g দিদারুল আলম
সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতিকে বিচারকাজ থেকে সরিয়ে দেওয়াই ছিল গত বছরে দেশের বিচারাঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা। দুর্নীতি ও গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে উচ্চ আদালতের তিন বিচারপতিকে বেঞ্চ থেকে প্রত্যাহার করে নেন খোদ প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নেতৃবৃন্দ। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছিলেন, বিচার বিভাগে যারা সঠিক পথ অনুসরণ করছেন না, এই পদক্ষেপটা তাদের জন্য একটা বার্তা। কারণ কোনো মন্ত্রী, বিচারপতি বা আমরা সাধারণ মানুষ কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নই। আমার ব্যক্তিগত অভিমত হচ্ছে, বিচার বিভাগকে কলুষমুক্ত করার জন্য যা যা করার দরকার, দৃঢ় হাতে তা করা উচিত। বিচারকাজ থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া ওই তিন বিচারক হলেন বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক। সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তেমনি দুর্নীতির মামলায় জামিন নামঞ্জুরের ক্ষেত্রে ছিল কঠোর অবস্থানে।
এছাড়া বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে প্রধান বিচারপতির এজলাসে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানের সঙ্গে বিক্ষোভ ও হট্টগোল, ফেনীর নুসরাত হত্যা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড, সর্বোচ্চ আদালতের এজলাসকক্ষে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা (সিসি ক্যামেরা) স্থাপন, গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলা মামলায় সাত জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড, বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির জামিন, কুমিল্লার তৃতীয় অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতকক্ষে বিচার চলাকালে এক আসামি আরেক আসামিকে ছুরিকাঘাত করে হত্যার ঘটনাও দেশ জুড়ে নান আলোচনার জন্ম দেয়।
এসব ঘটনাকে ছাপিয়ে উচ্চ আদালত থেকে দেওয়া বিভিন্ন রায় ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বিচারপ্রার্থী জনগণের মধ্যে আশার সঞ্চার ঘটায়। এর মধ্যে হাইকোর্টের আদেশে প্রধান বিচারপতির এজলাসসহ হাইকোর্টের সব বেঞ্চে এবং নিম্ন আদালতের প্রতিটি বিচার এজলাসে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি টাঙানো হয়। একই সঙ্গে প্রতিটি দিবসে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের শীর্ষপর্যায় থেকে শুরু করে সর্বস্তরের প্রত্যেক দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে ভাষণ বা বক্তব্যের শুরু এবং শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে শিশুসহ মারা যায় অনেকে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় দুই সিটি করপোরেশনের ভূমিকায় উষ্মা প্রকাশ করে হাইকোর্ট বলেছে, কেউ যদি জেগে ঘুমায় তাহলে তাকে জাগানো যায় না। দুই সিটি করপোরেশনের অবস্থা হচ্ছে সেই রকম। মশা নিধনের বিষয়টি সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ সিরিয়াসলি (গুরুত্বসহকারে) নিচ্ছে না।
এছাড়া দুর্নীতির বিরুদ্ধেও কঠোর অবস্থানে ছিল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এর মধ্যে দুর্নীতির মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত খালেদা জিয়ার জামিন নাকচ করেছে আদালত। এছাড়া ৪০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের পরেও পুলিশের সাবেক ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আদালত বলেছে, ডিআইজি মিজান কি এতই ক্ষমতাধর? সে কি দুদকের চাইতেও ক্ষমতাশালী? তাকে কেন গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না? আপিল বিভাগের এই উষ্মা প্রকাশের পর অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় আত্মসমর্পণ করে হাইকোর্টে আগাম জামিন চান তিনি। মিজানকে জামিন না দিয়ে সরাসরি কারাগারে পাঠিয়ে দেয় হাইকোর্ট। এসব ঘটনার পাশাপাশি দুধ ও ভেজাল খাদ্যপণ্য বাজারজাতকরণের ওপর হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা, সড়ক দূর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ফিটনেসবিহীন গাড়িতে জ্বালানি সরবরাহ না করতে হাইকোর্টের বিভিন্ন নির্দেশনা স্বস্তি ফেলে মানুষের মনে।
