বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নানা সমস্যায় জর্জরিত। দীর্ঘদিন যাবত নজিরবিহীন চিকিৎসক ও কর্মচারীর পদ শূন্যতায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। রোগীদের ভিড় থাকলেও চিকিৎসা সেবা দেওয়ার লোক ও যন্ত্রপাতির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা। নিরুপায় হয়ে রোগীদের পার্শ্ববর্তী জেলা গোপালগঞ্জ ও খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে অসহায়, দরিদ্র-পীড়িত, অসুস্থ মানুষদের সীমাহীন দুর্ভোগের পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ও ভোগান্তির হার ক্রমেই বেড়ে চলছে।
উপজেলার প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্রের এই দুরবস্থায় সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ক্রমশ ক্ষোভ বাড়ছে। হাসপাতালের চারদিক ও ড্রেনের দিকে তাকালে মনে হবে এটি কোন হাসপাতাল নয় যেন ময়লার ভাগাড়।
মোল্লাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, মোল্লাহাটের ৭টি ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক মানুষের একমাত্র ভরসা মোল্লাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। উপজেলাটি নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির উপর নির্ভরশীল। ১৯৬৫ সালে যাত্রা শুরু করা স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি ১৯৮৬ সালে ৩১ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরে ২০১৭ সালে এটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। কিন্তু পরিধি বাড়লেও এখানে নতুন কোন জনবল নিয়োগ দেয়া ও আসবাবপত্র পাঠানো হয়নি। এতে প্রতিষ্ঠানটির আগের জনবল দিয়ে চালানোর কথা থাকলেও চিকিৎসক ও কর্মচারীর পদ শূন্যতায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে। ৩১ শয্যার জন্য ডাক্তারের ১৬টি পদেও মধ্যে রয়েছেন মাত্র ২ জন। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের।
আরও পড়ুন: হাসপাতাল থেকে রিলিজ, গ্রেফতারের আশঙ্কায় ভিপি নুর
তাছাড়া হাসপাতালের ভিতরে বিভিন্ন স্থান যেন এক একটি ডাস্টবিনে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসকদের বসবাসের জন্য নির্মিত আবাসস্থল অনেকগুলোই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ডাক্তার এবং নার্স ছাড়াও দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির পদগুলোতেও রয়েছে নজিরবিহীন শূন্যতা।
নবনির্মিত ১৯ শয্যার ভবনে রয়েছে অপারেশন থিয়েটার, আধুনিক কেবিন ও বিশেষজ্ঞের চেম্বার। কিন্তু ভবনটির বিপরীতে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি কোন আসবাবপত্র ও জনবল। ফলে দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় ভবনটি নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
শিশু জয়ন্তিকে (০৪) নিয়ে তার চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন মা শেফালী রানী সাহা। তিনি বলেন, ‘এখানে কোন শিশু চিকিৎসক নেই। ফলে বাচ্চাকে নিয়ে তিনি চিন্তায় পড়েছে। তাকে পার্শ্ববর্তী গোপালগঞ্জে যেতে হবে বাচ্চার চিকিৎসার জন্য। যা একদিকে ব্যয়বহুল, অন্যদিকে নিয়ে যেতে অনেক সময়ও প্রয়োজন।
চিকিৎসা নিতে আসা মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির ভেতরে আসলে মনে হবে এটা কোন হাসপাতাল নয়। চারিদিকে শুধু ময়লা আর আবর্জনা। যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কোন লোক নেই। তাছাড়া এখানে কোন পরীক্ষা-নিরীক্ষারও ব্যবস্থা নেই। ফলে বাইরে থেকে পরীক্ষা করাতে হয়। যা মান সম্মত নয়।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে আরও জানা গেছে, এখানে ৩টি এক্সরে মেশিনের অপারেটর না থাকায় ৯ বছর ধরে নষ্ট রয়েছে। আর টেকনিশিয়ান না থাকায় বন্ধ রয়েছে প্যাথলজি বিভাগ।
চিকিৎসক ও কর্মচারী সংকটের কথা স্বীকার করে মোল্লাহাট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, ‘চিকিৎসক ও কর্মচারীর সংকটেই মূলত স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ৫০ শয্যার বিপরীতে এখনও জনবল নিয়োগ হয়নি। ৩১ শয্যার জনবলেও রয়েছে ব্যাপক সংকট। আর চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর অভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করাও সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মোল্লাহাটবাসীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে দ্রুত চিকিৎসক ও কর্মচারী সংকট সমাধান করার দাবী স্থানীয়দের।
ইত্তেফাক/এএএম
