আলোকপাত

আনন্দ-ভালোবাসার বাঙালি

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ২২:১১

অজয় দাশগুপ্ত

বাণিজ্যিক দুনিয়ায় এখন যেকোনো উত্সব মানেই কেনাকাটা। মানুষকে কেনার জন্য পাগল করে তোলার কায়দা দিনকে দিন বাড়ছে। এখানে বড়ো বড়ো শপিং মলগুলো খ্রিষ্টমাস অবধি দিনরাত খোলা ছিল। রাত ৯টা না বাজতেই ঘুমে তলিয়ে যাওয়া কিংবা রাস্তাঘাটে মানুষহীন এক ভূতুড়ে শহর এখন পুরো রাত জমজমাট ছিল। অফিস-আদালতে উপহার বিনিময়ও অনেকটা বাধ্যতামূলক। বলা উচিত সৌজন্যমূলক। আপনাকে কেউ দেবে আর আপনি তাকে খালি হাতে ফেরাবেন, এমন তো হতে পারে না। শিশুদের সঙ্গে যারা কাজ করেন, তাদের ঘর ভর্তি হয়ে যায় চকোলেট আর কেক কিংবা নানা উপহারের বাক্সে। দীপা স্কুলে কাজ করে। তাই আমাদের বাসার ড্রয়িংরুমের এক কোনায় একটা বাড়তি টেবিল বসানো হয় বড়দিনের আগে আগে। আস্তে আস্তে সেই টেবিল ভর্তি হতে হতে উপচে পড়ে। তার ফাঁকে আমার ভাগ্যে জোটা এক বা দুইটা কার্ড আর ছোটো দুই-একটা প্যাকেট সলজ্জতায় নিজেদের জায়গা করে নেয়।

অফিসে উপহার বিনিময়ের পাশাপাশি খাবারের প্রচলনও চমত্কার ছিল। এদেশে না এলে জানতামই না যে পৃথিবীতে হেন কিছু নাই, যা মানুষ খায় না। আমেরিকার মানুষ যা খায় না, আফ্রিকার মানুষ তা আনন্দ করে খায়। উপমহাদেশের মানুষ যা খায়, তা দেখলে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে ইউরোপের কেউ। আবার ল্যাতিন আমেরিকান বা ভিয়েতনামির খাবার দেখে আপনার হয়তো সন্দেহ হতে পারে, আসলেই কি মানুষ এসব খায়? বড়ো বিচিত্র এই জগত্। আমরা ধর্মের নামে মারামারি-কাটাকাটি, বর্ণ-জাতির নামে দাঙ্গা করি, মারি ও মরি অথচ একবারও ভাবি না ঈশ্বর কতটা বিচিত্রমুখী। আর কত বৈচিত্র্যময় করে বানিয়েছেন মানুষ ও দুনিয়া। যদি তা বিশ্বাস না-ও করেন, প্রকৃতির ভেতরেই আছে স্বতন্ত্র বোধ, যার কারণে এতটা আনন্দের এই বাঁচা।

খ্রিষ্টমাস এখানকার বাংলাদেশি খ্রিষ্টানরাও পালন করেন যথাযথ মর্যাদায়। আমার যাওয়া হয় তাদের আয়োজনে। আমি কোনো তফাত দেখি না। সেই আমাদের মতো আমাদের ভাষায়, আমাদের গানে, কবিতায়, আমাদের দেশের পোশাকে বা খাদ্যে তাদের আয়োজন। এতে আর যাই থাক, লেগে থাকে এক টুকরো বাংলাদেশ। দেখলেই মনে হয় যার যা পরিচয়, যার বোধ বা বিশ্বাস যদি সে নিজের ভাষায় প্রকাশ করতে না পারছে, সবই কেমন মেকি। মুসলমানরা যেমন আরবি, হিন্দুরা সংস্কৃত আর বৌদ্ধরা পালির পরপরই ফিরে আসেন বাংলায়। এরা ফেরেন ইংরেজির পর মাতৃভাষায়। আমি সব সময় বলি ও বিশ্বাস করি, সমাজ যদি এদের জীবনযাপন ও পোশাক নিতে পারত, আমাদের আধুনিকতা আরো পোক্ত হতো। এরা ভালো ইংরেজি বলেন। এরা পোশাকে কেতাদুরস্ত। এরা কাঁটাচামচ আর ছুরির নিপুণ ব্যবহার জানেন। এসবই তো আজকের দুনিয়ার অনিবার্য অনুষঙ্গ। যখন এদেশে আসি, তখন এসবের ব্যবহার জানতাম না বলে কত লজ্জা পেয়েছি। এমনও হয়েছে, সবাই খাচ্ছে পেটে খিদে আর মুখে লাজ নিয়ে। বলেছি, আই এম ফুল আই এম ফুল। আসলে পেট ফুল না, ফুল মানে বোকাই ছিলাম। বাঙালি খ্রিষ্টানদের উত্সবে একটা বিষয় থাকবেই—প্রকাশনা। ঝকঝকে তকতকে সেই প্রকাশনায় তারা সব ধর্মের বাঙালিদের সঙ্গে রাখেন। তাদের মতামত লেখা নিয়ে জানিয়ে দেন উত্সব সবার।

n লেখক :সিডনি প্রবাসি প্রাবন্ধিক