g রেজাউল করিম খোকন
ব্যাংকের গ্রাহকসেবাকে নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ রাখার উপায় নেই। গ্রাহকসেবা বলতে সাধারণত ব্যাংকের আমানতকারী, বিনিয়োগ গ্রহীতা এবং বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রাহককে যথাসম্ভব স্বল্প সময়ে নিখুঁতভাবে দ্রুততার সঙ্গে কাজ করে দেওয়াকে বোঝায়। ব্যাংকে গ্রাহকসেবার মান উন্নীত করার ব্যাপারে সব সময় জোর দেওয়া হয়। যেসব উপাদান গ্রাহকসেবার মান উন্নত করে সেগুলো হলো— সৌজন্যমূলক ভদ্র-নম্র আচরণ, গ্রাহকের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সহযোগী মানসিকতা প্রদর্শন, দ্রুত ও নির্ভুল হিসাব খোলা নিশ্চিতকরণ, হিসাবধারীদের টাকা দ্রুত জমা দেওয়া নিশ্চিতকরণ, দ্রুত চেক প্রদান, অন্য ব্যাংকের চেক ড্রাফট দ্রুততার সঙ্গে সংগ্রহপূর্বক গ্রাহকের হিসাবে জমাকরণ, গ্রাহকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তার জমাকৃত বা দাখিলকৃত জামানত ও অন্যান্য সম্পদের দলিলপত্র এবং সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের সঠিকতা যাচাই-বাছাইপূর্বক প্রাপ্য ঋণদান কার্যক্রম দ্রুত ও সহজ করা প্রভৃতি। এসব ক্ষেত্রে গ্রাহকের বেশ কিছু প্রত্যাশা থাকে ব্যাংকের কাছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—চাহিবামাত্র তাদের জমাকৃত অর্থ ফেরত প্রদান, আদালতের নির্দেশ বা গ্রাহকের আদেশ ব্যতীত হিসাব সম্পর্কিত কোনো তথ্য প্রকাশ না করা, গ্রাহকের আদেশের ধরন অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য থাকা, যুক্তিসঙ্গত কারণ সাপেক্ষ যথোপযুক্ত সময় প্রদান করে ও গ্রাহককে নোটিশ দিয়ে বন্ধ করা, বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়ে যথাযথভাবে গ্রাহকের হিসাব সংরক্ষণ, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে উপযুক্ত সময় ও সুযোগ প্রদান, মুদ্রার বিকল্প মাধ্যম সৃষ্টি, সরকারি বিভিন্ন বিল, যেমন—পানি, বিদ্যুত্, গ্যাস প্রভৃতি গ্রহণ, হজের টাকা জমা রাখা, বিভিন্ন কোম্পানির আইপিওর টাকা গ্রহণ, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি বিশ্লেষণপূর্বক সরকারকে পরামর্শদান, তারল্য সঙ্কট থাকলে আগাম খবর দান, আয়কর রিটার্ন প্রস্তুতকরণ, গ্রাহকের মূল্যবান সম্পদ, অলঙ্কার, দলিলপত্রাদি সুরক্ষায় লকার সার্ভিস চালুকরণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সহায়তাদান, এলসি খোলা গ্রাহকের পক্ষে অন্য পক্ষকে মূল্য পরিশোধে সম্মতি বা গ্যারান্টি প্রদান, বৈদেশিক মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় প্রভৃতি। গ্রাহক ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন ধরনের সেবা, সাহায্য, সহযোগিতা প্রত্যাশা করে। গ্রাহকের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ব্যাংকার তার সাধ্যানুযায়ী সেবা নিশ্চিত করার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যাংকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের বিচিত্র মানসিকতার লোকজনের সমাগম লক্ষ্য করা যায়। তাদের চাহিদা ও মন-মানসিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিস্থিতি বুঝে ব্যাংকবিধি অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করে সর্বতোভাবে সন্তুষ্ট করাই একজন ভালো ব্যাংকারের দায়িত্ব। ব্যাংকিং এখন তুমুল প্রতিযোগিতামূলক একটি ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তেমন প্রেক্ষাপটে ব্যাংকারদের মানসিকতা আবশ্যিকভাবে গ্রাহকবান্ধব হতে হবে। প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং ব্যবসায় সাফল্য পেতে গ্রাহকের মেজাজ-মর্জির প্রতি খেয়াল রেখে সেবা প্রদান করা ব্যাংকারদের নৈতিক দায়িত্ব বিবেচনা করা যায়।
আমাদের দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে গ্রাহকসেবার মান নিয়ে এত দিন অনেক কথা শোনা গেলেও এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ অনেক বদলে গেছে। এখন রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে গ্রাহকসেবার মান ক্রমেই উন্নত হচ্ছে, গ্রাহকদের মনে এ ব্যাপারে পূর্ণ আস্থা ফিরে আসছে ক্রমেই।
গ্রাহকদের প্রতি ব্যাংকারের যেমন দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তেমনিভাবে ব্যাংকের প্রতিও গ্রাহকের অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। ব্যাংকিং কার্যক্রম স্রেফ এক পক্ষ দ্বারা সম্ভব নয় কিছুতেই। গ্রাহক ছাড়া ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডের কথা কল্পনাও করা যায় না। গ্রাহকের গচ্ছিত আমানত, ঋণগ্রহীতা জন্য গ্রাহকদের মধ্যে বিনিয়োগ করেই ব্যাংক ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জন করে। অতএব, গ্রাহকের সহযোগিতা, সততা, আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ, ব্যাংকিং, জ্ঞান, সচেতনতা ইত্যাদি একান্ত প্রয়োজন। ব্যাংকের প্রতিও গ্রাহকের কিছু করণীয় আছে। যেমন—জামানতি সম্পত্তির ব্যাংকের অধিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন, সার্ভিস রেটের দরকষাকষি না করা, পূর্বনির্ধারিত চুক্তি অনুযায়ী মুনাফা গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বিধা না করা, বিনিয়োগ চুক্তি অনুযায়ী সময়মতো কিস্তি পরিশোধ, চেক লেখায় কোনোরকম গাফিলতি না করে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন, অনাকাঙ্ক্ষিত চেক প্রদান থেকে দূরে থাকা, ব্যাংকের কাছে বিশ্বস্ত এবং সততার প্রতীক হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে তোলাসহ সব ধরনের জালিয়াতি, অন্যায়, অসততা ও প্রতারণা থেকে মুক্ত থেকে এসব প্রতিরোধ করে ব্যাংককে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করে সহায়তা প্রদান করা উচিত গ্রাহকদের।
এখন বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায়ও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। আধুনিক উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের ব্যাংকিং কার্যক্রমে গতির সঞ্চার করেছে সামপ্রতিক বছরগুলোতে। ব্যাংকিং সেবাকে দ্রুত ও নিখুঁত করার লক্ষ্যে অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে ক্রমেই। ব্যাংকাররা কতগুলো নৈতিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ব্যাংকিং সেবার কাজ সম্পাদন করে থাকে। এর মধ্যে রয়েছে যেমন—১. পূর্ণ কর্মসংস্থান ও অথনৈতিক প্রবৃদ্ধির কাঙ্ক্ষিত হার অর্জনের মাধ্যমে ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক কল্যাণ সাধন করা। ২. আর্থ-সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আয়-সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করা। ৩. মুদ্রামানের স্থিতিশীলতা অর্জন করা, যাতে মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যম রূপে হিসাব-নিকাশের একটি নির্ভরযোগ্য একক, বকেয়া পরিশোধের একটি সঠিক মানদণ্ড এবং সঞ্চয়ের একটি স্থিতিশীল বাহন হতে পারে। ৪. পর্যাপ্ত সঞ্চয় সৃষ্টি এবং উপরিউক্ত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কাঠামোর অধীনে সঞ্চয়ের দক্ষতাপূর্ণ সমাবেশ করা এবং ৫. সাধারণভাবে করণীয় ব্যাংকের যাবতীয় কাজ সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের ব্যবস্থা করা। এসব উদ্দেশ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের গণমানুষের একাত্বতা আর সমর্থন নিবিড়ভাবে জড়িত। ব্যাংকিং খাতকে মজবুত, কর্মকাণ্ডকে সহজ, জটিলতামূক এবং বিশ্বমানে উন্নীত করার জন্য সর্বোত্তম গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বিশ্ব অর্থনীতির মন্দার প্রভাব মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোকে বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে বিনিয়োগ কর্মসূচি পালনের পাশাপাশি সর্বোত্তম গ্রাহকসেবা নিশ্চিত করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি হয়ে উঠেছে। এখন প্রতিযোগিতার যুগ। ঘরে-বাইরে সবখানেই প্রতিযোগিতা চলছে। কে কাকে পেছনে ফেলে আরো সামনে এগিয়ে যাবে তার প্রতিযোগিতা তীব্র হচ্ছে দিনে দিনে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক সমাজ ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যে যত ভালো ও মানসম্মত সুন্দর সেবাদানে পারদর্শী, গ্রাহকরা সেদিকেই ছুটে যাচ্ছে স্বাভাবিকভাবে। সেবার মান নিম্নমুখী হলে নিতান্ত বাধ্য না হলে কেউ সেদিকে পা বাড়াবে না, পারতপক্ষে এড়িয়ে চলতে চেষ্টা করবে।
ছবি : ইন্টারনেট
