আহসান রনি
মেসোপটেমিয়ার রাজা নেবুচাদ নেজার তার প্রিয়তমা স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন হিসেবে প্রায় তিন হাজার বছর আগে ইউফ্রেটিস নদীর তীরে প্রথম ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যান তৈরি করেন। এখন কংক্রিটে ঘেরা আধুনিক যান্ত্রিক নগরীর মানুষগুলো কিছুটা নির্মল পরিবেশে বেঁচে থাকার প্রয়োজনেই নিজ বাড়ির বারান্দা, কার্নিশ ও ছাদে বাগান গড়ে তুলছেন। আর ঢাকা শহরে এই ছাদবাগান কার্যক্রমকে সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করার চেষ্টা করে যাচ্ছি আমি আর আমার প্রতিষ্ঠান গ্রিন সেভার্স। দেশে আমিই প্রথম শহরবাসীর কাছে নগর-কৃষির ধারণাকে পরিচিত করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বাগান সৃজনে সার্বিক সহায়তা প্রদানে এগিয়ে আসি।
নগরের মধ্যে আমরা খুঁজে ফিরি সবুজ প্রাণের স্পন্দন। যেমন করে বাঁশ হয় বাঁশি, স্বর হয় সংগীত—তেমনি ইমারতকে আমরা লাস্যময় সবুজে আবৃত করতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। ছোটবেলা থেকেই আমার মধ্যে সবুজের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ছিল। সেই ভালোবাসার টান থেকেই গড়ে তুলেছি আমার স্বপ্নের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘গ্রিন সেভার্স’। এখানে আমার সঙ্গে কাজ করছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই নগরবাসীর নজর কাড়তে এবং নগর-কৃষি ও নগর-পরিবেশ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে শুরু করেছি।
২০১১ সাল থেকে ছাদবাগান কার্যক্রম শুরু করে আমাদের গ্রিন সেভার্স। এ পর্যন্ত ঢাকা শহরের প্রায় পাঁচ হাজার বাড়ির ছাদ ও বারান্দায় বাগান গড়ে দিয়েছি আমরা। ছাদবাগানগুলোকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার জন্য বাগান পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ওই পরিবারগুলোর শিশু ও বয়স্ক সদস্যদের সম্পৃক্তকরণের কাজও করছি। পাশাপাশি বাসাবাড়ির অপ্রয়োজনীয় ও ফেলনা জিনিসপত্র দিয়ে স্বল্প খরচে ফুল, ফল ও সবজিবাগান করে দেওয়া এবং প্রতি মাসে ফ্রি প্রশিক্ষণের আয়োজন করেছি আমরা। ইমারতের ছাদ, বারান্দা, ব্যালকনি, সিঁড়ি, মুক্ত পরিসর ও নগরীর সর্বত্র গ্রিন সেভার্স ছড়িয়ে দিচ্ছে সবুজের অন্বেষা।
সম্প্রতি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা নগরে ছাদবাগানের প্রয়োজনীয়তাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ছাদবাগান সৃজনের একটি আদর্শ রূপরেখা প্রণয়নের কাজে আমাকে ও গ্রিন সেভার্সকে সম্পৃক্ত করেছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও ‘সবুজ ঢাকা’ গড়ার কার্যক্রমে গ্রিন সেভার্সকে সঙ্গে নিয়েছে।
শিশুদের অবুঝ মনে সবুজের প্রতি ভালোবাসা ও আগ্রহ জাগিয়ে তোলাই আমার স্বপ্ন। তাই তিনি নিজ উদ্যোগে ঢাকা শহরের শতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং পরিবেশ অধিদপ্তর ও সেভ দ্য চিলড্রেনের সহায়তায় সারাদেশে মোট ৩৮০টি স্কুলে স্থাপন করেছি বাক্স-সদৃশ একটি কাঠের ব্যাংক, যার নাম আমরা দিয়েছি ‘অক্সিজেন ব্যাংক’। যেখানে স্কুলের বাচ্চারা টিফিনের পয়সা জমায় এবং তাদের টাকায় তাদের দ্বারা তাদের স্কুলে হয় বিদ্যালয় বাগান বা ‘স্কুল গার্ডেন’। শিক্ষার্থীরা তাদের টিফিনের পয়সার একটি অংশ এখানে জমাতে পারে এবং প্রতি মাসে জমানো অর্থ দিয়ে ঐ বিদ্যালয়েই বৃক্ষরোপণ, বৃক্ষ পরিচর্যা, বাগান সৃজন ও রক্ষণাবেক্ষণসহ পরিবেশ সচেতনতামূলক নানাবিধ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজে অথবা অন্যান্য শিক্ষকের মধ্যে থেকে পরিবেশ সচেতন একজন শিক্ষককে এই ব্যাংকের দায়িত্ব প্রদান করেন, যাকে বলা হয় ‘গ্রিন অ্যাম্বাসেডর’। যিনি এই ব্যাংকের চাবি সংরক্ষণ করেন এবং মাস শেষে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে ব্যাংক খুলে জমানো অর্থ দিয়ে উল্লিখিত কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
আমাদের অক্সিজেন ব্যাংকের স্লোগান, ‘জমাব পয়সা লাগাব গাছ, সবুজ রাখব চারপাশ’। আমরা প্রকৃতি থেকে ফ্রি অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে আছি। অন্যদিকে, হাসপাতালে ভর্তি একজন রোগীকে অক্সিজেন সরবরাহ করতে প্রতি ঘণ্টায় মোটা অঙ্কের অর্থ গুনতে হয়। কোমলমতি শিশুরা যাতে গাছের এই অবদানের প্রতিদান দিতে শেখে, তাই প্রতি সপ্তাহে বা প্রতি মাসে অন্তত এক টাকা হলেও শিক্ষার্থীরা যাতে প্রকৃতিকে অক্সিজেনের একটি প্রতীকী মূল্য পরিশোধে উত্সাহী হয়—এ লক্ষ্যে কাজ করে চলেছি আমরা।
‘ভ্রাম্যমাণ বৃক্ষ ক্লিনিক’ আমাদের আরেকটি অনন্য উদ্যোগ। যার মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ দিনে শিশুদের গাছ উপহার দেই, গাছ কিনতে ও গাছ লাগাতে উত্সাহিত করি। পাশাপাশি শহরবাসীর দোরগোড়ায় গাছ লাগানোর উপকরণ, মাটি, সার ও গাছের চিকিত্সাসেবাও পৌঁছে দেই। এ উদ্যোগের মাধ্যমে আমরা বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাদে বাগান গড়ে তুলেছি। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে সবুজের প্রতি যে আগ্রহ ও ভালোবাসা তৈরি হচ্ছে, তা তাদের পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে পারিবারিক পর্যায়ে নগর-কৃষির চর্চাও শুরু করেছে অনেক শিক্ষার্থীর পরিবার।
২০১২ সাল থেকে আমরা ঢাকা শহরে গাছের নামে পরিচিত ১৭টি এলাকায় ঐ প্রজাতির গাছ রোপনের উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষজ্ঞদের মতে, গাছের আধিক্য থেকেই হয়তো ঢাকা শহরের অধিকাংশ এলাকাকে গাছের নামে নামকরণ করা হয়েছিল। অথচ কলাবাগান, জিগাতলা, গাবতলী, তালতলা, খেজুরবাগান, সেগুনবাগিচা, কাঁঠালবাগান, লিচুবাগান, আমবাগান, শাপলা চত্বর, কমলাপুর, কদমতলী, নীলক্ষেত, নিমতলী, জামতলী—এর কোনোটিই তার নামকরণের ঐতিহ্যকে ধারণ করতে পারেনি। তাই আমি ও আমার স্বেচ্ছাসেবী দল কলাবাগানের বিভিন্ন স্থানে যেমন কলা গাছ লাগিয়েছি, তেমনি কাঁঠালবাগানে কাঁঠাল গাছ, তালতলায় তালগাছ, গাবতলীতে গাবগাছ, কমলাপুরে কমলা গাছ কিংবা সেগুনবাগিচায় সেগুন গাছ লাগিয়ে চলেছি। আমাদের চলমান এই উদ্যোগও সর্বজন সমাদৃত হয়েছে।
বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি বৃক্ষলালনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আমরা তৈরি করেছি ‘প্ল্যান্টস ডক্টর’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ। ইউএনডিপির সহায়তায় নির্মিত এই অনলাইন অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে এখন দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে একটি মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবহার করেই গাছপালাবিষয়ক প্রায় সকল সমস্যার সমাধান পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি ঢাকা নগরীর ভেতরে গাছপালাবিষয়ক যেকোনো সেবা প্রদানের জন্য আমাদের প্রশিক্ষিত গার্ডেনার দুই ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে আবেদনকারী ঠিকানায়।
এছাড়াও প্রতি মাসে আমাদের গ্রিন সেভার্স আয়োজন করছে ‘মাসিক কৃষি পাঠ’। এ আয়োজনের মাধ্যমে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের আধুনিক লাগসই পরিবেশ-ভাবনা ও কৃষি-প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া এবং নিজ নিজ গ্রামে তা ছড়িয়ে দিতে তাদের উদ্বুদ্ধ করছি আমরা।
‘গাছের হাসপাতাল’ আমাদের আরেকটি সময়োপযোগী উদ্যোগ। নগরবাসীর জন্য গাছের সেবাপ্রাপ্তিকে আরো সহজতর ও সহজলভ্য করতে রাজধানীর আগারগাঁও ও গাবতলীতে সীমিত পরিসরে আমাদের এই হাসপাতাল কার্যক্রম চলমান। যেখানে গাছপালা ও উদ্যান চাষাবাদ সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞরা চিকিত্সা, সেবা ও পরামর্শ প্রদান করেন। পাশাপাশি এই হাসপাতালে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য গাছ জমা রাখার ব্যবস্থাও আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় ইট-পাথরের ধূসর নগরীকে সবুজে সাজাতে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, সবার আন্তরিকতা ও সহযোগিতায় সেই স্বপ্নগাছ আজ ধীরে ধীরে মহীরুহ হয়ে উঠছে। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ও অভিনন্দিত হচ্ছে আমাদের ‘সবুজ বাঁচাও’ উদ্যোগ।
পরিবেশ রক্ষায় অবদানের জন্য মানুষের ভালোবাসার পাশাপাশি পেয়েছি স্বীকৃতি-সম্মাননাও। ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পেয়েছি জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি। পর পর দুইবার পুরস্কৃত হয়েছি পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে। নগর-কৃষিতে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ২০১৫ সালে পাই ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’। ২০১৬ সালে ‘চে গুয়েভারা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ এবং ২০১৭ সালে পাই ‘চ্যানেল আই নেচার কেয়ার অ্যাওয়ার্ড’। ২০১৯ সালে পেয়েছি ‘আরবান রিলিজিয়ন্স অ্যাওয়ার্ড’। সম্প্রতি নির্বাচিত হয়েছি অশোকা ফেলো, অ্যামেরিকার এক্সচেঞ্জ অ্যালামনাইশিপ। এছাড়াও পরিবেশ ও নগর-কৃষি নিয়ে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা জমা পড়েছে আমার প্রাপ্তির ঝুলিতে। তবে আমার সবুজ বাঁচাও উদ্যেগের সবচেয়ে বড়ো স্বীকৃতি মানুষের ভালোবাসা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।
লেখক :প্রতিষ্ঠাতা, গ্রিন সেভার্স
