গ্রিন বিল্ডিং করতে জ্ঞান ও প্রযুক্তি কাজে লাগাতে হবে

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২০:১৩

তাসনীম তারিক

প্রায় ১০ বছর যাবত্ আমি অধ্যাপনার সঙ্গে যুক্ত। বুয়েটে আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টে যখন আমি পড়াশোনা করি তখন স্থাপত্যবিদ্যা কী, কীভাবে বিল্ডিং ডিজাইন করতে হয়, আমাদের সমাজে এটা কী কী ভূমিকা রাখে—এসব বিষয়ে জানতে পারি। আমার আসলে সবসময় সাসটেইনেবল ডিজাইন বা পরিবেশের জন্য উপকারি বা সহায়ক ডিজাইন—এ বিষয়ে খুব আগ্রহ ছিল। ২০১০ সালে যখন রংপুরে একটা স্টেডিয়াম ডিজাইন করি, তখন দেখলাম যে—স্টেডিয়াম আসলে বড়ো ধরনের স্থাপনা, কিন্তু যদি অল্প কিছু সময় শুধু খেলাধুলার সময়টায় এটার ব্যবহার হয়, তাহলে এতবড়ো যে একটা বিনিয়োগ হলো সেটার আসলে সেরকম ইউটিলাইজেশন হয় না, খালি পড়ে থাকে। তাই তখন আমার আইডিয়া আসে যে, যেহেতু এতগুলো মানুষের জন্য একটা স্থাপনা তৈরি হচ্ছে—এটা সারা বছর কীভাবে অ্যাক্টিভ থাকবে এবং কীভাবে এটা পরিবেশের জন্য সহায়ক হতে পারে, সেটার চেষ্টা করা।  তখন থেকেই আমার এ বিষয়ে আগ্রহটা তৈরি হয়। তখন আমি স্টেডিয়ামের যে ছাদটা ছিল, ওটাকে শক্তি উত্পাদনকারী ছাদ হিসেবে ডিজাইন করি। একেবারে সোলার প্যানেল থেকে শুরু করে রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং (বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা) ব্যবস্থা থাকবে। ওই বৃষ্টির পানিটা স্টেডিয়ামের যতগুলো টয়লেট আছে সেখানে ব্যবহার করা হবে। যখন একটা বড়ো ছাদ থাকবে, ওইটা অব্যবহূত ফেলে রাখলে কিন্তু কোনো বেনিফিট পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু সোলার প্যানেল ব্যবহার করে সহজেই সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণে শক্তি উত্পাদন করতে পারছি। এটা ছিল আমার একটা বেসিক আইডিয়া। একই সঙ্গে আমি সেটাকে একটা আরবান প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করি—যেখানে সারা বছর বিভিন্ন মেলা হবে। ভেতরের জায়গাগুলোতে প্রোগ্রাম হবে। এমনকি স্টেডিয়ামের চারদিকে যে মানুষের হাঁটার রাস্তা, যেটাকে আমরা বলি পেডেস্ট্রেইন ওয়াকওয়ে, ওটা কীভাবে অ্যাক্টিভ রাখা যায়, সেজন্য বিভিন্ন রকম স্টল করা, বুথ করা। কোনো পর্যটকও যদি যায়, সারা বছর বিভিন্ন হাতের কাজ দেখবে। ওখানে আশপাশে যেমন আর্ট গ্যালারি, বাচ্চাদের নাচ-গান শেখানোর ব্যবস্থা, বিভিন্ন নৈশ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা। এভাবে কিন্তু অ্যাক্টিভ রাখা যায়। তাই বেসিক কনসেপ্টটা হচ্ছে—যখনই আমরা কিছু করব, যত বেশি এটার ব্যবহার হবে, পুরো এরিয়ার ওপর একটা পজিটিভ ইমপেক্ট পড়বে। ওই আইডিয়া থেকেই আসলে ডিজাইনটা শুরু হয়।

স্থাপত্যচর্চায় শুরু থেকেই ‘পরিবেশ ও মানুষ’ নিয়ে গবেষণাধর্মী ডিজাইনকার্যে মনোনিবেশ করেছি। আমি যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএসজিবিসি) লিড (লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন) অ্যাকরিডিটেড প্রফেশনাল হিসেবে কাজ করছি। এটাকে বলে লিড অ্যাপি। পেশার শুরু থেকেই ‘সবুজ স্থাপত্য’ বিষয়ে গবেষণার পাশাপাশি সেইসব ‘সবুজ নীতি’কে বিভিন্ন প্রকল্পে অনুসরণ করছি। আমি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প যেমন—রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) প্রধান কার্যালয়ের প্রস্তাবিত ৩২ তলা গ্রিন বিল্ডিং প্রকল্প, মিরপুরে টাউনশিপ ডেভেলপমেন্ট প্রকল্প, ঢাকা ও রংপুর চিড়িয়াখানার আধুনিকায়ন প্রকল্প, সোনালী ব্যাংকের ডিজাইন প্রকল্প, সবুজ ফ্যাক্টরি প্রকল্প, বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি-সমূহের অগ্নি ও ইলেকট্রিক্যাল সেফটি অ্যাসেসমেন্ট-সহ বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে ডিজাইন টিম মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

সারা বিশ্বে এখন ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ বা ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ খুব আলোচিত একটি টার্ম। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে যাচ্ছে। এ কারণে বিশ্বে যে ১০টি দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশ একটি। কিছু কিছু বৃহত্ শক্তিধর দেশ এনার্জির (জ্বালানি ও প্রাকৃতিক শক্তি) বিষয় খেয়াল না করেই বড়ো বড়ো স্থাপনা তৈরি করছে। ঐটার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। বিভিন্ন বিল্ডিং বা স্থাপনাগুলো প্রচুর পরিমাণে এনার্জি ব্যবহার করে। যখন কোনো একটা বিল্ডিং বা স্থাপনা পরিবেশের জন্য উপকারী হবে না, তখন সেটার ক্ষতিকর প্রভাব পুরো মানবজাতির ওপর পড়বে। এ কারণে বিল্ডিং প্রফেশনালস যারা আছেন, যেমন :স্থপতি, নির্মাণ প্রকৌশলী (সিভিল ইঞ্জিনিয়ার) বা অন্য কোনো প্রকৌশলী, ঠিকাদার; সবার একটা লক্ষ্য হতে হবে, বিল্ডিং যেন পরিবেশের জন্য উপকারী হয়। গ্রিন বিল্ডিং বা সবুজ স্থাপনা নিয়ে এজন্যই এখন সারা বিশ্বে ব্যাপক কার্যক্রম হচ্ছে।

গ্রিন বিল্ডিং বা সবুজ স্থাপনা বলতে আমরা বুঝি, এমন ধরনের স্থাপনা যেটা তৈরির সময় এবং পরে পৃথিবীর ওপর কোনো প্রকার ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না। ধরা যাক, এক জায়গায় একটা সবুজ মাঠ আছে, সেখানে একটা বিল্ডিং করলে পরিবেশগত কিছু পরিবর্তন আসবেই। কিন্তু ক্ষতির পরিমাণটা যেন কমিয়ে আনা যায়, এই উদ্দেশ্যেই বিভিন্ন ধরনের পরিবেশ উপযোগী বা সবুজ হয়, সেদিকে অত্যন্ত মনোযোগী হতে হয়।

গ্রিন বিল্ডিং রেটিং সিস্টেম এমন একধরনের টুল, যেখানে বিভিন্ন পয়েন্টের ভিত্তিতে বিল্ডিংটা কতটা পরিবেশ উপযোগী, তা নির্ধারণ করা হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম রেটিং সিস্টেম প্রচলিত। তার মধ্যে সবচেয়ে বহুল ব্যবহূত ও গ্রহণযোগ্য সিস্টেমটা হলো ‘লিড’। লিড রেটিং সিস্টেম বলতে বোঝায়, ‘লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ডিজাইন’। এটা ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল এবং জিবিসিআই-এর মাধ্যমে ১৯৯৩ সালে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে সারা বিশ্বে বিস্তৃতি লাভ করেছে।

লিড অনুসরণ করলে কোনো বিল্ডিং ডিজাইন করার সময়ই বোঝা যায়, এটা কতখানি সবুজ এবং প্রকৃতির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। এতে বিল্ডিংয়ের ভালো-মন্দও বোঝা যায়। লিড মূলত ১১০ পয়েন্টের একটা সিস্টেম। কোনো প্রজেক্ট যদি ৮০ বা তার বেশি পয়েন্ট পায়, তবে এটা প্লাটিনাম সার্টিফাইড। তার মানে বিল্ডিংটা খুবই ভালো। যদি অন্তত ৪০ পয়েন্টও না পায়, তাহলে বোঝা গেল, এটা আসলে গ্রিন বিল্ডিং হয়নি। ৪০-৪৯, ৫০-৫৯, ৬০-৭৯ পয়েন্ট এভাবে সিলভার, গোল্ড ও প্লাটিনাম সার্টিফিকেশন সাজানো হয়েছে। পৃথিবীতে তৈরি পোশাক খাতের (গার্মেন্টস) যে ১০টি প্রজেক্ট সর্বোচ্চ পয়েন্ট পেয়ে প্লাটিনাম সার্টিফিকেশন অর্জন করেছে, এর ৭টিই বাংলাদেশে! সাভারের রানা প্লাজা ধসের পর এ নিয়ে প্রচুর কাজ হয়েছে। এখন প্রচুর কমার্শিয়াল বিল্ডিং আছে বাংলাদেশে, যেগুলো গ্রিন সার্টিফাইড।

গ্রিন বিল্ডিং রেটিংয়ে একটা বিল্ডিং সবুজ কি না, তা কতগুলো ক্যাটাগরি বা ক্রাইটেরিয়ার ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়। প্রথম পয়েন্টটা হলো ‘ইন্টিগ্রেটেড প্রসেস’। এটার মানে হলো, বিল্ডিং তৈরির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা জড়িত, সবাই বিল্ডিংটা করার আগেই এই উদ্দেশ্যটা জানবেন। বিল্ডিংয়ের মালিকসহ স্থপতি ও ঠিকাদার জানবেন যে এটা গ্রিন বিল্ডিং হচ্ছে।

‘লোকেশন ও ট্রান্সপোর্ট’ একটা ক্রাইটেরিয়া। যে জায়গায় বিল্ডিংটা তৈরি করা হচ্ছে, সেই জায়গাটায় মানুষ সহজে পৌঁছাতে পারে কি না তা দেখা। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটা বিরান মরুভূমিতে বা হাওরের মাঝখানে যদি বিল্ডিং করার চিন্তা করা হয়, সেটার জন্য আলাদা রাস্তাঘাট তৈরি করতে হবে, ইনফাস্ট্রাকচার তৈরি করতে হবে, গ্যাস-বিদ্যুত্ লাইন লাগবে। বলা হয়, যেখানে অলরেডি মানুষ বাস করে এবং এই ফেসিলিটিজগুলো আবার ব্যবহার করা যাবে, এ রকম জায়গায় বিল্ডিং করাটাই উত্তম পন্থা। 

যাহোক, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট আয়োজিত জাতীয় ডিজাইন প্রতিযোগিতায় (২০১৪) আমাদের টিম রাজউক-এর প্রধান কার্যালয়ের ‘গ্রিন বিল্ডিং ডিজাইন’-এ প্রথম স্থান অধিকার করে। অপর এক প্রতিযোগিতায় ন্যাশনাল হাউজিং অথরিটি (এনএইচএ)-র প্রধান কার্যালয় ডিজাইনে তৃতীয় স্থান অর্জন করি আমরা।

 

লেখক : সহকারী অধ্যাপক

স্থাপত্য বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

লিড এপি বিডি প্লাস সি