এলিটা করিম
খুব ছোটবেলা থেকেই গান করি। বলা যায়, স্কুলে থাকতেই গানে হাতেখড়ি। বাবার চাকরিসূত্রে আমার কৈশোর কেটেছে সৌদি আরবে। বাংলাদেশে আসা হয়েছে পড়াশোনার জন্য। ইউনিভার্সিটিতে ঢোকার পর একটা সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হই, সাংস্কৃতিক গংগঠনটির নাম নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। নর্থ-সাউথের আরেকটি সংগঠন সিনে অ্যান্ড ড্রামা। এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে নাটকের জন্যও অনেক সময় ব্যয় করা হয়েছে। শিল্পকলায় আমাদের নাটক মঞ্চস্থ হতো। শিল্পকলার এক্সপেরিমেন্ট হল হওয়ার আগে ওসমানী মিলনায়তন ও জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনের মতো জায়গাগুলোতে নাটক মঞ্চস্থ হতো। দর্শকও হতো যথেষ্ট।
নাটকের ক্ষেত্রে সিনে অ্যান্ড ড্রামা থেকে আমাদের সে নাটকগুলো মঞ্চস্থ হতো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁরা ড্রামা ও থিয়েটার ডিপার্টমেন্টের শিক্ষক, তারা আমাদের ট্রেনআপ করাতেন। নাটক-গান—এ সবই তো শিল্পকলার একেকটি আলাদা আলাদা মাধ্যম। কিন্তু সূত্র এক। মূলত সৃষ্টিরই বহিঃপ্রকাশ।
থিয়েটার-গান এগুলো নিয়েই মেতে থাকতাম বেশি। যে কারণে পড়াশোনার জন্য সময় বরাদ্দ কমে যাচ্ছিল। ওই সময়ে ‘ব্ল্যাক’ নামে একটা ব্যান্ডদলের কথা জানতে পারি। ব্ল্যাকের ড্রামার ছিলেন টনি ভাই। একইসঙ্গে তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক সংগঠকও ছিলেন। ব্ল্যাক থেকে যখন প্রথম অ্যালবাম বের হবে হবে করছে। একদিন টনি ভাই বললেন, আমরা একটা অ্যালবাম বের করতে যাচ্ছি, তুমি কি আমাদের আমাদের সাথে গান করবে?
শেষ পর্যন্ত ওখান থেকেই আমার প্রথম গান রেকর্ডিং হয়। এরপর আমার একটা দল হলো, নাম ‘রাগা’। আমার ক্যাম্পাস নর্থ সাউথের বেশ ক’জন এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। তবে ওই ব্যান্ডদলটা বেশিদিন টেকেনি। কারণ ‘রাগা’র সদস্যদের অনেকেই দেশের বাইরে পাড়ি জমাতে শুরু করে। পড়াশোনা, চাকরি ও নানা কারণে কেউই তখন রাগাকে ওইভাবে সময় দিতে পারছিল না। ফলে দলটা ভেঙে যায়।
গানটা আমার ভেতরে ছিল সবসময়। আমি তালিম নিয়ে কখনো গান শিখিনি। অনেকে যেমন বলে—গানের প্রতিভা গডগিফটেড একটা ব্যাপার। আমার কাছে এটা কখনো মনে হয়নি। ভালো লাগার জায়গা থেকে গান করে আসছি। অনেক সময় ভালো হয়, অনেক সময় হয় না। ভালো হলে অনেকে নিজে থেকে প্রশংসা করে। কাজের ক্ষেত্রে আমার ভালো লাগাটাকেই সবসময় গুরুত্ব দিয়েছি। সাংবাদিকতা ভালো লাগত, ফলে পেশা জীবনের শুরু থেকে সাংবাদিকতার সঙ্গে আছি। লেখালেখির প্রতিও আগ্রহ আছে, সময় পেলে লেখারও চেষ্টা করি। তারপর যেমন আমার শিক্ষকতা ভালো লাগে। পার্ট-টাইম শিক্ষকতা করি। এভাবে দেখা যাচ্ছে যে, একটু একটু করে অনেক কিছুই করেছি।
গানটাকে মূলে রেখে আমার অন্যান্য কাজের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়া। এখন পেছনে তাকালে মনে হয়, কী করিনি? অ্যাঙ্কর থেকে হোস্ট, টিভি টকশো সবই করেছি! এগুলোর সবই আমার কাছে একেকটি অভিজ্ঞতা। রেডিও ফূর্তিতে সেলিব্রেটি আরজে ছিলাম কিছুদিন। রেডিও ফূর্তি সেলিব্রেটি আরজে হিসেবে আমাকে প্রস্তাব দিলে আমি সম্মতি জানাই। সেটাও আমার জন্য ছিল নতুন এক অভিজ্ঞতা। অবশ্য তখন সেটা অনেকেই করেছেন। তাহসান ভাই, জোহাদ, সুমী আপাও সেলিব্রেটি আরজে হিসেবে ছিলেন। এসবের মধ্যে চলচ্চিত্রে গান করাটাও একদিন হয়ে গেল। তবে আমার কণ্ঠটা যেহেতু একটু র—সেকারণে হয়তো এখানকার চলচ্চিত্র ট্র্যাডিশনের সঙ্গে আমি যাই না। এরকম কণ্ঠ ভারতে চলে। বাংলাদেশে এখনো এর চল শুরু হয়নি। ইমন সাহা, বাপ্পা মজুমদার, অর্ণব, হাবিব, অদিতের সঙ্গে প্লেব্যাক করা হয়েছে। এই আমার চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক অভিজ্ঞতা। রেকর্ডিং গান আমার ভালো লাগে না। তারচেয়ে লাইভ গাইতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। রেকর্ডিংয়ে অনেক ভুল-ত্রুটি ধরা পড়ে। লাইভে সেটা হয় না। আর আত্মতৃপ্তির কথা যদি ওঠে তাহলে বলব—কোনো গান গেয়ে বোধহয় একজন গায়ক তৃপ্ত হতে পারে না, আমার ক্ষেত্রেও বলব ব্যাপারটা এরকম যে, তৃপ্ত হতে পারি না। তবু বলব, প্রিন্স মাহমুদের কথা ও সুরে করা ‘কবি’ শিরোনামের একটা গান গেয়ে খুব ভালো লেগেছিল আমার। ওটা ছিল মিক্সড অ্যালবামের গান।
অনেকেই জানেন—মিক্সড অ্যালবাম করেই আমার গানের ক্যারিয়ার গড়ে উঠেছে মূলত। যখন থেকে গান করি, তখন থেকেই লোকজন নামটা জানত। এরমধ্যে বেশকিছু গান শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। একক অ্যালবাম করার দিকে তেমন নজর দিইনি।
সৌদি থেকে আসি ২০০১ সালে। তখন এতকিছু বুঝতাম না। ভাষাটাও ঠিক করতে সময় লেগেছিল। তখন যা পেতাম তা-ই করতাম। গান, নাটক সব। ইংলিশ কাভার সং, দেশের কিছু গান—তখন ইচ্ছেমতো করতাম। ইংলিশ কাভার সং এখনো করি। অন্যদের মতো কোনো পরিকল্পনা আমার কখনো ছিল না। ডেইলি স্টারে ষোলো বছর ধরে আছি। দেশে আসার দু-এক বছর পরই ডেইলি স্টারে জয়েন করি। এতদিন ধরে অনেককিছু করেছি। এখন আয়নার সামনে দাঁড়ালে যেটা মনে হয়—আমি আসলে মিডিয়ার মানুষ ছাড়া আর কিছু নই। কোটি কোটি মানুষ না চিনলেও হাজার মানুষ তো আমাকে চেনে! ওরা জেনে গেছে আমি কী ধরনের গান করি। আমার গানের রুচি কেমন। সে কারণে আমার গানের পরিমাণ তুলনামূলক কম। কিন্তু সেটা নিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই। কারণ আমি সবসময় কাজের মধ্যেই আছি। অন্যকিছু ভাবার হয়তো সুযোগও নেই। আমি আমার ধাঁচের গানগুলোই করে আসছি এ যাবত্। এ পর্যন্ত অনেক মিউজিক ডিরেক্টরের সঙ্গেই কাজ করেছি। আইয়ুব বাচ্চু, বাপ্পা মজুমদার হাবীব, অর্ণব, ইমন সাহা, অদিত। আমি যাদের সঙ্গেই কাজ করেছি—আমার একটা আলাদা কমফোর্ট জোন বের করে নিয়েছি। কমফোর্ট ফিল করাটা আসলে নিজের কাছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মিউজিকের ধরন বদলেছে। বদলেছে মিউজিকের ক্যাম্পেইন। মিউজিক এখন প্রযুক্তিনির্ভর অনেক বেশি। মিউজিকের ডিজিটাল মার্কেটিং এখন শুধু বাংলাদেশেই হচ্ছে না, বিশ্বব্যাপী হচ্ছে। বরং বাংলাদেশ টেকনোলজির দিক থেকে অনেক পিছিয়ে। সিডির মার্কেট নেই বলে তো মিউজিক থেমে থাকবে না। উন্নত দেশগুলো মিউজিকের প্রচার প্রসারে অ্যাপসকে কাজে লাগাচ্ছে। মিউজিকের প্রচারের বেলায় আমরা যদি কেবল ইউটিউবের ওপর নির্ভর থাকি, তাহলে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি বেশিদিন টিকবে কি না সন্দেহ। আমাদের এখানে নতুন প্রযুক্তি আনতে হবে। লিভো এখন নিজস্ব কিছু অ্যাপস বের করেছে। যেখানে গান আছে আবার ফিকশনও আছে। প্রত্যেকটা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রির প্রযুক্তিবান্ধব ওঠাটাই আশা জাগানিয়া। ওই অ্যাপসগুলো গানের প্রচারকে সহজ করে দিচ্ছে। এটা একটা ভালো দিক যেকোনো শিল্পীর জন্য। তার মানে এই নয়—আমরা আগের সিস্টেম থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে গেছি। স্টেজ এখনো শিল্পীর বড় প্লাটফর্ম। শিল্পীর দাঁড়াবার জায়গা। স্টেজ শো আবেদন কোনো অংশেই কম নয়। প্লাটফর্ম যা-ই হোক—শিল্পীর সংগী-ইমেজ গড়ে ওঠাও একটা ব্যাপার।
আমার কাছে মনে হয়—গানের সুদিন বা দুর্দিন বলে কিছু নেই। ভালো গান সবসময় মানুষকে স্পর্শ করে। বিভিন্ন রিয়েলিটি শো থেকে অনেক শিল্পী বেরিয়ে এসেছেন। যারা টিকে আছেন, তারা তাদের কোয়ালিটি দিয়ে টিকে আছেন। কোনাল, মাহাদি, লিজা, সাব্বির, ইমরান, নিশীথা—ওরা ভালো গান করেই টিকে আছেন। এগুলো আমাকে আশাবাদী করে। অন্যদের গানের পাশাপাশি মৌলিক গান সবারই থাকা দরকার। আর যে শুধু গানই করে, তাকে গানটা প্রফেশনালি নেওয়া উচিত। কারণ একজন শিল্পীরও পরিবার আছে। সে তো ব্যবসা-চাকরি কিছুই করছে না—সেক্ষেত্রে তার উপার্জনের অন্য কোনো উপায়ও নেই। শিল্পীকেও সারভাইব করতে হয়। দুঃখজনক হলো, আমাদের এখানে টিকেট কেটে কেউ গান শুনতে যায় না। যদিও ইদানিং এর পরিবর্তন ঘটছে।
শ্রোতার রুচি দিয়ে একজন শিল্পী গান করেন না। তার যেমন ধাঁচ, সেভাবেই তিনি গানটা করেন। শেষপর্যন্ত তাকে গেয়ে যেতে হয়। নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের তাই বলব—সততার সঙ্গে কাজ করে যাও। ভালো ভালো কাজ করো। অধুনা প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে কাজগুলোকে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দাও। সবার সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করো। বই পড়ো, এই পড়াটা খুব দরকার।
লেখক : সংগীতশিল্পী, সাংবাদিক
অনুলিখন: অথির চক্রবর্তী
