশলে আলাদা আলাদা পরীক্ষা হতো। প্রকৌশলের ওরা যেহেতু সংখ্যাগুরু, ওরা চাপ সৃষ্টি করল, না সবার পরীক্ষা একসঙ্গে হতে হবে। কিন্তু স্থাপত্যটা আদতে প্রকৌশল পেশা নয়। ঐটার জন্য অসম্ভব মেধাবী হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। যাদের মনন আছে, শিল্পবোধ আছে এবং সৃজনশীলতা আছে, তারাই ভর্তি হতে পারে। এমনটাই হয়ে আসছিল ত্রিশ বছর যাবত। সে আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে, ঐ আন্দোলনে আমরা পরাজিত হই। কারণ, আমরা ছিলাম তাদের তুলনায় সংখ্যালঘু। তেরো জন একসঙ্গে ইস্তফা দিই। ইস্তফা দেওয়ার পর আমি আর জয়েন করিনি। এরপর ছোটখাটোভাবে স্থাপত্যের একটা অফিস খুলি। এখানে স্থাপত্যের নকশা প্রণয়নের কাজগুলো নিয়ে যখন ভাবছি—কী কী করা যায় (স্ট্রাগলিং একটা পিরিয়ড সেটা), ঠিক সে সময় বসুন্ধরা সিটির কাজটা আমার কাছে এলো। এটা একটা দৈব ঘটনাই ছিল। আমার বয়স তখন পঁয়ত্রিশ। এর পাশের প্লটে তখন ইউনিক ট্রেড সেন্টার হয়ে গেছে। ওটা দেখেই লোকজন প্রস্তাব নিয়ে আসে। আমার এত ছোট অফিস, আর সে সময় এত বড়ো একটা প্রজেক্ট! তাও ওই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে! প্রথমে ভেবেছিলাম, হবে না। আঠারো লাখ স্কয়ার ফিটের আয়তন—এত বড়ো সাইট! কিন্তু তারা নির্ভরতার সঙ্গে আমাকে কাজটা দিলেন। ওটা ছিল আমার জীবনে একটা বিশাল মাইল ফলক। আবার মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনেও প্রযুক্তিগত একটা মাইল ফলক। এরপর আমাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আর জন্মসূত্রেই আমি শিল্পী। আমার বাবা-মা দুজনই চারুকলার স্টুডেন্ট ছিলেন। ওদের থেকেই পেয়েছি আঁকাআঁকির ব্যাপারটা। ফলে ছবি আঁকায় একেবারে শৈশবেই হাতেখড়ি হয়েছে আমার। পরে এমন হলো—আমার ছবি আঁকার কারণে আমার বাবা ছবি আঁকা ছেড়ে দিলেন। কিন্তু আমার ইচ্ছে ছিল, আর্ট কলেজে ভর্তি হবো। কিন্তু বাবা চাইলেন না। কারণ তিনি জেনে গিয়েছিলেন, শিল্পীদের জীবন অনেক কষ্টের হয়। সারাজীবন কষ্টই করতে হয়। তার মনে হলো, আমি কষ্ট করেছি—ছেলে কেন করবে? ফলে আর্কিটেকচার নিয়ে পড়া। পড়তে গিয়ে দেখলাম, এখানে শিল্প আছে, প্রযুক্তি আছে, আর আছে একটা দারুণ সম্ভাবনা। সম্ভাবনা বলতে সচ্ছলতার সম্ভাবনা। কিন্তু ছবি আঁকাটা যেহেতু রক্তে আছে, তাই আমি এখনো ছবি আঁকি। ছবি আঁকাটা যেমন শিল্প, স্থাপত্যটাকেও আমি শিল্পের বাইরে দেখি না। সেভাবে দেখলে ফ্যাশন ডিজাইন যেমন শিল্প, তেমনি গাড়ির ডিজাইনও কিন্তু শিল্প। কিন্তু গাড়ির ডিজাইন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। একটি এয়ারক্রাফট ডিজাইন করা একটা বাড়ির ডিজাইন করার চেয়েও কঠিন। প্রযুক্তির প্রকোপ বেশি হলে শিল্পের স্বাধীনতা অনেক সময় ক্ষুণ্ন হয়। সেটা কী? এর পেছনে রয়েছে অর্থ। ঐ ক্ষেত্রে যে শিল্পটা হচ্ছে, তা অর্থ আহরণের একটা ক্ষেত্র। দ্বিতীয়ত, শিল্পটা কতটা রিকুয়ারমেন্ট দ্বারা আবদ্ধ? এরমধ্যেই কিন্তু আপনাকে কাজ করতে হচ্ছে! ক্লায়েন্ট যা যা বলবে, আপনাকেও তা-ই তা-ই করতে হবে। কিন্তু অন্যদিকে আপনি চিন্তা করেন, চারুকলা তো ওরকম কিছু না! এখানে শিল্পীর অনেক স্বাধীনতা আছে। আমার ইচ্ছে হলে আমি লাল রং দিলাম বা সাদা রং দিলাম। ওখানে কেউ হাত দিতে পারবে না। স্থাপত্যকে যেমন বলা হয় মাদার অব অল আর্ট ফর্ম। কিন্তু আমার কাছে কখনো কখনো তা মনে হয় না। কারণ যে ধারণা থেকে সৃষ্টি হয়, শেষপর্যন্ত তা পরিবর্তিত হতে হতে একই রকম আর থাকছে না। কারণ অনেক অ্যাবিউজ হয়। সুন্দর নকশা করা একটা ভবনে একটা বিলবোর্ড লাগিয়ে দিলে শিল্পের সেই সৌন্দর্যটা আর থাকে না। লুই কান আমাদের সংসদ ভবনের নকশা করেছিলেন। এখন পর্যন্ত সরকারের সদিচ্ছার কারণে তার কোনো রদ-বদল হয়নি। কিন্তু আমাদের মতো শিল্পীদের ক্ষেত্রে তো আর একই রকম নিয়ম খাটছে না। অনেকে প্রজেক্ট শেষ করার আগেই বাদ দিয়ে দেয় আর্কিটেক্টকে। ২০০৫-এর ডিসেম্বরে একটা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা হয়েছিল। (গ্রামীণফোনের মূল অফিসের ডিজাইনার ছিলেন খুব নামকরা আর্কিটেক্ট পিটার ব্রান। তিনিও ঢাকার এই গ্রামীণফোনের নকশা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছিলেন।) খুব হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের একপর্যায়ে গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিলেন, এর নকশাটা দেশের কোনো আর্কিটেক্টকে দিয়ে করাবেন। পরে ওভাবে কাজটা আমি পাই। যেটার ফলাফল আজকে ওরা পাচ্ছে। স্থাপত্যের মধ্যে স্থানীয় যে বিষয়গুলো আছে, যেমন :জলবায়ু, সংস্কৃতি, আমাদের ব্যবহার-বিধি; এটা কিন্তু বিদেশ থেকে এসে জানা সম্ভব নয়। ওটা যেহেতু নিত্যব্যবহারের একটা জায়গা, তাই তারা মনে করলেন দেশের আর্কিটেক্টই ভালো করতে পারবেন। আমি মনে করি, এটা অবশ্যই উন্নতমানের একটা স্থাপত্য। এখন পর্যন্ত অফিসের যে ধ্যান-ধারণা, তা আমূল পাল্টে দিয়েছে এই কাজ। অফিস হলো ক্লাসরুমের মতো—আমার যখন ইচ্ছে যেখানে খুশি বসব। প্রতিদিনই এক জায়গায় গিয়ে বসতে হবে—এই ধারণা থেকে এটা বেরিয়ে এসেছে। মূলত ব্যাপারটা কাজের। অফিস যখন একজনকে হায়ার করে, সেক্ষেত্রে কাজটা হচ্ছে কি না, এটা হলো গুরুত্বপূর্ণ। আপনার অ্যাসাইনমেন্ট ফুলফিল হলো কি না, এটা গুরুত্বপূর্ণ। কে কোথায় বসলেন, এটা গুরুত্ব বহন করে না। প্রতিষ্ঠানটি যেহেতু একটা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কোম্পানি, ডিজাইন ব্রিফিংয়ে আমরা জানতে পারি, ওদের সমাজ-সচেতনতা অনেক বেশি। সমাজে কোনো কিছু ওরা জোর করে প্রতিস্থাপন করতে চায় না। ওরা যেটা বলেছিল, সেটা হলো ‘গিভ মোর আর্থ’। যার অর্থ হলো, আমরা পৃথিবী থেকে নিচ্ছি প্রতিনিয়তই কিন্তু দিচ্ছি না কিছু। তো সেই ধ্যান-ধারণা থেকে শুরু হয় কাজটা। কাজটা ভৌতভাবে করাটা কতটা সম্ভব হয়েছিল, আমি জানি না, কিন্তু মানসিক ও দার্শনিকতার জায়গা থেকে সম্ভব হয়েছিল অনেকটাই। এর মাঝখানে একটা জলচত্বর আছে। ওখানে পানি কিন্তু বাইরে না এসে ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে যেটা হয়, ফোয়ারার পানি কিন্তু বাইরে চলে আসে। কিন্তু এখানে আমরা দার্শনিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেছি—আমি তোমার কাছ থেকে যা নিচ্ছি, তা আবার তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আর ওখানে কারো নির্দিষ্ট কোনো বসার জায়গা নেই। এমনকি ম্যানেজিং ডিরেক্টরেরও আলাদা কোনো রুম নেই। ওখানে যখন একত্রে সবাই কাজ করে—কে ম্যানেজিং ডিরেক্টর, কে সাধারণ এমপ্লয়ি, তা বোঝার কোনো উপায় নেই। ওখানে সবার এক রকম চেয়ার! আরেকটা মজার ব্যাপার হলো, ২৬০০ লোক অফিস করে, কিন্তু চেয়ার আছে ২০০০। এটা ওভাবেই অপটিমাইজ করা। আপনি বাইরের বাতাস যত ঢোকাচ্ছেন, এয়ার কন্ডিশনের লোড বেড়ে যাচ্ছে। গরম বাতাস ঢুকছে, আবার বেরিয়ে যাচ্ছে। রিসাইক্লিং হচ্ছে।

এটাকে বলে ইনডোরিং লার্জমেন্ট কোয়ালিটি। তারপর যেমন ওখানের বিদ্যুত্টা নিজেই নিজেই উত্পাদিত হয়। কারণ বিদ্যুত্ তো সঞ্চালন করতে হয়। বিদ্যুত্ অনেক দূর থেকে এলে সিস্টেম লস্ট হয়। মূল রিকুয়ারমেন্ট ছিল, যদি আমি সরকারিভাবে বিদ্যুত্ নিতাম, তাহলে লাগত সাড়ে চার মেগাওয়াট। এটা তো একটা ভবনের জন্য অনেক। তারপর আমরা চিন্তা করলাম, বিদ্যুত্ নিয়ে জেনারেটর লাগাতে হবে। জেনারেটর কী করে? জেনারেটর কিন্তু তাপ ছেড়ে দিচ্ছে। গরম বাতাস যেটা, সেই গরম বাতাসকে ওখানে কাজে লাগানো হয়েছে। পরে দেখলাম, জেনারেটরের বদলে যদি আমরা টারবাইনে যাই, তাহলে গরম বাতাস দিয়ে শতভাগ এয়ার কন্ডিশনের কাজ করতে পারছি। এটা একটা ইন্টারেস্টিং কেমেস্ট্রি। টারবাইন থেকে যে গরম বাতাসটা বের হচ্ছে, সেই গরম বাতাস দিয়ে চিলারগুলো চলছে। ফলে দেখা গেল ৬৫ পার্সেন্ট বিদ্যুত্ এয়ার কন্ডিশনের জন্য খরচ হয়—এই সিস্টেমে তা কাট হয়ে গেল। এসব জিনিস নিয়ে মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন একটি অফিস গ্রামীণফোন। তো স্থাপত্য পেশায় তো একুশ বছর হয়ে গেল। ল্যাব এইড কার্ডিয়াক হসপিটাল, বাংলা লিংক হেড অফিস, রবি হেড কোয়ার্টার, রেডিসন ব্লু বে ভিউয়ের মতো ভবনের নকশা তো করলাম! এখন যেটা ভাবি, প্রতিটা ভবন হতে হবে নিরাপদ। বাহুল্যবর্জিত কাজ হতে হবে। বাহুল্যবর্জিত কাজের মধ্যে সৌন্দর্যটা অন্যরকম। আমি বলি শাড়ির মতো সহজ-সুন্দর পোশাক তো আর নেই। লম্বা একটা কাপড়, যার মধ্যে কোনো সেলাই থাকে না। এই জিনিসটাই কত সুন্দর হতে পারে, তা নির্ভর করে পুরোটাই ব্যবহারের ওপর। কোথায় কুঁচি হবে, কোথায় আঁচল থাকবে—সবকিছু প্রেজেন্টেশনের ওপর নির্ভর করে। আর আমি মনে করি, মানুষ মাত্রই তার সামাজিক দায়বদ্ধতা থাকা উচিত। সে জায়গা থেকে অনেক চাপের মধ্যেও সহপাঠীরা মিলে একটি ফাউন্ডেশন দাঁড় করিয়েছি। মানসিকভাবে শুদ্ধতাবাদ চর্চা, শুদ্ধ সংগীতচর্চা থেকে শুদ্ধ শিল্পকলা চর্চা ছাড়াও চার জন মুক্তিযোদ্ধাকে মাসে খুব নগণ্য পরিমাণ হলেও আমরা অর্থ সহযোগিতা করি ওখান থেকে। আর দরিদ্র ছাত্রদের বিনা পয়সায় পড়াই। সেখানে যেমন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র আছে, তেমনি আছে আর্কিটেকচারের ছাত্র।

 

লেখক : ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ভিসতারা আর্কিটেক্ট প্রাইভেট লি.