শাহেদ কায়েস
সুবর্ণগ্রাম একটি স্বপ্নের নাম। প্রাচীন বাংলার রাজধানী ঐতিহাসিক সোনারগাঁয়ের পূর্ব নাম ছিল সুবর্ণগ্রাম। আমি নিজেও সোনারগাঁয়েরই সন্তান। সোনারগাঁয়ের একটি গ্রাম ললাটি, যেটি আমার নিজের গ্রাম, যে গ্রামে আমি বেড়ে উঠেছি, আমার শৈশবের একটা বড়ো অংশ কেটেছে এই গ্রামে।
যেভাবে শুরু
স্কুলজীবন থেকেই সমাজসেবামূলক ব্যতিক্রম কিছু করার চিন্তা আমার মনের মধ্যে কাজ করত। উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে ছিলাম কয়েক বছর। পড়াশোনা শেষে দেশে ফিরে আসি। আমাদের গ্রাম ললাটি ও পড়শি গ্রাম কুশাবোতে কোনো স্কুল ছিল না সে সময়। গ্রামের অন্যদের সঙ্গে নিয়ে ২০০৩-এ ললাটিতে শিশুদের জন্য স্বল্পব্যয়ে উন্নত শিক্ষাদানের জন্য গড়ে তুলি ‘বিদ্যানিকেতন’। পরে নাম পরিবর্তিত হয় ‘সুবর্ণগ্রাম আইডিয়াল স্কুল’ নামে। বর্তমানে এখানে প্লে থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত ৩৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে ললাটি ও আশপাশের গ্রামের হাইস্কুল ও কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েদের পাঠ্যবইয়ের বাইরে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের বই পাঠে উদ্বুদ্ধ করার জন্য গড়ে তুলি বইপড়া আন্দোলন ‘প্রগতি পাঠচক্র’।
২০০৫ সালে আমাদের সমাজসেবামূলক কার্যক্রমগুলোকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিই। সোনারগাঁয়ের প্রাচীন নাম সুবর্ণগ্রাম-এর নামে আমাদের সংগঠনের নামকরণ করি ‘সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশন’ এবং সে বছরই এই নামে সরকারি রেজিস্ট্রেশন নিই। এরপর থেকে সোনারগাঁয়ে আমাদের সমস্ত সমাজসেবামূলক কার্যক্রম সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশনের অধীনে নিয়ে আসি।
সুবর্ণগ্রামের পাঠশালা ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য শিক্ষা আন্দোলন
২০০৭-এ সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার জন্য আমরা গড়ে তুলি তিনটি পাঠশালা—সমাজের অবহেলিত চর্মকার জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য পানাম নগরীর নিকটস্থ বাগমুছা গ্রামে ‘ঋষিপাড়া মন্দির পাঠশালা’, বেদে সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্য মেঘনা নদীর শাখা নদী মেনিখালিতে ‘বেদেবহর ভাসমান পাঠশালা’ এবং মেঘনা নদীতে অবস্থিত নুনেরটেক চরের পাশে নতুন জাগা চরের গুচ্ছগ্রামের পাশেই সবুজবাগে জেলেশিশুদের জন্য গড়ে তুলি ‘মায়াদ্বীপ জেলেশিশু পাঠশালা’। চরের এই অংশের ‘মায়াদ্বীপ’ নামকরণ আমার করা। এর পরের বছর বান্দরবানের থাঞ্চির রোম্বেট পাড়ায় ম্রো (Mro) জনগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য গড়ে তুলি ‘আদিবাসী শিশু পাঠশালা’। এই চারটা পাঠশালাই সম্পূর্ণ অবৈতনিক। ২০০৮ সালে সুবর্ণগ্রামের উদ্যোগে সোনারগাঁ উপজেলাসংলগ্ন সাহাপুরে গড়ে তুলি ‘সুবর্ণগ্রাম ইন্টারন্যাশনাল স্কুল’। আমাদের এই স্কুলটি বৈতনিক স্কুল, এই স্কুল থেকে যে আয় হয়, তা দিয়ে অন্য চারটি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের অবৈতনিক স্কুল পরিচালনা করি আমরা। এইসব সমাজসেবামূলক কাজ শুরু করি এবং কার্যক্রম চালিয়ে নিয়ে যাই আমার নিজের জমানো কিছু অর্থ আর পৈতৃক তিন বিঘা সম্পত্তি বিক্রি করে।
মায়াদ্বীপের পাঠশালা
২০০৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত এই সাত বছর আমরা কারো কাছ থেকেই কোনো আর্থিক সহযোগিতা নিইনি। ২০০৯ সালে আমার বন্ধু কবি-নাট্যকার-গবেষক সাইমন জাকারিয়া আমাদের এইসব কাজবাজ দেখে এটা নিয়ে লেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপর ২০০৯ সালের ৮ আগস্ট প্রথম আলোর ‘ছুটির দিনে’ ম্যাগাজিনে আমাদের কাজ নিয়ে কাভার স্টোরি প্রকাশিত হয়, নাম ছিল ‘মায়াদ্বীপের পাঠশালা’, কাভার স্টোরিটি লেখেন সাইমন জাকারিয়া। ‘মায়াদ্বীপের পাঠশালা’ পড়ে অনেকেই আমাদের কাজ সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এশিয়া ফাউন্ডেশন ২০১০ সালে আমাদের বই এবং পরে আর্থিক সহযোগিতা দেয়। নারায়ণগঞ্জের তত্কালীন ডিসি শামসুর রহমান ও তার স্ত্রী আমাদের পাশে দাঁড়ান, ‘মায়াদ্বীপ জেলেশিশু পাঠশালা’র শিশুদের জন্য বেঞ্চ ও শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুল ড্রেস উপহার দেন। পরে আমাদের আরেক বন্ধু কবি-কথাশিল্পী ও সাংবাদিক শাহনাজ মুন্নি এটিএন বাংলায় একটি সরেজমিন প্রতিবেদন করেন আমাদের কাজ নিয়ে; বন্ধু কবি, বাচিকশিল্পী ও সাংবাদিক রবিশঙ্কর মৈত্রী বাংলা ভিশনে ‘দিন বদলের মানুষ’ এই শিরোনামে একটা অনুষ্ঠানে আমাদের কার্যক্রম তুলে ধরলে দেশ-বিদেশের আরো অনেকে আমাদের কাজ সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরমধ্যে জনতা ব্যাংক ফাউন্ডেশনের তত্কালীন চেয়ারম্যান আবুল বারাকাত স্যার আমাদের ‘বেদেবহর ভাসমান পাঠশালা’র জন্য নতুন একটি নৌকার ব্যবস্থা করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন ‘আগামী ফাউন্ডেশন’; সোনারগাঁয়ের এ কে এম নুরুল হকের উদ্যোগে ‘সোনারগাঁ ফাউন্ডেশন, ইউএসএ’ এবং হংকংয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংগঠন ‘উদ্যোগ’ও বিভিন্ন সময় সুবর্ণগ্রামের পাঠশালাগুলোতে আর্থিক সহযোগিতা করেছে। ওই সময় আমাদের কার্যক্রম বাড়ছিল, আমরা নিজেরা আর কুলাতে পারছিলাম না, আমাদের সাপোর্ট প্রয়োজন ছিল। এছাড়াও আরো কিছু মানুষ আমাদের নানাভাবে উত্সাহ-উদ্দীপনা দিয়েছেন, আমাদের কার্যক্রম দেখার জন্য ছুটে এসেছেন মায়াদ্বীপে। এরমধ্যে একজন বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা লেখক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার, অন্যজন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান, আরেকজন তত্কালীন বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি, বর্তমানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। তিনি ২০১০ সালের পহেলা বৈশাখে মায়াদ্বীপে আমাদের কার্যক্রম দেখতে এসেছিলেন এবং সারাদিন ছিলেন। তখন আমরা মায়াদ্বীপকে ডিজিটাল গ্রাম ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করেছিলাম ল্যাপটপের মাধ্যমে, তখনো ওই গ্রামে বিদ্যুত্ ছিল না। জনাব মোস্তাফা জব্বার ২০১০ সালের এপ্রিলে মায়াদ্বীপ পরিদর্শন করেন এবং ঐ মাসেই দৈনিক জনকণ্ঠে ‘মায়াদ্বীপ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ’ শিরোনামে তিন কিস্তিতে তিনটি নিবন্ধ লেখেন। এছাড়া সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ ও জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিক ও লেখক বন্ধুরা, সোনারগাঁয়ের মুক্তিযোদ্ধা ও সুধীজনেরা আমাদের ভালো সময়ে, মন্দ সময়ে পাশে থেকেছেন, উত্সাহ-উদ্দীপনা দিয়েছেন।
বালুখেকোদের দৌরাত্ম্য ও মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন
খরস্রোতা মেঘনা থেকে তিলে তিলে পলি-বালু সংগ্রহ করে গড়ে উঠেছে মায়াদ্বীপ। কিন্তু খুবই দুঃখজনক ঘটনা হলো, ২০১০ সালের জুনের দিকে একদল বালু সন্ত্রাসী বালু উত্তোলনের নামে চরকাটা শুরু করে। ফলে ভাঙতে শুরু করে মায়াদ্বীপের চারপাশ। ফলে এখানে বসবাস করা জেলে সম্প্রদায়ের মানুষগুলো পড়ে চরম অস্তিত্বহীনতায়। তখন আমরা চরবাসীদের নিয়ে ঐ একই বছরের ১০ ডিসেম্বর প্রতিরোধ গড়ে তুলি বালুখেকোদের বিরুদ্ধে। কিন্তু বাধা দেওয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে বালুখেকোরা আমিসহ চরবাসীর বিরুদ্ধে ঠুকে দেয় আটটা মিথ্যা মামলা। এরপর থেকেই আমরা নিরাপত্তাহীনতা আর গ্রেপ্তার-আতঙ্কে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছি। এরপর ২০১১ সালে আমি বাদী হয়ে হাইকোর্টে একটা রিট করলে মহামান্য আদালত আমাদের পক্ষে রায় দেন, মায়াদ্বীপের নিকটে বালুমহালে স্টে-অর্ডার দেন। জাতিসংঘ ২০১২ সালে এই চরের বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে জানতে চেয়ে নয় পৃষ্ঠার একটি চিঠি দেয়। এরপর বাংলাদেশ সরকার তত্পর হয় এবং সংসদে বালুনীতি আইন পাস করে ২০১২ সালে। এতকিছুর পরও বালুকাটা কিন্তু বন্ধ হয়নি, কিছুদিন বন্ধ ছিল, এরপর আবার শুরু হয়।
আমার দেশের বাইরে অবস্থান ও সুবর্ণগ্রামের কার্যক্রম
২০১০ সালের জুন থেকে ২০১৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই প্রায় পৌনে চার বছর লাগাতার মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম আমি। পরিস্থিতি যখন খুব নাজুক, আমার পরিবারের লোকজনদের হুমকি দেওয়া শুরু হয়, বালু সন্ত্রাসীরা বিশেষভাবে আমাকে টার্গেট করে, তখন আমার সহ-আন্দোলনকারী, শুভানুধ্যায়ীদের পরামর্শে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আমি দেশের বাইরে চলে যাই। অবশ্য প্রতি বছরই আমি দেশে স্বল্প সময়ের জন্য ফিরেছি, মায়াদ্বীপের আন্দোলন, সুবর্ণগ্রামের কার্যক্রমের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখেছি। সপ্তাহে আমি দুই দিন—শনি ও রবিবার পৃথিবীর যে দেশেই ছিলাম, সেখানে থেকেই সুবর্ণগ্রামে চার ঘণ্টা করে ভার্চুয়াল অফিস করেছি ফোনে, মেসেঞ্জারে, স্কাইপে; এখনো তা-ই করছি। এ বছর ২০১৯ সালে ছয় মাসই দেশে ছিলাম, সুবর্ণগ্রামের কাজের সঙ্গে যুক্ত আছি। এখনো স্বপ্ন দেখে যাচ্ছি, কাজ করে যাচ্ছি একটি সমৃদ্ধ সোনারগাঁ, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে।
সুবর্ণগ্রাম-এর দেশি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অর্জন
সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশনের বেদে সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম, সভা-সেমিনার, অ্যাডভোক্যাসি, সরকারি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক লবিংয়ের ফলে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে বাংলাদেশের বেদে সম্প্রদায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার পায়। এর আগ পর্যন্ত তাদের ভোটাধিকার ছিল না। এছাড়া ‘মায়াদ্বীপ রক্ষা আন্দোলন’, দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অ্যাডভোক্যাসির ফলে ২০১২ সালে বাংলাদেশ সংসদে ‘জাতীয় বালুনীতি খসড়া আইন’ পাস হয়।
সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশনের সমাজসেবামূলক কার্যক্রম, পরিবেশ ও শিক্ষা আন্দোলনের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশ-বিদেশে সম্মাননা ও পুরস্কার পেয়েছে। এরমধ্যে ২০১২ সালে ড. কুদরত-ই খুদা শিক্ষা পদক (যৌথভাবে), ২০১৩ সালে বাংলাদেশ জুনিয়র চেম্বার অব কমার্স থেকে JCI TOYP অ্যাওয়ার্ড, ২০১৪ সালে সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে FuturArc Green Leadership Award, এবং ২০১৬ সালে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে Civil Education Award পেয়েছে।
লেখক :কবি, পরিবেশ ও মানবাধিকার কর্মী; প্রতিষ্ঠাতা, সুবর্ণগ্রাম ফাউন্ডেশন
