ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ২৫ জুলাই ইউক্রেন ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফোনালাপে। সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত না করলে ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এমন অভিযোগ করেন একজন হুইসেলব্লোয়ার বা গোপন তথ্য ফাঁসকারী। এরপরই ডেমোক্র্যাটরা উঠেপড়ে লাগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অভিশংসন করতে। তারা তদন্ত শুরু করেন। কারণ ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটের জো বাইডেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হতে পারেন। এই অভিযোগের তদন্ত করতেই বছরের অর্ধেক পার হয়ে গেছে। প্রতিনিধি পরিষদে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিশংসিত হওয়ার পর আগামী মাসে সিনেটে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
এই পুরো ঘটনায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বিষয় হলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে, তার সম্পর্কে নোংরা তথ্য খুঁজতে বিদেশি একজন নেতাকে চাপ দেওয়ার অভিযোগ। মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধ রাখার হুমকি দিয়েছেন। এর আগের নির্বাচনে জেতার জন্য রাশিয়ার সঙ্গে আঁতাত করেছিলেন বলে যে, অভিযোগ উঠেছিল সেই ঘটনাটিকে এখানে অবশ্যই মনে করিয়ে দিচ্ছে নতুন এই অভিযোগ। রাশিয়ার সঙ্গে আঁতাত প্রসঙ্গে দুই বছর ধরে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলেছে। ২০১৬ সালে ট্রাম্পের প্রচারণাবিষয়ক কর্মকর্তা ও তার ছেলের সঙ্গে কয়েকজন রাশিয়ানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তদন্তে বিস্তারিত উঠে আসে। যদিও শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়নি। মার্কিন বিচার বিভাগের গাইডলাইন অনুযায়ী বর্তমান কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা যাবে না।
প্রতিনিধি পরিষদ তার বিরুদ্ধে দু’টি অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠ রায় দিয়েছে। একটি অভিযোগ তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। আরেকটি হচ্ছে তিনি কংগ্রেসের কার্যক্রমে বাদ সেধেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ছাড়া আর যে দু’জন মার্কিন প্রেসিডেন্ট এর আগে অভিশংসিত হয়েছেন তারা হচ্ছেন—অ্যান্ড্রিউ জনসন এবং বিল ক্লিনটন। মার্কিন ইতিহাসে তৃতীয় প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হলেন ট্রাম্প।
নতুন পরিকল্পনা ডেমোক্র্যাটদের: উচ্চকক্ষ বা সিনেটে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আনা ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব পাশ হওয়ার সম্ভাবনা কম। সে কথা বুঝে এবার কোমর বেঁধে নেমেছে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাট। সিনেটে ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টের দিন পিছিয়ে আরো বেশি তথ্য সংগ্রহের ইঙ্গিত দিয়েছেন ডেমোক্র্যাট নেতৃত্ব। পরিষদের স্পিকার পেলোসির বক্তব্য, তারা সিনেটের সামনে চার জন সাক্ষীকে হাজির করতে চান। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, তারা এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। এদের মধ্যে হোয়াইট হাউজের ভারপ্রাপ্ত চিফ অব স্টাফ মিক মুলভ্যানি ও সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন রয়েছেন। সিনেটে সংখ্যালঘিষ্ঠ দলের নেতা চাক চুসুমার সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা ম্যাককোনেলের কাছে তাদের সাক্ষ্য দেওয়ার অনুমতি দিতে চিঠিও লিখেছেন। এছাড়া আনুষঙ্গিক তথ্য প্রকাশেরও দাবি জানিয়েছেন। ডেমোক্র্যাটরা চাইছেন ঐ চার জনের বয়ান সিনেটের সামনে তুলে ধরতে।
কী চান রিপাবলিকানরা: রিপাবলিকানরা সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বিচারের মতোই করতে চান। ক্লিনটনও প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসিত হয়েছিলেন। কিন্তু সিনেটে জয় পেয়েছিলেন। রিপাবলিকানরা আর কোনো সাক্ষীকে হাজির করতে নারাজ। দ্রুত শুনানি শেষ করে বিচারকাজ সম্পন্ন করতে চান। ডেমোক্র্যাটরা যেভাবে বিল ক্লিনটনকে রক্ষা করেছিলেন, তারাও তেমনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে রক্ষা করতে চান।
দেরি হবে বিচারে?: সাবেক প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রুিউ জনসনের বিচারকাজ সম্পন্নে ৮০ দিন সময় লেগেছিল। আর বিল ক্লিনটনের সময় লেগেছিল এক মাসের কিছু বেশি। আবার কংগ্রেসম্যানরা এখন ছুটিতে। আগামী ৬ জানুয়ারির আগে তারা ওয়াশিংটনে ফিরছেন না। জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে সিনেটে ট্রাম্পের ইমপিচমেন্টের বিষয়টি আলোচনায় ওঠার কথা। তবে ডেমোক্র্যাটদের চেষ্টা যদি সফল হয়, তাহলে তা আরো বেশ কিছুদিন পিছিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।
ভোটারদের মত কি পরিবর্তন হবে?: ডেমোক্র্যাটরা মনে করছেন, অভিশংসনের পরবর্তী ধাপ সাধারণ মানুষের আরো বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করবে। জনমত জরিপে দেখা গেছে ট্রাম্পকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে মতামত একদম সমান সমান। ওয়াশিংটন পোস্ট এবং টিভি চ্যানেল এবিসির সর্বশেষ জরিপে দেখা গেছে, ৪৯ শতাংশ অভিশংসনের পক্ষে। ৪৬ শতাংশের বিপক্ষে। বাকিদের কোনো মত নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক বোল্ট বলেন, নিক্সনের সময় ডেমোক্র্যাটরা খুব ধীর গতিতে এগিয়েছিল। তখন পর্যায়ক্রমে অল্প অল্প তথ্য আসছিল। যার কারণে শেষ পর্যন্ত নিক্সনকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। তিনি মনে করছেন, সেরকম হলে ডেমোক্র্যাটরা হয়তো আরো শক্ত তথ্য প্রমাণাদি পেত। কিন্তু তারা এবার খুব দ্রুত সবকিছু শেষ করতে চাইছেন যাতে করে তারা নির্বাচনের দিকে মনোযোগ দিতে পারেন।
