কমছে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ
g রেজাউল হক কৌশিক
বছরের শুরুতেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছিলেন জনগণ। অর্থনীতির অল্প কিছু সূচক ইতিবাচক হলেও অনেক সূচকই ছিল নেতিবাচক। প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স, ডুয়িং বিজনেসসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে ভালো করেছে দেশের অর্থনীতি। অন্যদিকে রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি, রাজস্ব আদায় কমে যাওয়া, ডলার বাজারে অস্থিরতা ছিল অর্থনীতির জন্য অস্বস্তির।
বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে: রপ্তানি আয়ের নিম্নগতির প্রভাবে বৈদেশিক বাণিজ্যে ঘাটতি পড়েছে। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৫৬২ কোটি ডলার। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রপ্তানি খাতে বাংলাদেশ আয় করেছে ১ হাজার ২৫১ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এর বিপরীতে আমদানি বাবদ ব্যয় করেছে ১ হাজার ৮১৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার। এ হিসাবে অক্টোবর শেষে দেশে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৫৬২ কোটি ডলার। অর্থাত্ গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এবার ঘাটতি বেড়েছে ২৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
রপ্তানি ও আমদানি কমেছে: টানা চার মাস ধরে রপ্তানি আয় কমায় ২০১৯ সালে বড়ো ধাক্কা খেয়েছে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সূচক। অন্যদিকে আমদানিও কমেছে। চলতি বছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে জুলাই-অক্টোবর সময়ে গত বছরের একই সময়ের চেয়ে আমদানি ব্যয় ৩ দশমিক ১৭ শতাংশ কমেছে।
রাজস্ব আদায় কম: ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট, আমদানি ও রপ্তানির ঋণাত্মক অবস্থার কারণে অর্জিত হচ্ছে না শুল্ক আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যমতে, গত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৬৫ হাজার ৯৬ কোটি টাকা। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০ হাজার কোটি টাকা কম। তবে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় সাড়ে ৪ শতাংশ বেশি।
শিল্প খাতের উত্পাদন কমছে: শিল্প মালিকরা ব্যাংকের সুদ ও নিয়মিত খরচ মেটানোর পর কারখানা চালাতে হিমশিম খেয়েছেন। নতুন কারখানা করা বা কারখানা কার্যক্রম বাড়ানোর জন্য শিল্প উদ্যোক্তারা ব্যাংক থেকে ঋণ পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে, অক্টোবর মাসে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল। আর বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) দেশের উত্পাদনশীল খাত বা শিল্পখাতের উত্পাদন প্রবৃদ্ধি হয়েছে দুই দশমিক দুই শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
পাঁচ মাসেই পুরো বছরের ঋণ নিয়েছে সরকার: রাজস্ব খাত থেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে আয় না হওয়া এবং বিদেশ থেকে প্রয়োজনীয় ঋণ না পাওয়ায় ব্যাংক খাত থেকে সরকারকে ঋণ নিতে হচ্ছে। ঋণের টাকায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনও দিতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ে সরকার ব্যাংক থেকে ধার নিয়েছে ৪৭ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা। এ সময়ে সব মিলিয়ে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেওয়া মোট ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৫৫ হাজার ২৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। সরকার ব্যাংক থেকে বেশি পরিমাণ ঋণ নেওয়ার কারণে বাজেট ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
কমছে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ: করের হার বৃদ্ধি এবং বিক্রিতে কড়াকড়ি আরোপ করায় চলতি অর্থবছর থেকে কমছে ‘নিরাপদ বিনিয়োগ’ হিসেবে পরিচিত সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ। ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) ৫ হাজার ৫১২ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে বিক্রির পরিমাণ ছিল ১৭ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা।
নানা সংস্কারেও পুঁজিবাজারে পতন থামেনি: বছরের শুরুতে পুঁজিবাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীরা খুব আশাবাদী ছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত সে আশা বাস্তব রূপ পায়নি। চলতি বছরে শেয়ারবাজার উন্নয়নে প্লেসমেন্ট শেয়ার, বুক বিল্ডিং পদ্ধতি, লেনদেনের প্রথমদিন সার্কিট ব্রেকার, বোনাস শেয়ার, উদ্যোক্তা/পরিচালকদের সর্বনিম্ন শেয়ার ধারণ, আইপিও রিভিউ টিম গঠনসহ নানা বিষয়ে সংস্কার করা হয়। তারপরও শেয়ারবাজারের পতন থামেনি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে লেনদেন বছরের শুরুতে যা ছিল তার চেয়ে এখন কমে ৩০০ কোটির আশপাশেই থাকছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানির এক-চতুর্থাংশের দাম অভিহিত মূল্যের (ফেইস ভ্যালু ১০ টাকা) নিচে নেমে এসেছে। বেশ কিছু কোম্পানির শেয়ার দর ৫ টাকা হয়ে গেছে।
