সব মায়ের কাছেই তার সন্তান যক্ষের ধনস্বরূপ। দেশ-কালভেদে সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসার ধরন বদলে যায় না। একমাত্র মা’ই তার সন্তানের অদল-বদল ধরতে পারে খাঁটি জহুরির মতো। তাড়ুয়া নাট্যদলের প্রথম প্রযোজনা ‘লেট মি আউট’ তেমন এক সন্তানহারানো মায়ের গল্প। যে মা যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে নিখোঁজ সন্তানকে খুঁজে দেওয়ার আবেদন জানায়। কিন্তু নিজেদের অপারগতা ঢাকতে তারা মায়ের হতে তুলে দেয় অন্য আরেকজনের ছেলেকে। ‘লেট মি আউট’ নাটকের গল্পটি ঠিক এমনই। ১৯২৮ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের স্পেশাল পুলিশ ফোর্স গান স্কোয়াডের বিরুদ্ধে একজন মা ক্রিস্টিন কলিন্স অভিযোগ আনেন। তার একমাত্র ছেলে ওয়াল্টার কলিন্সকে ফিরে পেতে যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দারস্থ হন কিন্তু শেষপর্যন্ত তাকে রোগী হয়ে মানসিক হাসপাতালে যেতে হয়। আসলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য বোঝেন না মায়ের কাছে সব সন্তান অনেক কিছু হলেও নিজের সন্তান সবকিছু। সেই সবকিছু পাওয়ার আশায় মা দিনের পর দিন তাদের কাছে যায়। তারা তাকে নানাভাবে হেনস্থা করে; প্রমাণ করার চেষ্টা করে, ক্রিস্টিন কলিন্স একজন মানসিক রোগী। মাকে মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হলে, সেখানে তার দেখা হয় বার-ড্যান্সার এক নারীর সঙ্গে। তার কাছেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসত্ সদস্যদের চরিত্রের স্বরূপ পাওয়া যায়। সে বর্ণনা করে, কীভাবে তাকে বিনা অপরাধে পাগল সাজিয়েছে তারা। অবশেষে চার্চের ফাদারের সাহায্যে কোর্টে বিচারের মুখোমুখি করা যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাকে। কিন্তু সিস্টেম তো বদলে না, বদলে যেতে থাকে কোর্টে মামলার তারিখ। তারিখের পর তারিখ যায়, দিন যায়, মাস যায়, বছরের পর বছর চলে যায়। ক্রিস্টিন কলিন্স বৃদ্ধ হয়, মানসিক রোগীতে পরিণত হয়, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত তারিখ আসে না; যে তারিখে একজন মা তার সন্তানকে নিজের কোলে ফিরে পাবে। নাটকটি দেখতে দেখতে মাঝেমধ্যে দেশের কথা মনে জেগেছে। মনে হলো ক্রিস্টিন কলিন্স দেশের কোনো এক জেলা শহরের মা, যে তার সন্তানের খোঁজে লড়াইয়ে নেমেছেন, যাকে বছরের পর বছর সঠিক বিচারের আশায় আদালতে চক্কর দিতে হচ্ছে।
নাটকের বিভিন্ন চরিত্র নান্দনিকভাবে ফুটিয়ে তোলতে অভিনেতাদের যে দীর্ঘ মানসিক পরিশ্রম গেছে, সেটা বোঝা যায় অফিসার চরিত্রে সোহেল রানা ও শফিকুল ইসলামের অভিনয়ে। অসাধারণ হূদয়গ্রাহী অভিনয় করেছেন তারা। বিশেষ করে শফিকের মোনোলগ তো অভূতপূর্ব। কিন্তু ক্রিস্টিন কলিন্সের চরিত্রে রুনা কাঞ্চনের অভিনয় হূদয়কে যেন ছোঁয় না। সন্তান হারানোর পরে একজন মায়ের আর্তনাদ বা অন্তরের হাহাকার যেভাবে অন্যের হূদয়কে নাড়িয়ে তোলে, সেখানে কোথায় যেন একটুখানি ঘাটতি মনে হলো। সন্তান হারানোর ব্যথা বোধহয় আরেকটু বেশি। হয়তো নাটকজুড়ে তার একই স্বরে অভিনয়ও এর কারণ হতে পারে। অন্যদের মধ্যে বিশেষ করে ভালো বলতে হয় নুরুল আবসার পলাশের অভিনয়ের কথা। বেশ ভালো করেছেন তিনি। সব মিলিয়ে টিমওয়ার্কটা দারুণ!
‘লেট মি আউট’ নাটকের সবচেয়ে যে দিকটি বিশেষভাবে আকর্ষক, তা হলো নাট্য নির্দেশনায় নির্দেশক বাকার বকুলের দক্ষতার স্বাক্ষর। কোথাও যেন এতটুকু বেশি নেই। শুধু শেষের দৃশ্যে ক্রিস্টিন কলিন্স যখন বৃদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন তাকে উইগ না পড়ালেই বোধহয় ভালো করতেন। ওইটুকুকে একটু ছেলেমানুষি মনে হয়েছে। আর নাটকের সেট, লাইট ও মিউজিকের ব্যবহার দারুণ লেগেছে। বিশেষত সেটের নানাবিধ ব্যবহার খুবই মঞ্চোপযোগী হয়েছে। সেই সঙ্গে মিউজিক—সত্যি অসাধারণ! সব মিলিয়ে বলতে হয়, দর্শককে ভাবিয়ে তোলা সমসাময়িক গল্পের এক অভূতপূর্ব ক্ষমতা। সেদিক থেকে নাটকটির নাট্যকার রুনা কাঞ্চন সঠিক সময়ে সঠিক গল্পটিই বেছে নিয়েছেন বলেই মনে হয়। ‘লেট মি আউট’ নাট্যকার রুনা কাঞ্চনের প্রথম নাটক হলেও তাতে নবিশ ছাপ নেই—না সংলাপে; না গল্প বুননে। অভিনন্দন নাট্যকার ও তাড়ুয়া নাট্যদলকে তাদের প্রথম চমত্কার নাটক ‘লেট মি আউট’-এর জন্য।
