মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকা জরুরি

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২০, ২১:২৪

বাংলাদেশে মাদক ব্যবসার অনেক গডফাদার চিহ্নিত করতে পারলেও তাদের সঙ্গে মাদক না থাকায় তাদের গ্রেফতার করতে পারা যাচ্ছে না। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হলেও তারা কিছুদিন পর বের হয়ে আসে। কোনোভাবেই ধরে রাখা যায় না। সরকার মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিচ্ছে। মজার কথা হচ্ছে এর সঙ্গে যারা গ্রেফতার হচ্ছে এরা মূলত ক্যারিয়ার। নেপথ্যেও গডফাদাররা বরাবরই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর রাজধানীসহ দেশ জুড়ে শুরু হয়েছে মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযান। তবে প্রধানমন্ত্রীর এই জিরো টলারেন্সের এই ঘোষণাকে সরকারের সকল মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-এমপিরাও একবাক্যে নিজ নিজ এলাকায় মাদক নিষিদ্ধ না করতে পারলে কার্যত কিছুই হবে না।

এতদিন মানুষ জানত মিয়ানমার থেকে চোরাই পথে দেশে ইয়াবা আসে, তবে আশ্চর্য হওয়ার বিষয় হলো, খোদ রাজধানীর আশপাশের এলাকায় তৈরি হচ্ছে মরণনেশা ইয়াবা। আর অভিজ্ঞ দ্বারাই তৈরি হচ্ছে এসব। যারা তৈরি করছে তারাও জানে না এর ভয়াবহতা। এসব ইয়াবা সেবন করে মৃত্যুর ঝুঁকি আরো বাড়ছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গত জানুয়ারি ২০১৯ থেকেই মাদকবিরোধী অভিযান চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন, যা ইতোমধ্যে কার্যকর রয়েছে। তিনি সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকায় মাদকের ব্যাপারে সচেতন থাকার নির্দেশ দেন। কিন্তু সংসদ সদস্যরা প্রতিটি এলাকায় সেভাবে নির্দেশনা এখন দিচ্ছেন না কেন? এটাই এখন বড়ো প্রশ্ন!

ইয়াবা সম্পর্কে আমাদের তরুণ-তরুণীদের মধ্যে একটি ভ্রান্ত ধারণা মাদক ব্যবসায়ীরা স্থাপন করেছে, তা হলো এটি গ্রহণ করলে শরীরে অনেক বল আসে, রাত জেগে পড়া যায়, দীর্ঘ সময় ড্যান্স করা যায়, যৌনশক্তি বাড়ে কিংবা দুর্বলতা কমে যায়, কিন্তু আসলে তা সবই মিথ্যা বরং নিয়মিত ইয়াবা সেবনে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা কমে যায় এবং ধীরে ধীরে দেহ নিস্তেজ হয়ে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়, যা বোঝা যায় অনেক দেরিতে। তখন হয়তো আর জীবন রক্ষা করার উপায় থাকে না। ইয়াবাসেবীদের কাছে প্রিয় ‘বাবা’, নেশার জগতে এখন বাজারে ‘ইয়াবা’। তরুণ-তরুণীদের ভাষায় দ্য কুইন। কারণ হচ্ছে, হেরোইন সাধারণত ছেলেরা সেবন করে, মেয়েদের মধ্যে হেরোইনসেবীর সংখ্যা তেমন নেই কিন্তু ইয়াবার নেশায় মেয়েরা মোটেও পিছিয়ে নেই। ইয়াবা দিয়ে নেশার জগতে প্রবেশের পর ইয়াবা আসক্তরা এখন অন্যান্য নেশাতেও জড়িয়ে পড়েছে। ইয়াবার অপর নাম Crazy Medicine বা উত্তেজক ওষুধ। রাসায়নিক চরিত্র, শক্তি, কার্যকারিতা ও প্রতিক্রিয়া বিচারে অ্যামফিটামিন, মেথামফিটামিন কিংবা কোকেনের চেয়েও ইয়াবা শক্তিশালী উচ্চমাত্রার উত্তেজক মাদকদ্রব্য। দীর্ঘদিন ব্যবহারে hallucination তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে ফুসফুস, লিভার এবং কিডনি নষ্ট হয়। এ নেশায় আসক্ত ব্যক্তি ব্যবহূত মাত্রায় প্রয়োজনীয় ফলোদয় না হলেও চরম অবসাদ, হতাশা, বিষাদ ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। ব্যবহারকারী তখন যে কোনো রকম অপ্রত্যাশিত আচরণ করতে পারে, এ অবস্থায় মানুষ খুন করাও বিচিত্র কিছু নয়। এমনকি হতাশা থেকে মাদকাসক্তকে আত্মহত্যার দিকেও নিয়ে যেতে পারে। অতএব, পিতা-মাতাকে এখনই সাবধান হতে হবে, যেন সন্তানের প্রতিটি কাজকর্ম ও গতিবিধি সর্বক্ষণ নজরে রাখতে পারেন। কারণ, এটি গ্রহণ করলে যুবসমাজ তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ হারিয়ে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে অগ্রসর হবে, যা থেকে তাদেরকে ফেরানো কঠিন হয়ে যাবে।

মাদকাসক্তি! যাকে বলা হয় সকল সন্ত্রাস ও অপরাধের জনক। একজন মানুষ যখন অন্ধকারের ভুবনে পা বাড়ায় তখন সে প্রথম সিঁড়ির যে ধাপটিতে পা রাখে তা মাদকদ্রব্য। এই মাদকদ্রব্য তাকে টেনে নেয়, উত্সাহিত করে পরবর্তী ধাপগুলো পেরিয়ে যেতে। ভৌগোলিক অবস্থানের ভিত্তিতে বাংলাদেশের মাদক ব্যবসা ও প্রাপ্তির সহজলভ্যতা বেশি এবং বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান প্রেক্ষিতে তরুণ সমাজ এদিকে ঝুঁকেছেও বেশি—ঠিক যেমনটি প্রত্যাশা মাদক ব্যবসায়ীদের। বাংলাদেশে ব্যবহূত মাদকের ৯৫ শতাংশ বেশি আসে বিদেশ থেকে। তথ্যানুযায়ী, ২০০ গডফাদারের তত্ত্বাবধানে ১ লাখ ৬৫ হাজার পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতার সমন্বয়ে দেশব্যাপী মাদক-বাণিজ্যের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এ চক্রের সদস্যরা ঘাটে ঘাটে টাকা বিলিয়ে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়। মাঝেমধ্যে কোথার কোথাও কোথাও মাদকবিরোধী অভিযান চালালেও তা মাদক নেটওয়ার্কে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে না। এসব অভিযানের বেশির ভাগ আইওয়াশ, এমন অভিযোগ প্রবল। সবচেয়ে ভয়ংকর তথ্য হলো, পুলিশের পাঁচ শতাধিক সদস্য এবং বিভিন্ন পর্যায়ে সহস্রাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত। যে কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা অপ্রতিরোধ্যে হয়ে উঠেছে। প্রতিদিনই বাড়ছে মাদকের থাবা। বিশেষজ্ঞরা ২০২০ সালের মধ্যে দেশে ১ কোটি লোক নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। মাদকের আগ্রাসন ঠেকাতে না পারলে মাত্র দু-তিন বছরের মধ্যে প্রতি বছর শুধু নেশার পেছনেই খরচ হবে ৬০ হাজার কোটি টাকা। একজন মাদকাসক্ত ছেলে বা মেয়ে গোটা পরিবারের জন্য অশান্তির কারণ হয়। যার জন্য মাদকাসক্তি রোগটিকে বলা হয় ‘ফ্যামিলি ডিজিজ’। কারণ মাদকাসক্ত একজনের জন্য পরিবারের সকল সদস্য আক্রান্ত হন। প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন, বিশেষত পিতামাতাকে।

যেহেতু মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জিরো টলারেন্স দেখানোর কথা বলেছেন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও এক্ষেত্রে মাদক দমনে সচেষ্ট। অথচ, সমাজের একশ্রেণির অর্থলিপ্সু মানুষ কোমলমতি শিশু কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের বিভ্রান্ত করে তাদের হাতে মাদকদ্রব্য তুলে দিচ্ছে। তরুণদের মেধা, প্রতিভা ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে তাদেরকে ক্লান্তি, হতাশা ও নেশার জগতে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহ থাবা থেকে রক্ষা করতে মাদকের অবাধ বিস্তার এখনই রুখে দিতে হবে। নইলে আমাদের জাতির সামনে ঘোর দুর্দিন অপেক্ষা করছে। সুতরাং জিরো টলারেন্সের কথা শুধু মুখে নয় কার্যত প্রমাণ করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের সহযোগিতা। বাংলাদেশে বর্তমানে মাদকের যে ভয়াবহতা, বিশেষত ইয়াবার আগ্রাসন, তাতে আমাদের আরো কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত জরুরি, বিশেষত মাদক ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করা, যাতে প্রতীয়মান হয় যে সরকার এ ব্যাপারে সত্যিই জিরো টলারেন্স দেখাচ্ছে।

n লেখক :শব্দসৈনিক, একুশে পদকপ্রাপ্ত

প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, মানস (মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা)