আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীর উদ্দেশে বলেছেন, আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী, জামায়াত, রাজাকার, লুটেরা, অর্থ পাচারকারী, খুনি, এতিমের টাকা আত্মসাত্কারী ও যুদ্ধাপরাধীদের প্রত্যাখ্যান করুন। তাদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সতর্ক থাকবেন। তারা যেন কোনোভাবেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে। গতকাল বুধবার বিকালে রাজধানীর সুধাসদন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চট্টগ্রাম, পিরোজপুর, কক্সবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নির্বাচনী জনসভায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। তারা ভোট কারচুপি, ভুয়া ব্যালট করতে ওস্তাদ। আগামী নির্বাচনে ভোটে জেতার জন্য বিএনপি বিভিন্ন প্রেসে ভুয়া ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে এবং টাকা ছড়াচ্ছে। দলীয় নেতা-কর্মিসহ সকলকে ষড়যন্ত্রকারীদের (বিএনপি) সম্পর্কে সতর্ক থাকার আহবান জানান তিনি। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী কোথায় এবং কোন কোন ছাপাখানা এ ধরনের ভুয়া ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে, তা খুঁজে বের করারও নির্দেশনা দেন।
শেখ হাসিনা বলেন, লন্ডন থেকে বিএনপি নেতা পরিকল্পনা করছেন, অন্যদিকে তার সহযোগীরা নির্বাচনে বিজয়ী হতে এখানে ষড়যন্ত্র করছেন। তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই যে, তাদের একটি খারাপ পরিকল্পনা আছে।’ তিনি বলেন, বিএনপি এখন নিজেদের কার্যালয় ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে দোষারোপ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। জনগণ আগামী ৩০ ডিসেম্বর শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ভোট দিতে চায়। অন্যদিকে বিএনপি জনগণের ভোটাধিকার ছিনিয়ে নিতে চায়। কিন্তু সবাই যদি সতর্ক থাকে তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র সফল হবে না।
ভোটের ৩/৪ দিন আগে তারা সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চালাতে পারে
২০১৪ ও ২০১৫ সালে বিএনপি ও জামায়াত জোটের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সে সময়ে নির্বাচন ভন্ডুল এবং সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে আগুন সন্ত্রাসী শুরু করে। তবে তাদের বিরুদ্ধে জনগণ প্রতিরোধ গড়ে তোলায় তাদের সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি। শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের কাছে তথ্য আছে, তারা ভোটের দিনের তিন থেকে চার দিন আগে আবারো এ ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়ন অব্যাহত আওয়ামী লীগকে আবারো নির্বাচিত করার আহ্বান জানান।
পিরোজপুর অফিস জানায়, পিরোজপুর শহরের গোপাল কৃষ্ণ টাউন ক্লাব মাঠে আয়োজিত জনসভায় ভিডিও কনফারেন্সে বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা। পিরোজপুর জেলায় নৌকা, ১৪ দলীয় জোট ও মহাজোটের এমপি প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। পিরোজপুর-২ আসনে (কাউখালী-ভান্ডারিয়া-ইন্দুরকানি) ১৪ দলীয় জোটের একক প্রার্থী হলেন জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান ও পানিসম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি ‘বাইসাইকেল’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। পিরোজপুর-১ আসনে (সদর-নাজিরপুর-নেছারাবাদ) আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় আইন বিষয়ক সম্পাদক এডভোকেট শ ম রেজাউল করিম নৌকা প্রতীকে এবং পিরোজপুর-৩ আসনে (মঠবাড়িয়া) মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টি-জাপা’র প্রেসিডিয়াম সদস্য ডা. রুস্তুম আলী ফরাজী লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করছেন। শেখ হাসিনা দল, জোট ও মহাজোটের এসব একক প্রার্থীদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ অঞ্চল এক সময় অবহেলিত ছিল। উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার স্বপ্ন ছিল বঙ্গবন্ধুর। সে লক্ষ্যে আমরা টুঙ্গীপাড়ার প্রতিবেশী জেলা পিরোজপুরের বিভিন্ন উন্নয়নে অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি। এ জেলায় রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। আমাদের লক্ষ্য সুষম উন্নয়ন। লুটেরা, অস্ত্র পাচারকারী, অর্থ পাচারকারী, এতিমের টাকা আত্মসাত্কারী, যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গিদের ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা আরো বলেন, বিএনপি বিভিন্ন প্রেসে জাল ব্যালট পেপার ছাপাচ্ছে। এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, বিএনপির সময় বাংলা ভাইয়ের উত্থান হয়েছিল। জঙ্গি, আগুন-সন্ত্রাস তাদের সঙ্গী। তারা ক্ষমতায় এলে আবার এগুলো প্রতিষ্ঠা পাবে। প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্সকে ঘিরে টাউন ক্লাব মাঠে জনতার ঢল নামে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ অঞ্চলের জন্য আমরা যেসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি তার মধ্যে পিরোজপুর সদর উপজেলাকে ইতিমধ্যে শতভাগ বিদ্যুতায়িত করা হয়েছে। ক্রমান্বয়ে জেলার সকল উপজেলাকে শতভাগ বিদ্যুতায়নের আওতায় আনা হবে। সম্ভাব্যতা যাচাই করে কৃষিভিত্তিক শিল্প স্থাপনা, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, পিরোজপুরে শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, নদী খননসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হবে। এখানে যাতে যুুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের প্রার্থীকে মানুষ ভোট না দেয় তার জন্য স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তিকে সজাগ থাকতে হবে। স্বাধীনতা বিরোধীদের পরাজিত করতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় আসলে স্বাধীনতার চেতনা নস্যাত্ করে ধ্বংস করে দেবে।
চট্টগ্রাম অফিস জানায়, চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের জনসভায় ভিডিও কনফারেন্সে বক্তৃতাকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলমান প্রকল্পগুলো শেষ করতে সরকারের ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। অন্য কেউ ক্ষমতায় এলে সব প্রকল্প বন্ধ হতে পারে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং সবার জন্য উন্নত জীবন নিশ্চিতে নৌকায় ভোট দিতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে গড়ে তুলছি। বাংলাদেশ আজ ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত হতে চলেছে। আমি নৌকায় ভোট চাই। আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন। যাতে করে উন্নয়নের গতিধারা ধরে রাখতে পারি। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সবসময় আবহেলিত ছিল। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে বলেই চট্টগ্রামের উন্নয়ন হচ্ছে। চট্টগ্রামের ১৬টি আসনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন শেখ হাসিনা।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন ও বিমানবন্দর উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার হয়ে ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইনের কাজ শুরু করে দিয়েছি। আগামীতে ঢাকা-চট্টগ্রাম বুলেট ট্রেন করে দেব, যাতে দ্রুত চলাচল করতে পারেন। পুরো চট্টগ্রাম জেলা ও বিভাগ ঘিরে উন্নয়নের ব্যাপক কাজ হাতে নিয়েছি।
মিরসরাইয়ে একটি ইপিজেড এবং বন্দরে বে-টার্মিনাল করা হবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চট্টগ্রামবাসী সব সময় আওয়ামী লীগের পাশে ছিল। আগামী নির্বাচনে আমরা চাই, চট্টগ্রামের জনগণ নৌকায় ভোট দিয়ে তাদের সেবা করার সুযোগ করে দেবে।
এ সময় নৌকার কয়েকজন প্রার্থী ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। চট্টগ্রাম-১ আসনের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশারফ হোসেন বলেন, ‘গত দশ বছর চট্টগ্রামসহ সারা দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে, তার জন্য চট্টগ্রামবাসী আপনাকে বিজয়ী করবে।’ চট্টগ্রাম-৮ আসনে মহাজোটের প্রার্থী মঈনুদ্দিন খান বাদল বলেন, ‘আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ কতটা এগিয়েছে আজকের মিটিং তার প্রমাণ।’ উত্তরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এটা ডিজিটাল বাংলাদেশ।’
আরেক প্রার্থী হাছান মাহমুদ বলেন, এই জনসভা প্রমাণ করে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। চট্টগ্রাম নগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা আরেকবার আপনাকে প্রধানমন্ত্রী করব। নৌকার জয় হোক।’ জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন চট্টগ্রাম-৯ আসনের প্রার্থী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, উত্তর জেলার সাধারণ সম্পাদক এম এ সালাম ও দক্ষিণ জেলার সভাপতি মোসলেম উদ্দিন আহমেদ। অনুষ্ঠানে নৌকার প্রার্থী ফজলে করিম চৌধুরী, সামশুল হক চৌধুরী, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, নজরুল ইসলাম, মাহফুজুর রহমান মিতা, দিদারুল আলম, নজিবুল বশর মাইজভান্ডারি, এম এ লতিফ ও আফসারুল আমীন এবং নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন উপস্থিত ছিলেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের জয়যুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে স্থানীয় নিয়াজ মোহাম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত জনসভায় ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নিয়ে তিনি এ আহ্বান জনান।
