লেখকের পথ

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:১১

ইমতিয়ার শামীম

আমাদের সেইসব ছাপড়া ছনের অথবা টিনের দোকানে কিংবা আট-দশটা হাঁটু বের করে বৃষ্টি-বর্ষায় জলসে াতের জন্য অপেক্ষমাণ টঙ দোকানগুলোর বেঞ্চ আর চেয়ারে, অলস মাচানে, টিলা হয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকা মৃত্তিকার ভিতে বেড়ে ওঠা গাছগাছালির গোড়ায় এখন কারা বসে জানি না; জানি না, কারা এখনো চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বিষণ্নতাকে বর্ণিল করে তোলে, আর কাদের মেঘত্রস্ত আকাশে বয়ে যায় বিধ্বস্ত রোদের নদী; জানি না, বিদ্যুত্ চলে গেলে এখনো টিমটিমিয়ে কুপিবাতি জ্বালিয়ে স্বর্গের চেয়েও আরাধ্য সেইসব ছাপড়া ও টঙ ঘরের আলো-ছায়ায় কারো জন্য প্রতীক্ষার ছন্দ দুলে ওঠে কি না। অজ্ঞাত, অব্যক্ত, অকথিত, অশনাক্ত—এমন অসংখ্য নির্ণায়ক লিখে চলে ভবিষ্যতের জন্য বিরল এক শোকগাথা। আর সেসবের সঙ্গে হয়তো লেখকের, হয়তো সাহিত্যের, হয়তো সৃজনের সাদৃশ্য লক্ষ করে ভারি বিস্মিত হই। লেখক না হয়েও, সাহিত্য সৃষ্টি না করেও শুধুমাত্র স্বপ্ন দেখার বৈভব থেকে এমন সব অর্জনকে সঙ্গী করে ফেলি আমরা, আর কেবলই হাঁটতে থাকি না ফেরার মাইলপোস্টের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে মনে করার চেষ্টা করি অতীতের আয়নায় বিম্বিত তাদের কাউকে; হয়তো সলজ্জ, হয়তো উচ্চকিত—কিন্তু চোখজুড়ে সিংহের কী প্রগাঢ় তপ্ত বেদনাই না ছিল আমাদের সেইসব সময়ের। উড়ে যাওয়া পাখির পড়ে থাকা পালক দিয়ে, সন্তান পরিত্যক্তা উদ্বাস্তু বয়সের ভারে ন্যুব্জ মায়ের অনেক কষ্টে কুড়ানো খড়কাঠি দিয়ে বুকের কুঠরিতে লিখে রাখি তারই এলিজি। এইভাবে আমরা লেখক সাজি, যেমন সাজি বাবা, যেমন সাজি মা, যেমন সাজি গোপাল—বড়ো সুবোধ ছেলে কিংবা ঐ হোথা কোনো হোতার দুর্বিনীত ফটিক, যেমন সাজি নম্র হৈমন্তী কিংবা দুরন্ত মৃন্ময়ী।

এইভাবে পৃথিবীর সকলের চোখেই লেখকের চোখ খুঁজে পাই; একদিন জেনে যাই, সকলের চোখেই থাকে তপ্ত দিনের অলখ বেলা। এইভাবে লেখকের অবয়ব দেখি সামনে, পেছনে, পাশে। তার সাহিত্য খেলা করে ফাগুন দিনের বাওয়ে, শ্রাবণমেঘের ধারায়। ধীরে ধীরে আরো বুঝি, এই লেখক, এই সাহিত্য আসলে অতীতের সমান বয়সী এক অতীত। আর তাই যাকে বলি তরুণ লেখক, বলি কনিষ্ঠ তিনি আসলে ধারণ করছেন সবচেয়ে দূরবর্তী অতীত, প্রতি মুহূর্তে ঝলমল করে ওঠা প্রতিটি তরুণ লেখকই আসলে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ সাহিত্যিক। কেননা অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত্—একজন লেখককে বসবাস করতে হয় এসবের সবখানেই। অতীতকে বাদ দিয়ে তিনি নির্মাণ করতে পারেন না, করতে জানেন না, করা সম্ভবও না কোনো কিছু তার পক্ষে। তিনি কখনো অতীতে বসবাস করেন না বটে, বর্তমানেই তার চিরঅধিবাস বটে, কিন্তু অতীত তার সঙ্গেই হাঁটতে থাকে, জেগে থাকে, ঘুমিয়ে থাকে; এই অতীত-বর্তমানের দোলাচলে বসবাস করতে করতে তার চিরঅনুসন্ধিত্সুতা জাগে ভবিষ্যেক ঘিরে। যদিও ভবিষ্যত্ বলেও তো কোনো কিছু নেই। কেননা প্রতি মুহূর্তে ভবিষ্যত্ বিলীন হচ্ছে, ভেঙে পড়ছে, ডুবে যাচ্ছে বর্তমানের গহ্বরে, ঠিক যেমন প্রতি মুহূর্তে বর্তমানও আবার হারিয়ে যাচ্ছে অতীতের গহ্বরে।

তা হলে বর্তমান নয়, ভবিষ্যত্ও নয়—অতীতই একমাত্র অবিনশ্বর, অতীতই একমাত্র অমর! এই সত্যি একজন মানুষকে অথবা একজন লেখককে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলে, তিনি আতিপাতি করে খুঁজে ফেরেন অতীতকে—কিন্তু কোনখানে খুঁজে পাবেন হারিয়ে ফেলা ঐ সোনার হরিণকে! অতীতকে ছাড়া চলতে পারে না বর্তমান; আর এই দুর্বিনীত বর্তমান কিনা নিজেকে দৃশ্যমান করে তুলতে অতীতকে নেপথ্যে রেখে দিতে চায় দুরন্ত স্পর্ধায়। ত্রিকালকে ঘিরে একজন লেখকের এই যাতনা, এই ট্রমা আর কিছুতেই কাটে না। একজন লেখকের চিরঅধিবাস এই ট্রমার ভেতর, যা তার লেখার ইচ্ছেকেই ক্ষত-বিক্ষত করে তোলে, যা তাকে ঠেলে দেয়, লোকে যাকে বলে রাইটার্স ব্লক, সেই যন্ত্রণাকর কুঠরির মধ্যে। আমরা আতিপাতি করে স্মৃতিঘরের অন্ধকারে এখনো টনটনে, আলো ঝলমলে দিগন্তের দিকে চলে যাওয়া পথ খুঁজি, বিবিধ ছাপড়া দোকান খুঁজে ফিরি, টঙ দোকানের সামনে পড়ে থাকা নিঃসঙ্গ বাঁশের মাচান খুঁজি, খুঁজে ফিরি নিঃসঙ্গতায় পাখি আর মেঘদল উড়িয়ে দেওয়া সুদীর্ঘ আকাশ, চায়ের কাপের তলানিতে পড়ে থাকা চা-পাতা আর তার সঙ্গে মিশে থাকা বিবিধ কালো জিরা অথবা বর্ণচোরা আরশোলার দলছুট মলদানা, ক্ষুধার্ত অর্থশূন্য মফস্বলী ছাত্রের জন্য মায়ের মমতা জমিয়ে রাখা বাসি সব সিঙারা-ডালপুরি...। হা মানবচৈতন্য, কোন বনে বাস কর তুমি? চোখের সামনে খুনোখুনি, হানাহানি, ধর্ষণ, ক্রন্দন, অসহায়ত্বের তীব্র কুঠার আর চোখের অন্তরালেও কোনো এক গুপ্তঘাতক! অতটুকু সাংস্কৃতিক কেউই হতে পারি না যে কলমকে অসি বানিয়ে ছুটব ভবিষ্যতের দিকে, কলমকে অশ্রু বানিয়ে ভাসাব তরী। অতএব স্থবির হই, নিশ্চুপ হই, স্থাণু হই... রাইটার্স ব্লকের ধকল সইতে সইতে লেখক হিসেবে মৃত্যুর দিকে ছুটে চলি আমরা।

তবু গতানুগতিক কত প্রশ্নের অবিরাম হাতছানি, অন্তহীন জিজ্ঞাসার ভারি ধকল লেখককে নিষ্কৃতি দেয় না। বিতর্কও পিছু ছাড়ে না। আপনি তো মধ্যবিত্ত, তা হলে কী করে নিম্নবিত্ত আসে আপনার লেখাতে? কী করে উচ্চবিত্তকে চেনেন আপনি? কৃত্রিমতা আসে না, মনে হয় না রাবার রাবার? শুনতে শুনতে সংশয় জাগে, তা হলে কি সস্তা হাততালি পেতে, গণমানুষের লেখক হওয়ার স্থূল লোভে লেখক সারা জীবন ধরে ছুটে চলেছে কিংবা ঘুরপাক খাচ্ছে অচেনা এক পরিধি ও বৃত্তে—আর এই মোহে নিজেকেও ভালো করে তার নেড়েচেড়ে, উল্টে পাল্টে দেখা হয় না কোনো সময়! তুচ্ছ মধ্যবিত্তের কাহনই সে গাথতে পারে না দিনের শেষে! মধ্যবিত্ত লেখক, তবু মধ্যবিত্তের জগেকই সে ধরতে পারে না নিবিড় করে! কে তাকে সান্ত্বনা দেবে—এও তো এক জীববৈচিত্র্যময় জগতেরই মতো, নিবিড় এক শৃঙ্খলের মতো, সেখানে বিত্তবান যেমন হন্যে বিত্তের পিছে পিছে, তেমনি বিত্তের পিছে হন্যে মধ্যবিত্তরাও। লেখক যার কথাই লিখুন না কেন, মোটের ওপর এটাই সত্য যে তাকে তিনি যেভাবে চিনেছেন, বুঝেছেন, ধরতে পেরেছেন, সেভাবেই উন্মোচন করেছেন। হয়তো কোনো শীতের রাতে। হয়তো কোনো ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়া দুপুরে কিংবা বৃষ্টিতে ধূসর সাতসকালে। লেখক একজন নারী, লেখক একজন পুরুষ, লেখক একজন কিম্পুরুষ। লেখক একজন উচ্চবিত্ত, লেখক একজন মধ্যবিত্ত, লেখক একজন নিম্নবিত্ত। লেখক মানেই প্রেমিক, লেখক মানেই প্রেমিকা। লেখক মানেই ব্যর্থ প্রেমিক, লেখক মানেই ব্যর্থ প্রেমিকা। সেই যে কতকাল আগে নাকি দীর্ঘ এক মৌসুমজুড়ে দৈনিকের ভেতরের পাতায় সিঙ্গেল কলামে বিজ্ঞাপন দেখা গেছে, সগৌরবে চলিতেছে—তৃতীয় সপ্তাহে ‘একই অঙ্গে এত রূপ’, লেখক সেই এত রূপের পসরা সাজিয়ে বসেন বিবর্ণ, রূপহীন, বীভত্স, কুশ্রী হওয়ার পরও। তার এই বিবর্ণতা, রূপহীনতা, বীভত্সতা আর কদর্যতা আরো বাড়তে থাকে, কেননা তাকে মূলত দাঁড়াতে হয় ছোট কাগজের কাছে। কেননা তাকে সত্যিকারের আশ্রয়, প্রশ্রয় দিতে পারে বোধ করি ছোট কাগজই।

কিন্তু কেন প্রশ্ন উঠছে ছোট কাগজের? যে প্রশ্ন ওঠার অর্থই হলো নীরবে বড়ো কাগজের কথা মনে করিয়ে দেওয়া? এমন প্রশ্ন ওঠে, কেননা কর্পোরেট জগত্ লেখককে বাধ্য করতে চায় বড়ো কাগজের দিকে ফিরে তাকাতে। সাড়ম্বরে সে প্রথমেই মনে করিয়ে দেয়, আমাদের প্রচারসংখ্যা এখন এত লাখ এত হাজার ছুঁয়েছে, আমরাই তোমাকে পৌঁছে দিতে পারি ঘরে ঘরে। ছোট কাগজ তোমাকে কখনো পরিচিত করে তোলতে পারে না, ছোট কাগজ তোমাকে কখনো প্রচার করবে না। আর ছোট কাগজ তো তোমাকে টাকাও দেবে না। এই অর্থময় আহ্বান ফেরানো সহজ নয়, বিশেষত যাদের স্মৃতিতে কোনো টঙ ঘর নেই, টঙ ঘরের সামনের বাঁশের মাচান নেই, যারা নিজেদের মুক্তি খোঁজার জন্য লিখতে শুরু করেনি, ট্রমা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য যাদের হাতে একদিন কলম কিংবা কি-বোর্ড উঠে আসেনি, যারা নিজেরাই নিজেদের আবিষ্কার-পুনরাবিষ্কার করার যন্ত্রণাকর পথে হাঁটেনি। এই বিশ্বসংসারে এই বিস্ময়ে জেগে ওঠা ক্ষুদ্র একটি প্রাণ নিয়ে নিজেকে তন্ন তন্ন করে খুঁজে ফেরা কী যে দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষার স্বাক্ষর, তা জানতে পারেন কেবল এমন এক লেখক! জগতের তাবত্ মানুষের নিষ্ঠুরতা তিনি আবিষ্কার করেন নিজেকে খুঁড়ে, আবার সেই মানুষের অবিনশ্বর প্রেমকেও তিনি উন্মোচন

করেন নিজেকে খুঁড়ে। একের পর এক অসংখ্য মানুষের পাঠ নেন তিনি, ধারণ করেন চারপাশের অভিজ্ঞতার নির্যাস, অবলোকন করেন প্রকৃতি—এইভাবে ব্যক্তির চোখ হয়ে ওঠে আরো অসংখ্য ব্যক্তির চোখ, সমাজের চোখ, শ্রেণী-বর্ণের চোখ; এ চোখের আর নির্বাণ ঘটে না, এ চোখ আর নিষ্কৃতি পায় না। নির্বাণ আর নিষ্কৃতির তীব্র যন্ত্রণায় সে কাগজের পর কাগজে বাক্যের পর বাক্য সাজায়, নিজেকে হাতড়ে ফেরে, অসন্তুষ্ট হয় এবং অবশেষে অপরাধীর মতো মুখোমুখি হয় পাঠকের। তার লেখা বেঁচে থাকে ‘অমুকের লেখা’ হয়ে, তার লেখা মরে যায় ‘অমুকের লেখা’ হিসেবে। আর জনপ্রিয় কিংবা অজনপ্রিয়, যা-ই হোন না কেন, লেখক আর বোঝতে পারেন না, তাকে আসলে দণ্ডিত করা হয়েছে, তিনি আসলে চূড়ান্ত বিচ্ছিন্ন, ভীষণ এক অপরাধী; তাই তার বাক্য, ভাষা, ভাবনা, যন্ত্রণা, আনন্দ-উল্লাস কোনো কিছুই নামহীন হয়ে পড়েনি, তার লেখা প্রচলিত লেখা হয়ে ওঠেনি, হয়ে ওঠেনি অজ্ঞাতনামা কোনো লেখকের কথা।

যে লেখক এই আকাঙ্ক্ষার দুয়ারে গিয়ে দাঁড়ান, তার লেখা শেষাবধি হয়ে উঠুক ‘অজ্ঞাতনামা’ এক লেখকের লেখা, হয়ে উঠুক মলাট ও ইনার নষ্ট ও বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক গ্রন্থ, নিজের মৃত্যুদণ্ড নিজেই ঘোষণা করেন তিনি। কিন্তু মানুষকে দিয়ে যান পৃথিবীতে বিস্ময় নিয়ে বেঁচে থাকার অপূর্ব প্রাণশক্তি, সাহিত্যকে দিয়ে যান মানুষের সেই প্রাণে সঞ্চারিত হওয়ার অপার্থিব ক্ষমতা। এই প্রাণশক্তি আর ক্ষমতায় একটি টঙ দোকান, বিশীর্ণ নদী, গভীর হাওয়ার পথ, জুলজুলে চোখে তাকিয়ে থাকা লক্ষ্মীপেঁচাসমেত চালধোয়া জলের গন্ধমাখা করুণ হাতের স্পর্শে বিভোর হয়ে কখন যে তার মৃত্যু ঘটে, কেউ জানে না। অথচ মৃত্যুর পরও তিনি বেঁচে থাকেন ঝড়ের মুখে বাতি হয়ে।

 

লেখক : কথাসাহিত্যিক