দশ দিগন্তে g আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
দেশের রাজনীতি এখন ডানদিকে টাল নিয়েছে। আগে যে শক্তিশালী বাম দলগুলো ছিল, যেমন সিপিবি, ভাসানী ন্যাপ তাও এখন গণনা করার মতো শক্তি নয়। ভাসানী ন্যাপ তো নামেমাত্র আছে। বাকিটা বিএনপির পেটে হজম হয়ে গেছে। মুজাফ্ফর ন্যাপও আগে কম শক্তিশালী দল ছিল না। তাকেও গ্রাস করেছে আওয়ামী লীগ এবং গণফোরাম।
বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগও এখন নেই। টাল খেয়েছে সম্পূর্ণ ডানদিকে। এককালের বিক্রমশালী জাসদ এখন টুকরো টুকরো, মুখে মার্কসবাদ, কাজে সুবিধাবাদ। বিএনপি চরম ডানপন্থি। জামায়াত তো শুধু উগ্র ডানপন্থি নয়, সন্ত্রাসী দল। এই দলের মধ্যেও বিভাজন ঘটেছে। ওয়ার্কার্স পার্টিসহ ছোটো ছোটো বাম দলগুলোরও এখন বাম চরিত্র নেই।
তাহলে দেশে বামপন্থি শক্তি কোথায় ? পশ্চিমবঙ্গেও এই বামশক্তির পতন ঘটেছে। সিপিএমের নেতৃত্বে বাম দলগুলো ক্ষমতায় আসার পর দেখা গেল সেই বামফ্রন্ট সরকার সম্পূর্ণভাবে আগের কংগ্রেস সরকারের চরিত্র ধারণ করেছে। শিল্পোন্নয়নের নামে বিড়লার মতো বাঘা পুঁজিপতির পক্ষ নিয়ে কৃষকের জমি দখল করছে, কৃষক হত্যা করছে কমিউনিস্ট সরকার!
পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু তো প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছিলেন, “I preach like a priest, but live like a prince” (আমি পুরোহিতের মতো কথা বলি, রাজপুত্রের মতো জীবন-যাপন করি।) পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের অবস্থা দেখে এক নির্দলীয় বাম কলামিস্ট দিলীপ দত্ত লিখেছিলেন,“সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত শ্রেণির দ্বারা কখনোই খাঁটি সমাজতান্ত্রিক দল গড়ে উঠতে পারে না। প্রথম যৌবনে এরা মনের রোমান্টিক প্রবণতার জন্য বামপন্থি, এমন কি কট্টর বামপন্থি হয়। কিন্তু যৌবনের ঘোর কেটে মধ্যবয়সে পৌঁছলেই তা কেটে যায়। এরা নামে ও কথাবার্তায় বামপন্থি থাকে। কাজে আবার সুবিধাবাদী মধ্যবিত্ত হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে সেটাই দেখা দিয়েছে।”
একই কথার অনুরণন শোনা গেছে ফিডেল ক্যাস্ট্রোর মুখেও। বহুদিন আগে তিনি একবার কিউবা থেকে অন্যত্র যাওয়ার মুখে কলকাতা বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি ঘটিয়েছিলেন। এই সময় তিনি যখন জানতে পারলেন, কলকাতায় ১৭টি কমিউনিস্ট পার্টি আছে, তখন তার অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। তিনি বিমান বন্দরে উপস্থিত সাংবাদিকদের বললেন, “প্রকৃত কমিউনিস্টরা কখনো এত ভাগে ভাগ হতে পারে না।” পশ্চিমবঙ্গে কমিউনিস্ট সরকার সিন্ধুর এবং নন্দীগ্রামে শিল্পপতিদের জন্য জমি দখলের জন্য কৃষক হত্যা করেছে এ খবর জানার পর লন্ডনের বামপন্থি সাপ্তাহিক ‘ওয়ার্কার্স’ পত্রিকা মন্তব্য করেছিল,“এটা কমিউনিস্ট সরকার হতে পারে না, এটা ফ্যাসিস্ট সরকার। ইউরোপে গত শতকের ত্রিশের দশকে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি (নািস) থেকেই ফ্যাসিস্ট হিটলারের আবির্ভাব ঘটেছিল।”
বাংলাদেশে ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন একজন সত্ বামপন্থি, জাসদের ইনু তা নন। দুজনে জাতীয় স্বার্থে শ্রেণি স্বার্থে নয়। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটে যোগ দিয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ তাদের ব্যবহার করে যথাসময়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। মন্ত্রী হয়ে মেনন সাধারণ মানুষের কাছে তার যে বামপন্থি ইমেজ ছিল তা হারিয়েছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে সে এখন সত্যিকারের একটি ডানপন্থি দল। যে দল দুর্দিনে যাদের মিত্র বলে বুকে টেনে নেয়, সুদিনে তাদের বুক থেকে ছুড়ে ফেলতে দ্বিধা করে না।
শুধু মেনন বা ইনুর বেলায় নয়, এককালে বঙ্গবন্ধুর প্রিয়ভাজন এবং বর্তমানে জেপির নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর ভাগ্যেও একই পরিণতি ঘটেছে। বার বার নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র থেকে নির্বাচিত এবং আওয়ামী লীগের দুর্দিনের বন্ধু মঞ্জুও এবার মন্ত্রী হতে পারেননি। এই আওয়ামী-রাজনীতির উদাহরণ মেলে গত শতকের ইউরোপের কোনো কোনো দেশে। যেখানে ডানপন্থি দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ছোটো ছোটো মধ্যপন্থি দলগুলোকে ব্যবহার করেছে; তারপর তাদের কলার খোসার মতো ত্যাগ করেছে। বলেছে এগুলোর কোনো জনপ্রিয়তা (ভোট) নেই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ডানপন্থার এখন জয়জয়কার। এমনকি যে চরম ডানপন্থি বিএনপি, তারও অবস্থানের চৌদ্দ আনা এখন আওয়ামী লীগের দখলে। আগে নব্যধনী, অসাধু ব্যবসায়ী, সিভিল এবং মিলিটারি ব্যুরোক্রেসির যে সমর্থন ছিল বিএনপির দিকে, এখন তা আওয়ামী লীগের দিকে। সাম্প্রদায়িকতার চরিত্র-বৈশিষ্ট্য ছাড়া বিএনপির দখলে আর কোনো মূলধন নেই। তাই জনগণের কাছে খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি তারা দিতে পারছে না; কিন্তু এই কর্মসূচির প্রতি জনগণের সমর্থন না থাকায় তারা মাঠে নামতেও পারছে না। এখানেই বর্তমান হাসিনা-রাজনীতির সাফল্য।
দেশের ডান ও বাম রাজনীতি সম্পর্কে আজ এত কথা লিখলাম এজন্য যে, সম্প্রতি ঢাকার কাগজে দেখলাম, ঢাকার পুরানা পল্টনে মুক্তি ভবনে সিপিবি বা বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ২৫তম সভায় দলের সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম দেশে বাম বিকল্প শক্তি গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বিস্মিত হয়ে ভাবছি, যে দেশে বামশক্তি বলে এখন কিছু নেই, সেদেশে এখনকার প্রচণ্ড শক্তিশালী ধনবাদী শিবিরের মোকাবিলায় অনুরূপ শক্তিশালী বাম বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার সুযোগ কোথায়? এই ধরনের ঐক্যতো অতীতে অনেক পুঁটি মাছ মিলে বৃহত্ রাঘব বোয়ালের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হয়েছিল। তার পরিণতি কী ঘটেছে? অনেক পুঁটি মাছ রাঘব বোয়ালের পেটে হজম হয়েছে।
কার্ল মার্কস বলেছেন, ‘যদি প্রচণ্ড শক্তিশালী ধনবাদকে আঘাত করতে হয়, তাহলে তদনুরূপ শক্তিশালী সর্বহারা ঐক্য গড়ে তুলতে হবে’। এখানে সর্বহারা-ঐক্য বলতে তিনি শ্রমিক-কৃষক এবং ভূমিহীনদের ঐক্য বুঝিয়েছিলেন। অবিভক্ত ভারতে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি যে এত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, তার মূলে ছিল ঐক্যবদ্ধ অলইন্ডিয়া ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেসের শক্তিশালী রাজনৈতিক ও আর্থিক সমর্থন। বিলাতে লেবার পার্টি অতীতে টোরি পার্টিকে মোকাবিলা করতে পেরেছে ট্রেড ইউনিয়নের অর্থে ও সমর্থনে। বিগ বিজনেসের মালিকেরা অর্থ জুগিয়েছে টোরি পার্টিকে, শ্রমিক ইউনিয়গুলো অর্থ জুগিয়েছে লেবার পার্টিকে। টনি ব্লেয়ারের মতো এক ধূর্ত ও সুবিধাবাদী নেতা লেবার পার্টিতে ঢুকে দলের নীতি ও আদর্শের পরিবর্তন ঘটিয়ে ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে বিবাদ শুরু করলে লেবার পার্টির শক্তি ও ঐক্যে ভাঙন ধরে। এবারের সাধারণ নির্বাচনেও যে লেবার পার্টির পরাজয় ঘটল তার মূল কারণ করবিন-নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্লেয়ারপন্থিদের চক্রান্ত।
বাংলাদেশে এখন কোনো বাম দলের পেছনেই কৃষক শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন নেই। শক্তিশালী ট্রেড ইউনিয়নও নেই। যেগুলো আছে সেগুলো বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠী ও সিন্ডিকেটের হাতে বন্দি। কোনো কমিউনিস্ট পার্টিকে বুর্জোয়া রাজনীতিতে নির্বাচনের মাঠে লড়াইয়ের জন্য টাকা জোগাবে কে? আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে টাকা জোগাচ্ছে বৃহত্ শিল্পপতি, পুঁজিপতিরা। কোনো বাম দলকে এই টাকা জোগাবে কে? এখন জাতীয় সংসদের নির্বাচনে একজন প্রার্থীকে প্রকাশ্যে ১০ কোটির মতো টাকা খরচ করতে হয়। অপ্রকাশ্যে তারা কত টাকা খরচ করেন, তা আমি জানি না। এই টাকা একজন সত্ বামপন্থি প্রার্থীকে কে জোগাবে? তাই বামপন্থি পরিচয়ের অনেক নেতাকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পরিচয়ে নির্বাচনে নামতে হয়। দুইটি প্রধান দলই তাদের ব্যবহার করে।
দেশে বামপন্থি রাজনীতি নেই। আবার বামপন্থি নামধারী দলগুলো সংসদীয় গণতন্ত্র মেনে নেওয়ার পর এই রাজনীতিতে লড়তে এসে অর্থ বল ও জনবল সংগ্রহ করতে পারছেন না। তারা নিজেরা ঐক্যবদ্ধ নন, তাদের পেছনে কোনো ঐক্যবদ্ধ ট্রেড ইউনিয়ন নেই। বাম নেতারা চরিত্রেও বামপন্থি নন। শাপলা চত্বরে হেফাজতি অভ্যুত্থানে বহু দোকানপাট পোড়ানো হয়। বহু মানুষ সর্বস্বান্ত হয়। ঢাকার কমিউনিস্ট পার্টি অফিসও হেফাজতি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই সময় দেখা গেল, কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম জনগণের বিপুল ক্ষয়ক্ষতিতে দুঃখিত না হয়ে কমিউনিস্ট পার্টির অফিস প্রাঙ্গণে রাখা তার মোটর গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।
আমি দেশে বাম বিকল্প শক্তির বিরোধী নই; কিন্তু দেশে বাম রাজনীতি কোথায় যে তাদের নিয়ে বিকল্প শক্তি গড়ে উঠবে? দেশের কর্মজীবী শ্রেণি আজ বিভক্ত এবং বড়ো ধনবাদী দলগুলোর খপ্পরে। আওয়ামী লীগের আছে শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, তাঁতী লীগ, জোলা লীগ ইত্যাদি। বিএনপিরও আছে অনুরূপ জাতীয়তাবাদী কৃষক দল, শ্রমিক দল ইত্যাদি।
ছাত্র-রাজনীতিতেও একই অবস্থা। বামপন্থি ছাত্র ইউনিয়নের সেই ঐক্য ও শক্তি এখন নেই। তারাও বিভক্ত। ছাত্র লীগ ও ছাত্রদল মিলে দেশের রাজনীতিকে পুঁজিবাদী পৃষ্ঠপোষকদের স্বার্থে বিষাক্ত করে তুলেছে। এই অবস্থায় মুজাহিদুল ইসলামের মতো জনসমর্থনহীন নেতারা যদি সত্যই দেশের বর্তমান অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে চান, তাহলে তথাকথিত বামপন্থার খোলস ত্যাগ করে অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলার জন্য সব ছোটো দলকে ঐক্যবদ্ধ করুন। ছাত্র রাজনীতিকে বড়ো দুইটি দল এবং তাদের সিন্ডিকেটের প্রভাবমুক্ত করুন। শ্রমিক ও কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ করে তাদের সমর্থনে ও অর্থে রাজনৈতিক তহবিল গড়ে তুলুন। অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চেতনায় দেশের গণমানুষকে শিক্ষিত করে তুলুন। মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলোকে জামায়াতের প্রভাবমুক্ত করুন। তথাকথিত ইসলামিক ব্যাংক ও ইনসিওরেন্স কোম্পানিগুলোর গ্রাস থেকে দেশের অর্থনীতিকে মুক্ত করার আন্দোলন গড়ে তুলুন। একমাত্র তাহলেই দেশে গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তি গড়ে উঠবে এবং দেশ বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্ত হবে। অন্যথায় বর্তমানের ‘বামড্রয়িং রুম পলিটিকস’ দ্বারা দেশের অবস্থার কোনো পরিবর্তন কেউ ঘটাতে পারবে না।
[ লন্ডন, ২৮ ডিসেম্বর, শনিবার, ২০১৯ ]

