হেথা নয় অন্য কোথাও...

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৯:২২

হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে—এ অন্য কোনোখানে, অর্থাত্ চিত্তের রসদ জোগাতে ভ্রমণবিলাসি সৌন্দর্যপিপাসুরা এই শীতে বেড়িয়ে আসতে পারেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অলকাপুরী পার্বত্য রামগড়ে। প্রকৃতির দেহে যে রূপ-বৈচিত্র্য, মনোমুগ্ধকর ছন্দ স্বাভাবিকভাবে বর্তমান, অরণ্য-দুহিতা পার্বত্য এলাকার অঙ্গে অঙ্গে তা নিবিড়ভাবে পরিষ্পুট। এ পার্বত্য অঞ্চলের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত যেদিকে দৃষ্টি ফেলবেন চোখের সামনে ফুটে উঠবে এক শ্যামল সুন্দর দৃশ্যাবলি। এ অরণ্যাঞ্চলের এক রহস্যময় রূপ আছে, যা শুধু কেবল বিস্মিত করে না, চিত্তলোকে এনে দেয় গাম্ভীর্য। অজানা-অচেনা গাছগাছালি হাত বাড়িয়ে বন্ধুর মতো যেন আহ্বান জানায়, ‘এসো বন্ধু, বসো আমার সুশীতল ছায়াতলে।’ পাহাড়ের বুকচিরে চলে গেছে পাহাড়ি ঝরনা ছড়া। পর্বত দুহিতার এ অগণিত ঝরনা ছড়া পার্বত্য এলাকার নৈসর্গিক সৌন্দর্যকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র রূপ। অরণ্যের কোলে লালিত, বর্ধিত অরণ্য সৌন্দর্যে ভরপুর পাহাড়িয়া জীবনযাপন, পাহাড়ি সংস্কৃতি, কৃষ্টি ঐতিহ্যও অরণ্যের সঙ্গে একাত্ম, অভিন্ন।

প্রাচীন সাবেক মহকুমা ও সীমান্ত শহর রামগড় বঙ্গ জননীর অপরূপ শোভায় শোভিত এক আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান। রামগড়ের প্রবেশদ্বারের রয়েছে সুবিশাল চা বাগান। ফেনী খাগড়াছড়ি কালো পিচের সড়কটি এ চা বাগানের সবুজ বুকচিরে চলে গেছে রামগড়ে। প্রতিদিনই এ সড়কে যাতায়াতকারী হাজার হাজার যাত্রী একপলকে ভোগ করেন চা বাগানের শান্ত সবুজ অপার সৌন্দর্য। চা বাগানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক বিশাল প্রাকৃতিক লেক। হাজার হাজার অতিথি পাখির ছোটাছুটি, খুনসুটি, সুমধুর কলতানে মুগ্ধ হন যে কেউ। রামগড় শহরের উপকণ্ঠে লেক পার্কটিও আকর্ষণীয়। এখানে রয়েছে একটি চমত্কার ঝুলন্ত ব্রিজ। আর আছে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ভাস্কর্য ‘বিজয়’। এই লেক পার্কের কাছেই ভারত সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবির জন্ম স্মৃতিস্তম্ভ। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত দৃষ্টিনন্দন এ স্মৃতিসৌধে লেখা রয়েছে ১৭৯৫ সালে রামগড়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর গোড়াপত্তনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। রয়েছে পোড়ামাটির টেরাকোটায় এ বাহিনীর বিভিন্ন বিবর্তনের অবয়ব। এর একটু দূরেই সীমান্তবর্তী ফেনী নদীর কিনারে অবস্থিত প্রাচীন এসডিও বাংলোটিও বেশ সুন্দর। পৌর শহর থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে রয়েছে কলসিমুখ নামে এক আকর্ষণীয় স্থান। কলসির আকৃতিতে এঁকেবেঁকে যাওয়া সীমান্তবর্তী ফেনী নদী, এর মাঝে দ্বীপভূমির সদৃশ্য একটি পাহাড়ি গ্রাম। যার উত্তরে ভারতের বৈষ্ণবপুর, পূর্বে ছোট সাব্রুম ও পশ্চিমে জোরকুম্বা। এভাবে ৩ দিকেই ঘিরে আছে ভারত। প্রায় ৪০০ একর আয়তনের ফেনী নদীর কোলের এ কলসিমুখ  গ্রামে বসবাস করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মারমা সম্প্রদায়ের অর্ধশত পরিবার। শিল্পীর রঙ-তুলিতে আঁকা কোনো মনকাড়া ছবির মতোই এমন নৈসর্গিক দৃশ্য দেখা যায় নদী থেকে ৫-৬শ’ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত বিজিবির ক্যাম্প থেকে। উপজেলা সদরের অদূরেই পাহাড়াঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্র এবং এর একটু দূরে অবস্থিত হর্টিকালচার সেন্টারের (স্থানীয়ভাবে যথাক্রমে সয়েল বাগান ও পাইলট বাগান নামে

পরিচিত) প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মুগ্ধ করে ভ্রমণপিপাসুদের। রামগড় থেকে মাত্র দেড়, দুই ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়া যায় খাগড়াছড়ি জেলার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট ‘আলুটিলা’য়। এটি এই জেলাবাসীর কল্পনার দার্জিলিং। জেলার সর্বোচ্চ পাহাড় এই আলুটিলার বুকচিরে সর্পিল আকারে চলে গেছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনী মহাসড়কটি। রাস্তার দু-ধারে সবুজ বনাঞ্চলে ঢাকা সারিসারি উঁচ-নিচু পাহাড়। পাহাড়ের গা ঘেঁষে ভাসমান মেঘের লুকোচুরি খেলা, কোথাও আবার পাহাড়ের ঢালে ফল-ফলাদি ও রাবার বাগান আর পাহাড়িদের জুম ফসলের ক্ষেত। আলুটিলা বটমূল তথা পর্যটন স্পটে রয়েছে প্রকৃতির সৌন্দর্যকে উপভোগ করার সুন্দর ব্যবস্থা। আছে বসার পাকা বেঞ্চ এবং একাধিক অবজারভেশন টাওয়ার। নিরাপত্তার জন্য রয়েছে পুলিশ। কয়েকটি টি-স্টল আছে। এখানে রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বিশালায়তনের একটি রহস্যময় সুরঙ্গ। আলুটিলার আরেক আকর্ষণ হচ্ছে ‘রিছং ঝরনা’। এটিও প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট। আলুটিলার চূড়ায় অবস্থিত বৌদ্ধ মন্দিরটিও বেশ সুন্দর। এক কথায় পুরো আলুটিলাটিই যেন স্বপ্নপুরী। এর সৌন্দর্য দেখে মনে হয় স্রষ্টা যেন এ পাহাড়জুড়ে আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে এক অপূর্ব লীলাক্ষেত্র তৈরি করেছেন তার শ্রেষ্ঠ জীব মানবকূলের জন্য। আলুটিলার নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে মুগ্ধ খাগড়াছড়ির সাবেক জেলা প্রশাসক খোরশেদ আনসার খান লিখেছেন, ‘ ক্লান্ত পথিক ক্ষণেক বসিও আলুটিলা বটমূলে, নয়ন ভরিয়া দেখিও মোরে চেঙ্গি নদীর কূলে।’ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে দেখা যাবে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ এখানকার বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনচিত্র ও তাদের বর্ণিল কৃষ্টি-সংস্কৃতি।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা ফেনী থেকে সহজেই যাত্রীবাহী কোচ বা বাসযোগে যাওয়া যায় রামগড় ও খাগড়াছড়িতে। ঢাকার কমলাপুর, ফকিরাপুল, সায়েদাবাদ প্রভৃতি স্থানে রয়েছে খাগড়াছড়ির বাস কাউন্টার। এসব স্থান থেকে বিভিন্ন পরিবহনের চেয়ারকোচের নৈশ ও দিবা সার্ভিস রযেছে। রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১২টা এবং সকাল ৭টা থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে এসব কোচ যাত্রা করে। খাগড়াছড়ি থেকেও এসব কোচের দিবা ও নৈশ সার্ভিস রয়েছে। এসব কোচে ঢাকা থেকে রামগড় আসা যায়। রামগড় ভ্রমণ শেষে এখান থেকে বাস ছাড়াও সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা চাঁদেরগাড়ি, পিকআপ রিজার্ভ করে আলুটিলায় যাওয়া যায়। ফেনীর মহিপাল ও চট্টগ্রামের অক্সিজেন বাস টার্মিনাল থেকে রামগড় ও খাগড়াছড়ির বাস ছাড়ে।