জামাল ভুঁইয়া
আমার জন্ম ১৯৯০ সালের ১০ এপ্রিল ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেন শহর থেকে ১০ মিনিট পথ দূরত্বে। বর্নভিউ শহরে। এটাকে ফুটবলের শহর বলা হয়। তখনকার ডেনমার্কের ফুটবল অনেক বেশি উন্নত। ওরা ফুটবলের জন্য পাগল। এখনো বর্নভিউর লোকজনেরা ফুটবলের জন্য পাগল। তখন বেশি ছিল। আর ’৯২ সালে ডেনমার্ক ইউরোপিয়ান ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তখন তো পুরো ডেনমার্ক ফুটবলময় হয়ে উঠল। আমাদের এলাকার সব ছেলে ফুটবলে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমরা স্কুল ছুটির পরই ফুটবল নিয়ে বাগানে মেতে উঠতাম। রাস্তায় রাস্তায় ফুটবল খেলতাম। আমার বাসার সামনে একটা মাঠ ছিল। এই মাঠে যখন খেলতে ঢুকলাম, প্রথম দিনেই আমি মারামারি করলাম। তখন আমার বয়স ৯। আমার চেয়ে আট-দশ বছরের বড়োদের সঙ্গে খেলতে গেলে তারা আমাকে নেবে না। কথা কাটাকাটিতে একটা সময় মারামারি হয়। ওখানকার ইউরোপের বিভিন্ন দেশের ছেলেরা আমাকে মারল। ওরা বলল, তুমি পারবে না। আমি বললাম, পারব। এই নিয়ে মারামারি। তারপরও আমি বলছি, আমি পারব। শেষে পাঁচ জন মিলে মারল। অনেক মার খেয়েছি। এরপর ওরা নিজেরাই বলল, আচ্ছা তুমি খেলো। আমি খেললাম। লেভেল ‘এ’ দলের বিপক্ষে লেভেল ‘ফাইভ’ দলের খেলা। লেভেল ফাইভ জিতল। তখন যারা মেরেছিল, তারা তো অবাক! বলছে, কিরে লেভেল ফাইভ তো খারাপ জানতাম, তারা জিতল কীভাবে? আমি লেভেল ফাইভে খেলেছি। তারপর থেকেই আমি ফুটবলে সবার চোখে পড়লাম। আমি বর্নভিউ ক্লাবে খেললাম। এভাবে খেলতে খেলতে একটা সময় ১৫ বছর বয়সে সবচেয়ে বড়ো ক্লাব কোপেনহেগেন এফসি ইয়ুথ দলে খেলেছি। এই সময় ওরা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলেছে। আমার বয়স তখন ১৬। আমি সন্ত্রাসী হামলার শিকার হই। স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলাম। আমার বাসার সামনে সন্ত্রাসীরা বলছিল, তুমি এখান থেকে সরে যাও। আমি বললাম, কেন যাব, এটা আমার বাসা। আমি এখানেই থাকব। সন্ত্রাসীরা যে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি করবে, সেটা আমার জানা ছিল না। একটা সময় সন্ত্রাসীদের দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি হয়। ডান হাতের কনুইয়ে একটা গুলি লাগে। একটা হার্টের নিচে। বুকের পাশে আরো দুটো গুলি লাগে। আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। হাসপাতালে ছিলাম ছয় মাস। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে চোখের পানি ফেলে বালিশ ভিজিয়েছি। বারবার মনে হতো, আমি ফুটবল খেলতে পারব না। ফুটবলের জন্য এত মার খেলাম! কিন্তু আমার স্বপ্নের ফুটবল কবরে চলে গেল। বারবার সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতাম আর বলতাম, আমি ফুটবল খেলতে চাই। ফুটবলের জন্য বড়োদের সঙ্গেও মারামারি করেছি। আমার ভালোবাসার ফুটবল এভাবে শেষ হয়ে যাবে! এসব কথা মনে করে তখন কাঁদতাম। আমার মনে হতো, এখন শুধু স্কুলে যেতে হবে। আর ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। অন্য কোনো পেশায় থাকতে হবে। ডেনমার্কে চিকিত্সা ফ্রি, শিক্ষা ফ্রি। আমি ভালো মানের চিকিত্সা পেয়ে যখন বাসায় ফিরে আসি, তখন মাঠের দিকে চেয়ে চেয়ে সৃষ্টিকর্তাকে বলতাম—ফুটবল আমি খেলবই। ফুটবল মাঠ আমাকে টানত।
দাদা ৬০ দশকের শুরুতে, বাবা ইনসান ভুঁইয়া ৬০ দশকের শেষে ডেনমার্ক যান। মা রাজিয়া আক্তার। বড়ো ভাই জনির ’৮২ সালে, মেজো ভাই জামিলের ’৮৭ সালে, আর আমার জন্ম ’৯০ সালে ডেনমার্কে। আমাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের নান্দাইলে।
আমি ফুটবল খেলে প্রথমবার আয় করি দেড় হাজার ডলার। ২০১১ সালে ডেনমার্ক থেকে ফিলিপাইনে ফুটবল খেলতে গেলাম দেড় বছর। ফিরে এসে বাংলাদেশ হতে আমন্ত্রণ পাই। কোচ সাইফুল বারী টিটু আমাকে ঢাকায় আসতে বলেন। আমি ২০১৩ সালে বাংলাদেশে আসি। বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ দেশের বাইরে যেতে চান। আমি ছিলাম বিপরীত। আমি বাংলাদেশে আসতে চাই। আমার বাবা-মায়ের মুখে বাংলাদেশের কথা শুনেছি। এদেশের মানুষ যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। কত মানুষ রক্ত দিয়েছে। মারা গেছে অনেক মানুষ। এখানে স্মৃতিসৌধ, শহিদ মিনার রয়েছে। বাবা-মায়ের মুখে এদেশের মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-আনন্দ সবকিছুই শুনেছি। আমার মা আমাকে ছাড়তে চাইতেন না। আমার বাবা আমাকে দেশে আসতে বলতেন। এটাও বলতেন, এখন না গেলে ১০ বছর পর আফসোস করবে। আমিও বুঝতাম, বাংলাদেশে আমার বাবা-মায়ের জন্ম। সেখানে গিয়ে দেখতে চাই, দেশটা কেমন। আমার বাবা-মা আমাকে বলতেন, তুমি যদি পারো তাহলে বাংলাদেশের দরিদ্র মানুষদের সহযোগিতা করো। যতটুকু পারো করো। আরেকটা কথা বলতেন, তোমাকে সব সময় বাংলাদেশের মানুষকে সম্মান করতে হবে। যারা গরিব, তাদের ছোট করে দেখবে না। বাবা বলতেন, মনে রাখবা, তুমি একজন বাংলাদেশি। আমিও সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম। ঢাকায় খেলার আমন্ত্রণ পেয়েই সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাইনি। কারণ আমি ছয়-সাত বছর বয়স থেকে স্বপ্ন দেখতাম পেশাদার ফুটবলার হব।
২০১৩ সাল হতে বাংলাদেশে ফুটবল খেলছি। ‘শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাব’ দিয়ে ফুটবল শুরু করি। শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রের হয়ে আমি এখন ‘সাইফ স্পোর্টিং ক্লাব’-এ খেলছি। তিনটা ক্লাবে খেলছি। কিন্তু আমার বাবা বলছেন, মোহামেডান-আবাহনী বড়ো দল। আমার বাবা আবাহনীর সমর্থক। আমি মোহামেডান-আবাহনীতে এখনো খেলিনি, যখন সময় হবে তখন খেলব। এটা নিয়ে আমার কোনো আফসোস নেই।
বাংলাদেশের ফুটবলে টিকে থাকার জন্য আমি পরিশ্রম করছি। আমার ভেতরে ক্ষুধা আছে। অনুশীলন করার ক্ষুধা, ভালো খেলার ক্ষুধা। একারণে আমি অনেক বেশি অনুশীলন করি। যখন ফাইট করব, তখন নিজের পজিশনটা শক্তিশালী হবে। আমার ভেতরে জেদ ছিল, অনুশীলনের ভয়ে পালিয়ে যাই না। যেভাবেই হোক নিজেকে প্রমাণ করি। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করি।
বাংলাদেশের মাঠে প্রথম যেদিন ম্যাচ খেলতে নেমেছিলাম, সেটা ছিল আমার সবচেয়ে সুখের স্মৃতি। জাতীয় দলের অধিনায়ক হয়েছি ইন্দোনেশিয়ায় জাকার্তা এশিয়ান গেমস হতে। ক্যারিয়ারের আরো একটি সুখের স্মৃতি হলো, আমার গোলেই কাতার হেরেছে। কাতার অনেক শক্তিশালী ফুটবল দল। কাতারকে হারানো অনেক কঠিন ছিল। দুঃখের স্মৃতি ঐ যে বললাম, সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিলাম। গোলাগুলির মাঝখানে পড়েছিলাম। অধিনায়ক হওয়ার পর বুঝতে পারছি আমার ওপর দায়িত্ব অনেক। আমি ভালো না খেললে মানুষ আমাকে ভালোভাবে দেখবে না। আমি অধিনায়ক হওয়ায় আমার ওপরই অভিযোগের তর্জনি উঠবে। আমি যখন দেশের হয়ে মাঠে নামি, জাতীয় সংগীত বেজে উঠলে আমার শরীরের লোম দাঁড়িয়ে যায়। আমি আবেগতাড়িত হয়ে উঠি। ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ এই জাতীয় সংগীত আমাকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করে। এই জাতীয় সংগীত আমার ভেতরে। এটা আমার দেশ। আমি জাতীয় সংগীত শুদ্ধভাবে গাইতে শিখেছি। সেজন্য গুগোলের সাহায্য নিয়েছি। যখন বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ভারতের বিপক্ষে ১-০ গোলে এগিয়ে ছিলাম, ২ মিনিট বাকি থাকতে গোল খেয়ে গেলাম, আমি সারারাত ঘুমাতে পারিনি! ভারতের দর্শকরা আমাকে বলছিলেন, বাংলাদেশের বিপক্ষে তারা অনেক গোল করবে। সাংবাদিকরাও বলছিল, গোলে ভাসিয়ে দেবে। মনে পড়ে, আমি প্রেস কনফারেন্সে বলেছিলাম, আমি ভারতীয়দের হূদয় ভাঙব! সেই সাংবাদিকেরা খেলার পর প্রেস কনফারেন্সে আমাকে স্যরি বলে ক্ষমা চেয়েছে। বলেছে, এই জয় তোমাদেরই প্রাপ্য। ড্র হওয়ায় আমাদের কিছু মানুষ খুশি ছিল আর আমার খুব রাগ হচ্ছিল। সেদিন সল্টলেকের মাঠে আমি জেতা ম্যাচটা হেরেছিলাম। খুব মন খারাপ ছিল না। সারারাত ভেবেছি কেন ড্র করলাম। কোনো খেলোয়াড়ের সঙ্গে রাগ করিনি। কারণ আমরা একটা টিম। জিতলে সবাই জিতেছি, হারলে সবাই হেরেছি।
ফুটবল খেলে যে পারিশ্রমিক পেয়েছি, সেটা ডেনমার্কে স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ করেছি। এরই মধ্যে ১০ হাজার ডলার পেয়েছি। বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে আমার স্বপ্ন অনেক। দেশের ফুটবলে কিছু একটা উপহার দিতে পারলে খুশি হতাম। সামনে বিশ্বকাপ ফুটবলের ম্যাচ বাকি রয়েছে। যদি ভালো কিছু করতে পারি; তাহলে দেশের মানুষও খুশি হবে। সবার সহযোগিতা চাই, ভালোবাসা চাই।
লেখক : বাংলাদেশ জাতীয় দলের ফুরটবলার
