g শফিকুর রহমান রয়েল
জীবসত্তার বিকাশ-সম্পর্কিত পুরোনো একটা তত্ত্ব রয়েছে—এটি ঠিক সেইসব বিবর্তনীয় পর্যায় অতিক্রম করে এগোতে থাকে, যেগুলো পার করে এসেছে তার পূর্বসূরিরা। ঐতিহ্যগতভাবে, অর্থনৈতিক উন্নয়নও কাজ করেছে অনুরূপ উপায়ে। যখন একটি দেশ কৃষিসম্পর্কীয় দারিদ্র্য থেকে প্রথমবারের মতো শিল্পায়নে পদার্পণ করে, তখন স্বাভাবিকভাবেই শুরুটা ঘটে হালকা শিল্প দিয়ে, বিশেষত টেক্সটাইল। পরবর্তীকালে আয়ত্ত করে অধিকতর জটিল সামগ্রী উত্পাদন। শেষ পর্যন্ত পা রাখে একান্ত নিজস্ব এবং সর্বাধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জগতে। সেজন্যই উন্নয়নের বেলায় প্রত্যেকটা দেশের ঝোঁক থাকে সুনির্দিষ্ট এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা রাষ্ট্রগুলোর আদ্যোপান্তের অন্তত কিছুটা হলেও জেনে নেওয়া। যাতে করে যথাসম্ভব ভুল-ত্রুটি এড়ানো যায়, তবে অন্যের মতো যে একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে, এমন কোনো কথা নেই।
দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানকে উদাহরণস্বরূপ দাঁড় করালে বিশ্ব অর্থনীতি সম্পর্কিত অনেক কিছু বোঝাই বেশ সহজ হয়ে যায়। তুলনামূলকভাবে তারা উন্নত রাষ্ট্রের তকমা পাওয়া সাম্প্রতিক দুই দেশ। তাদের পথ অনুসরণ করে এগিয়ে যাওয়া দেশ হচ্ছে চীন। ধনী হওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের মজুরি বেড়েছে পাল্লা দিয়ে। যে কারণে তাদের নিম্ন-প্রযুক্তির শ্রমঘন ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রিগুলো অভিবাসিত হয়েছে সস্তা শ্রমের দেশগুলোয়। এ প্রক্রিয়ায় সাম্প্রতিককালের সর্বোচ্চ সুবিধাভোগকারী রাষ্ট্রগুলোর একটি হচ্ছে বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশীয় এ দেশটির মোট রপ্তানি রাজস্বের ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশেরও বেশি অবদান তৈরি পোশাকশিল্পের। ২০১৭ সালেই তৈরি পোশাক সরবরাহের বেলায় বাংলাদেশ ছিল দ্বিতীয় বৃহত্ দেশ, এক নম্বরে চীন। এ বাজারের ৬ দশমিক ৫ শতাংশ দখল করতে গিয়ে বাংলাদেশ পেছনে ফেলেছে প্রতিবেশি দেশ ভারতকেও। আরো বিস্ময়কর তথ্য হচ্ছে, বিশ্ব বাজারে এ খাতে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ক্রমান্বয়ে বাড়ছে এবং ভারতে পর্যন্ত রপ্তানি করতে শুরু করেছে। চীনে ন্যূনতম মজুরি বেশ উর্ধ্বমুখী হওয়ায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প এর সুবিধা নিতে পারে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের রাস্তাটা বরাবরই ফুলেল থাকে না, এ কথা নিঃসন্দেহেই যে বলে দেওয়া যায় যে, সেজন্য মানবীয় ও সামাজিক মূল্য দিতে হয়। ২০১৩ সালে ভবন ধসে নিহত হয়েছিল এক হাজারেরও বেশি লোক। কিন্তু সার্বিকভাবে মনে হয় শিল্পায়ন কৌশল যথার্থই কাজে দিচ্ছে। নতুন শতাব্দী শুরুর পর থেকে মাথাপিছু মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) বৃদ্ধি পেয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি। অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয়তা টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারিংকে কম শ্রমঘন বানিয়ে ফেলছে। এর একটি অর্থ দাঁড়াচ্ছে দরিদ্র দেশগুলো গার্মেন্ট শিল্পবাবদ নগরে ব্যাপক হারে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে নাও সমর্থ হতে পারে। আবার এর চেয়ে বড়ো সমস্যাও এসে দাঁড়াতে পারে সামনে। স্বয়ংক্রিয়তার দরুন গার্মেন্টসশিল্প ফের অভিবাসিত হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ধনী দেশগুলোয়, যেসব রাষ্ট্রে শ্রমিক খাটানো ব্যয়বহুল হলেও পুঁজি তুলনামূলকভাবে সস্তা। প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে এরকম বিপরীতমুখী কিছু শিল্পসংক্রান্ত অভিবাসন ইতিমধ্যে কিন্তু ঘটেছে এবং ঘটছে। কিছু অর্থনীতিবিদ যুক্তি দেখান যে, স্বয়ংক্রিয়তা উন্নয়নের ঐতিহ্যবাহী পথগুলো বন্ধ করেনি এবং দুর্বল দেশগুলোর পরিশ্রমী লোকজনের জন্যে এখন পর্যন্ত প্রচুর কাজ রয়েছে। যদি বাংলাদেশ এগিয়ে যায় দ্রুততার সঙ্গে, তাহলে এটি বাতলে দেবে যে, টেক্সটাইল দিয়ে শুরু করা ম্যানুফ্যাকচারিং এখন পর্যন্ত শিল্পায়নের টিকিট স্বরূপ। অটোমেশনের ফলে শ্রমবাজারে যে ঝুঁকি তৈরি হবে তার জন্য এখনই প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।
