কলাপাতা ও লাল জবাফুল

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১৮, ১৭:৫১

নয়ন দৌড়াতে দৌড়াতে এল।

গ্রামে ঢোকার মুখে বিশাল কাঠের ব্রিজ। সেই ব্রিজের সামনে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে লোকজন। ডিসেম্বর মাসের শুরুর দিককার ভোরবেলা। কুয়াশায় ঢাকা পড়ে আছে মাঠঘাট, মানুষের ঘরবাড়ি। খালের পানিতে ভাসছে কুয়াশা।

ভিড় ঠেলে মুক্তিযোদ্ধাদের সামনে গেল নয়ন। কমান্ডারের কাঁধে স্টেনগান, কোমরে গুলির বেল্ট। অন্যদের হাতে থ্রি নট থ্রি রাইফেল। গুলির বেল্ট তো আছেই। কারও কারও সঙ্গে গ্রেনেড। মোট একুশজন মুক্তিযোদ্ধা।

কমান্ডারের নাম নাসির। ভিড় ঠেলে নয়নকে আসতে দেখে তিনি তার দিকে তাকালেন। নয়ন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, কমান্ডার সাহেব, আমার বড়ভাইও মুক্তিযোদ্ধা। তার নাম বাদল। বাদল মির্জা।

নাসির কমান্ডারের মুখটা উজ্জ্বল হলো। তা-ই নাকি? বাদলকে তো আমি চিনি। মেলাঘরে একসঙ্গে ট্রেনিং নিয়েছি। তুমি বাদলের ছোট ভাই?

জি। আমরা তিন ভাইবোন। বাদলদা সবার বড়। তারপর বোন তারপর আমি।

ইসমাইল লোকটা মাতব্বর গোছের। আগবাড়িয়ে কথা বলার অভ্যাস আছে। লুঙ্গির ওপর ছেঁড়া কালো কোট পরা। বলল, ভবেরচরের মুক্তিযোদ্ধাগো বাড়িঘর তছনছ করছে রাজাকাররা। নয়নরা তো বাড়িতে থাকতেই পারে নাই। বাড়ি দখল করছিল এক রাজাকারে। মির্জা সাহেব চইলা গেছিলেন দিঘিরপাড়ের ওই দিককার এক গ্রামে। কয়দিন আগে ভবেরচরের রাজাকার আলবদররা সব পলাইছে। মুসলিম লীগের লোক আছিল চেয়ারম্যান সাবে, সেও পলাইছে। তারপর মির্জা সাবে নয়নগো লইয়া গেরামে ফিরছে। ভবেরচর অহন স্বাধীন।

তবে বিপদ আপনাদের কাটেনি। কাল বিকালে খবর পেয়েছি আজ এদিকে মিলিটারি আসতে পারে। ওরা বুঝে গেছে দেশ স্বাধীন হতে আর সময় লাগবে না। এজন্য মরণ কামড় দিতাছে।

মিলিটারি আসতে পারে শুনে লোকজন আতঙ্কিত হলো। ভয়ার্ত চোখে এ ওর দিকে তাকাতে লাগল।

জয়নাল বলল, হায় হায়, মেলেটারি আইলে তো সব্বনাশ! গেরামের লোকজন বেবাক মাইরা ফালাইব। বাড়িঘর জ্বালাইয়া দিব। তয় আমরা যাই কমান্ডার সাব। বউ পোলাপান, মা বাপ ভাই বইন লইয়া পলাই।

না না পালানোর দরকার নেই। মিলিটারি যাতে গ্রামে ঢুকতে না পারে সেই ব্যবস্থা করুন। ওরা যে এদিকে আসবেই আমি তা বলিনি। বলেছি আসতে পারে। আসার সম্ভাবনা বেশি আলিপুর আর মধ্যবাউসিয়ার দিকে। এজন্য ওদিককার ব্রিজ দুটো উড়িয়ে দিয়েছি। এখন আমরা ওইদিকে চলে যাচ্ছি। মিলিটারি এলেই অ্যাটাক করব। একটাকেও বাঁচতে দেবো না।

হাফেজ মিয়া বলল, তয় আমরা অহন কী করুম?

ব্রিজটা ভেঙে ফেলুন। মেইন রোড থেকে গ্রামে ঢোকার এই একটাই পথ। এটা ভেঙে ফেললেই কাজ হয়ে যাবে। তার পরও সাবধানে থাকবেন সবাই।

নাসির কমান্ডার নয়নের দিকে তাকালেন। তোমরাও বসে থাকবে না। তোমাদের বয়সী ছেলেরাও অনেকে মুক্তিযোদ্ধা। ব্রিজ ভাঙার কাজে লাগো।

নয়ন গভীর উত্সাহের গলায় বলল, ঠিক আছে দাদা।

নয়নের মুখে ‘দাদা’ শব্দটা শুনে নাসির কমান্ডার একটু আবেগ-আপ্লুত হলেন। নয়নের কাঁধে হাত রেখে বললেন, আমার ভাইবোনরাও আমাকে দাদা ডাকে। অনেকদিন তাদের সঙ্গে দেখা হয় না। দেশ স্বাধীন করে বাড়ি ফিরব। জয় বাংলা।

নয়ন আকাশের দিকে হাত তুলে চিত্কার করে বলল, জয় বাংলা।

মুক্তিযোদ্ধারা চলে যাওয়ার পর ইসমাইল বলল, এহেনেঐ খাড়াইয়া থাকবেননি মিয়ারা? লন পোল ভাঙনের কামে লাইগা যাই। কুড়াল শাবল যার বাড়িতে যা আছে লইয়াহেন। বেবাকতে হাত লাগাইলে দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই পোল ভাইঙ্গা ফালান যাইব।

হাবিব নামের একজন বলল, আরে না মিয়া, এক-দেড় ঘণ্টার বেশি লাগব না।

মনির হোসেন বলল, প্যাঁচাইল না পাইরা কামে লাগো মিয়ারা।

নয়ন বলল, আমাদের বাড়িতে কুড়াল আছে। আমি নিয়া আসতেছি।

বাড়ির দিকে দৌড় দিলো নয়ন। নয়নের সঙ্গে দৌড় দিলো মোস্তফা। এই প্রথম মোস্তফাকে দেখতে পেল নয়ন। দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, তুমি আসছো কখন?

তোমারে দৌড় দিতে দেইখা আমিও দৌড় দিছিলাম মিয়াভাই। গেরামে মুক্তিবাহিনী আইছে, দেখুম না তাগো?

তাহলে আমার আর বাড়ি যাওয়ার দরকার কী? তুমিই কুড়ালটা নিয়া আসো।

না না তুমিও লও। নাইলে মির্জা সাবে আর আম্মায় আমারে আইতে দিব না। মির্জা সাবের জ্বর। বাড়িতে কামকাইজ আছে। আমি না আইতে পারলে তুমি কুড়ালডা লইয়া আইবা।

মোস্তফার বয়স এখন তেইশ-চব্বিশ বছর। রোগা পটকা শরীর। ছোটবেলা থেকে মির্জাবাড়িতে কাজ করে। এতিম ছেলে। কাছের আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। মির্জাবাড়িই তার বাড়ি, নয়নরাই তার সব। মির্জা সাহেব বিয়ে ঠিক করেছিলেন মোস্তফার। গজারিয়ার মেয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেল দেখে বিয়ে আটকে আছে। দেশ স্বাধীন হলে বিয়ে হবে। বউ নিয়ে মির্জাবাড়িতেই থাকবে সে। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই বাড়ির কাজ করবে।

মির্জাবাড়ির রান্নাঘরে এখন নাশতা তৈরি করছেন আমেনা বেগম। পুরনো শাল গায়ে জড়িয়ে বারান্দার চেয়ারে বসে আছেন মির্জা সাহেব। খুক খুক করে কাশছেন। দিন সাতেক আগে বাড়ি ফিরেছে নয়নরা। বদু রাজাকার বাড়ি দখল করেছিল। দামি জিনিসপত্র সবই সরিয়ে ফেলেছে। বাড়িতে বলতে গেলে নেই কিছুই। বারান্দার চেয়ারটা রয়ে গিয়েছিল। মোস্তফার নড়বড়ে চৌকিটা রয়ে গিয়েছিল। এই শীতে মেঝেতে ঘুমাতে হচ্ছে নয়নদের। হাঁড়ি-পাতিল কিছু জোগাড় করেছেন আমেনা বেগম। থালাবাসন জোগাড় করেছেন। সংসার চলছে কোনোরকমে।

বাড়ি ঢুকে লাকড়ি খড়ি রাখার ঘরটায় ঢুকল নয়ন। পুরনো কুড়ালটা পড়ে আছে একপাশে। সেটা নিয়ে দৌড় দেবে, মির্জা সাহেব বললেন, কুড়াল নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস?

ব্রিজ ভাঙতে যাচ্ছি বাবা। গ্রামে মিলিটারি আসবে।

বুদ্ধি করে মোস্তফাকেও সঙ্গে নিল নয়ন। মোস্তফা ভাই, তুমিও চলো। ব্রিজ ভেঙে ফেললে গ্রামে মিলিটারি ঢুকতে পারবে না।

আমেনা বেগম বেরিয়ে এলেন রান্নাঘর থেকে। মিলিটারি আসার খবরে ভয় পেয়েছেন। দিশাহারা গলায় বললেন, সর্বনাশ! তোর বাবার জ্বর। মিলিটারি এলে পালাবো কোথায়?

যাতে আসতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতেই যাচ্ছি মা। মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজ ভাঙতে বলে গেছেন।

তোর যাওয়ার দরকার নাই। ও নয়ন, তোর যেতে হবে না বাবা। মোস্তফা যাক। তুই বাড়িতেই থাক। আমার ভয় করছে।

না না। কমান্ডার সাহেব বলেছেন। যেতেই হবে।

মির্জা সাহেব কী বলতে গেলেন! কাশির তোড়ে বলতে পারলেন না। নয়ন কুড়াল হাতে দৌড় দিলো। মোস্তফা ছুটল তার পিছন পিছন।

ব্রিজ ভাঙা ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে। ভারী কাঠের শক্ত ব্রিজ। অনেকদিনের পুরনো। তবে এখনো শক্তপোক্ত। ভাঙা কঠিন।

 

বুদ্ধি করে মোস্তফাকেও সঙ্গে নিল নয়ন। মোস্তফা ভাই, তুমিও চলো। ব্রিজ ভেঙে ফেললে গ্রামে মিলিটারি ঢুকতে পারবে না। আমেনা বেগম বেরিয়ে এলেন রান্নাঘর থেকে। মিলিটারি আসার খবরে ভয় পেয়েছেন। দিশাহারা গলায় বললেন, সর্বনাশ! তোর বাবার জ্বর। মিলিটারি এলে পালাবো কোথায়? যাতে আসতে না পারে সেই ব্যবস্থা করতেই যাচ্ছি মা। মুক্তিযোদ্ধারা ব্রিজ ভাঙতে বলে গেছেন

 

আয়েশাকে একাত্তর সালের সেই দিনটির কথা বললেন আমেনা বেগম। ... কবরস্থানে আশ্রয় নেওয়া নয়নদের দশজনকে গুলি করেনি জন্তুরা। চারদিক দিয়ে বেয়নেট চার্জ করেছিল। এলাকার সব মানুষ পালিয়েছিল। দশটি কিশোরের মরণ চিত্কার আর আর্তনাদ কেউ শুনতে পায়নি। কবরস্থানের মাটি তাদের রক্তে ভিজে গিয়েছিল। জন্তুরা চলে যাওয়ার পর একজন দুজন করে ফিরেছিল গ্রামের লোক। যার যার ছেলে নিখোঁজ ছিল তারা বেরিয়েছিল ছেলে খুঁজতে

 

 

 

লোকজন শাবল কুড়াল নিয়ে সমানে কোপাকুপি করছে। নয়নের বয়সী জনাদশেক কিশোরও জড়ো হয়েছে। তারাও কাজ করছে। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে দেখছে। তাদের সবাইকেই নয়ন চিনল। এক স্কুলেরই ছাত্র সবাই। নয়নের ক্লাসমেটই আছে চার জন। ক্লাস ফাইভে পড়ে।

নয়নকে কুড়াল হাতে দেখে তাদের ক্লাসের আউয়াল এগিয়ে এল। দে নয়ন, আমাকে দে। আমি কিছুক্ষণ কোপাই। আমি টায়ার্ড হলে তুই কোপাবি। দৌড়ে এসেছিস। একটু জিরিয়ে নে।

নয়নের হাত থেকে কুড়াল নিয়ে ব্রিজে চড়ল আউয়াল।

এইভাবে কুড়ালটা ঘুরতে লাগল। নয়নের হাত থেকে গেল শাহাদাতের কাছে, শাহাদাতের হাত থেকে রবিউলের হাতে। প্রত্যেকেই শরীরের সব শক্তি দিয়ে ব্রিজ ভাঙার কাজ করছে। তবে কাজ বেশিদূর আগাচ্ছে না। পুরনো ব্রিজ ঠিকই, কিন্তু কাঠ এত শক্ত, লোহারপাত গজাল এগুলো এত কঠিনভাবে লাগানো হয়েছে, এই শীতেও ঘাম বেরিয়ে যাচ্ছে লোকজনের।

আমিনুদ্দিন নামের মুসল্লি ধরনের মানুষটি শাবল চালাতে চালাতে বললেন, শুনছি মেলেটারিরা বলে মোসলমান। মোসলমান হইয়া মানুষ মারে? মোসলমান মারে? ওরা তো মোসলমান না। ওরা হইল শয়তান, শয়তান। ইবলিশ শয়তান।

আনসার আলী কুড়াল চালিয়ে ক্লান্ত। দাঁড়িয়ে জোরে জোরে ক্লান্তির শ্বাস ফেলছে। সেই অবস্থায় বলল, বাড়িতে বউ-পোলাপানরে বইলা আইছি আমি পোল ভাঙতে গেলাম। মেলেটারি আইলেই দৌড়াদৌড়ি চিল্লাচিল্লি শুরু হইব। ওই রকম আওজ পাইলে এক মিনিটও দেরি করবা না। দক্ষিণ দিকে দৌড় দিবা। যে যেইভাবে পারো পলাইবা।

মফিজউদ্দিন বলল, আমিও কইয়াছি। বেবাকতেই ডরাইতাছে। মে মাসের কথা কইলো পোলাপানের মায়। তিনশো ষাইটজন মানুষ মারছিল আমগো এলাকায়। এক সকালে এতডি মানুষের জান নিল শুয়োরের বাচ্চারা। আইজ আইলে না জানি কী করে?

সোলায়মান মাস্টার বললেন, আসতে যাতে না পারে সেই জন্যই তো পোল ভাঙতে কইয়া গেল নাসির কমান্ডারে। কাম করেন মিয়ারা। তাড়াতাড়ি হাত চালান।

হোসেন বেপারি কুড়ালের বিরাট একটা কোপ বসালো চওড়া কাঠের ওপর। সেই অবস্থায় বলল, চেষ্টা তো চলতাছে মাস্টার সাব। কেউ তো বইসা নাই। তারপরও দেখেন, কাম আগাইতাছে না।

ইউনুস মিয়া বলল, কামডা আউলা ঝাউলা হইতাছে। যে যেই দিক দিয়া পারে কুড়াল শাবল মারতাছে। এইভাবে হইব না। এক দিক দিয়া ভাঙতে হইব। ও মিয়ারা, একদিক দিয়া ভাঙ্গেন।

নয়ন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছে। কুয়াশা আগের মতোই। বেশিদূর চোখ চলে না। রোদ কখন উঠবে কে জানে! ব্রিজ ভাঙার কাজ কখন শেষ হবে কে জানে! আলিপুরের দিকে, মধ্যবাউসিয়ার দিকে মিলিটারি এসে পড়ল কি-না কে জানে!

না আসেনি। এলে গুলির শব্দ পাওয়া যেত। নাসির কমান্ডার বলে গেছেন তাঁরা ওই দিকে পজিশন নিয়ে থাকবেন। মিলিটারি এলেই অ্যাটাক। এলে এতক্ষণে গোলাগুলি শুরু হয়ে যেত। শব্দ পাওয়া যেত।

কিন্তু ব্রিজ ভাঙার কাজ আগাচ্ছে না কেন? আর কতক্ষণ লাগবে? শয়তানগুলো যদি আলিপুর মধ্যবাউসিয়ার দিকে না গিয়ে এদিকে চলে আসে?

হলোও তা-ই।

দূরের রাস্তার দিকে গাঢ় সাদা কুয়াশার ভিতর দেখা গেল গাড়ির হেডলাইট জ্বলছে। কুয়াশা ভেঙে এগিয়ে আসছে কয়েকটা গাড়ি। এখনো দূরে আছে বলে শব্দ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত এদিকে আসছে গাড়িগুলো।

এই দৃশ্য প্রথমে দেখল রামমোহন। সে কুড়াল চালিয়ে ক্লান্ত। জিরাবার জন্য দাঁড়িয়েছে। তখন দেখে সার ধরে গাড়ি আসছে এই দিকে। কুয়াশায় রাস্তাঘাট দেখা যায় না বলে দিনেরবেলাই জ্বলছে গাড়ির হেডলাইট।

ব্রিজ আধাআধি ভাঙা হয়েছে তবে হয়েছে এলোমেলোভাবে। গাড়ি চলতে পারবে না কিন্তু মিলিটারিরা লাফিয়ে লাফিয়ে পার হয়ে আসতে পারবে।

রামমোহন তারপর চিত্কারটা দিলো। মেলেটারি আইতাছে, মেলেটারি আইতাছে। ওই যে আইয়া পড়ছে। পোল ভাঙতাছে দেখলেই গুল্লি শুরু করব।

মুহূর্তে সাড়া পড়ে গেল লোকজনের মধ্যে। দিশাহারা ভঙ্গিতে রাস্তার দিকে তাকাল তারা। কুড়াল শাবল হাতেই দৌড় দিলো কেউ, কেউ দৌড়াল ওসব ফেলেই। কেউ কারও দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। ‘মেলেটারি আইতাছে, মেলেটারি আইতাছে’ বলে চিত্কার আর দৌড়। বিরাট হুড়াহুড়ি পড়ে গেল।

নয়ন আউয়ালরা প্রথমে বুঝতে পারেনি ঘটনা কী! মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই নানারকম গুজব রটছে চারদিকে। মিলিটারি আসছে, ওই এসে পড়েছে, এরকম গুজব রটেছে বহুবার। মানুষজন বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়েছে। পরে দেখে কোথায় মিলিটারি? কিচ্ছু না।

এখনো কি তেমন কিছু রটল?

না। ওরা স্পষ্টই দেখতে পেল মিলিটারি ব্রিজের ওইপাড়ে প্রায় এসেই পড়েছে। লাফিয়ে লাফিয়ে গাড়ি থেকে নামছে। গাড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছে, বুটের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

কে যেন চিত্কার করে বলল, দৌড় দে নয়ন। দৌড় দে।

বড়রা প্রায় সবাই উধাও হয়ে গেছে। নয়নরা দশ কিশোর দেরি করে ফেলেছে। তারপরও প্রাণপণে দৌড় শুরু করল ওরা...

মিলিটারিরা তখন দ্রুত এবং সাবধানে আধভাঙা ব্রিজ পার হচ্ছে। হাতে রাইফেল। রাইফেলের মাথায় বেয়নেট। শিকার ধরার সময় যে রকম ক্ষিপ্র হয় চিতাবাঘ, মিলিটারিরা সে রকম ক্ষিপ্র ভঙ্গিতে ছুটে আসছে।

নয়নরা এখন কোথায় যাবে? কোন দিকে পলাবে?

ব্রিজের এপারে এসেই চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে মিলিটারিরা। চারদিক দিয়ে ঘেরাও করছে গ্রাম।

নয়নরা এখন কোথায় যাবে? কোথায় পলাবে?

ছুটতে ছুটতে ক্লান্ত হয়ে গেছে ওরা। বুক ওঠানামা করছে হাঁপড়ের মতো। তিনদিক দিয়ে মিলিটারি এগিয়ে আসছে তাদের দিকে...

সামনে বহুদিনের পুরনো কবরস্থান। গাছপালা ঝোপঝাড়ে ঘেরা। শীতে কুয়াশায় জুবুথুবু হয়ে আছে জায়গাটা। দৌড়াতে দৌড়াতে নয়ন বলল, আউয়াল, কবরস্থানে ঢোক। কবরস্থানে। কবরস্থানে ঢুকে ওরা আমাদের মারবে না।

দশ কিশোর কবরস্থানে ঢুকল। ভয়ে আতঙ্কে দিশাহারা সবাই। দৌড়াতে দৌড়াতে ক্লান্ত। কেউ কেউ হুমড়ি খেয়ে পড়ল পায়ে লতাপাতা জড়িয়ে। মতিউর হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল।

মিলিটারিরা তখন কবরস্থানের দিকে ছুটে আসছে। তাদের বুটের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

নয়ন বলল, চল আমরা একেকজন একেকটা কবর ধরে বসে থাকি। মিলিটারিরা কাছে আসার আগ থেকেই জোরে জোরে সুরা ফাতিহা পড়ব। ওরা মুসলমান আমরাও মুসলমান। ছোট ছেলেরা কবরস্থানে বসে সুরা পড়ছে দেখলে মারবে না। কিছুই বলবে না।

পাশাপাশি কবরগুলোর ধারে বসল ওরা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে একেকজনের। ভয়ে আতঙ্কে থর থর করে কাঁপছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে কেউ কেউ। সেই কান্না গোঙানির মতো শোনাচ্ছে।

মিলিটারিরা ঢুকে গেল কবরস্থানে।

নয়নরা জোরে জোরে সুরা ফাতিহা পড়তে লাগল। ‘আল্হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন। আর রাহ্মানির রাহিম...’

কারও গলা দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছে কান্নার মতো করে, কারও গলা ফ্যাসফেসে। শব্দ বোঝা যায় না।

চারজন-পাঁচজন করে মিলিটারি রাইফেল বুকের কাছে ধরে একেক কবরের দিকে এগোতে লাগল। গুলি করছে না। চারদিক থেকে বেয়নেট চার্জ করার জন্য ধীরপায়ে এগোচ্ছে। মুখে কোনো শব্দ নেই। নয়নরা চোখ বুজে উচ্চ স্বরে সুরা ফাতিহা পড়ে যাচ্ছে। ‘আল্হামদু লিল্লাহি রাব্বিল আ’লামিন। আর রাহ্মানির রাহিম...’

 

সাতচল্লিশ বছর পর

স্লামালেকুম আন্টি।

ওয়ালাইকুম আসসালাম।

আমি আপনাদের দোতলার ফ্ল্যাটের ভাড়াটে। কালই ফ্ল্যাটে উঠেছি। আপনার সঙ্গে দেখা করতে পারিনি। এত ব্যস্ততায় গেল কালকের দিনটা। বাসা বদলানো যে কী ঝামেলার কাজ!

আমেনা বেগম চোখ তুলে ভদ্রমহিলার দিকে তাকালেন। তাঁর বয়স হয়েছে আশির কাছাকাছি। চশমা ব্যবহার করেন অনেক বছর। কয়েক মাস ধরে চোখে ঝাপসা দেখছিলেন। শুনে বাদল তার ছোটছেলে সাজিদকে পাঠাল। নাতি এসে ঢাকায় নিয়ে গেল দাদীকে। চোখের ভালো ডাক্তার দেখাল। পাওয়ার বেড়েছে। নতুন চশমা নিতে হলো। সেই চশমায় সবকিছু এখন পরিষ্কার দেখতে পান।

ভদ্রমহিলার বয়স পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ হবে। স্বাস্থ্য ভালো। গায়ের রঙ শ্যামলা। চেহারা মন্দ না। হাসিখুশি ধরনের মানুষ।

তোমার নাম কী মা?

আয়েশা।

বসো, বসো।

আয়েশা চেয়ার টেনে বসল। আমার হাজব্যান্ড এখানকার কৃষি ব্যাংকের ম্যানেজার হয়ে এসেছেন। আগে ছিলেন মানিকগঞ্জে। আমরা পাবনার লোক। একটাই ছেলে আমাদের।

আমেনা বেগম বুঝলেন আয়েশা গল্প করতে পছন্দ করে। ভালোই হলো। গল্প করার মানুষ পাওয়া গেল।

চা খাবে?

খেতে পারি। লিকার চা। দুধ চিনি ছাড়া। 

আমিও তা-ই খাই।

আমেনা বেগম রাজিয়াকে ডাকলেন। রাজিয়া, দু’কাপ চা দিতে বল। লিকার চা।

মোস্তফার ছোটমেয়ে রাজিয়া বারান্দায় পায়চারি করতে করতে পড়ছে। ভবেরচর কলেজে ইন্টারমিডিয়েট পড়ে। পড়াশোনায় খুবই আগ্রহ মেয়েটির। পরীক্ষার বাকি আছে মাস তিনেক। এ প্লাস পেতেই হবে। এজন্য রাতদিন পড়ছে।

আমেনা বেগমের কথা শুনে তাঁর দিকে তাকাল না রাজিয়া। পড়তে পড়তেই চিত্কার করে মাকে বলল, দাদীর ঘরে দুই কাপ চা দাও।

মোস্তফার বউর নাম বেদানা। সে ছিল রান্নাঘরে। সংসার সেই সামলায়। বাড়ির সব কাজ তার। বাইরের কাজ মোস্তফার। দু’দিন হলো মোস্তফা বাড়িতে নেই। বড়মেয়ের বিয়ে হয়েছে নারায়ণগঞ্জের বন্দরে। সেই মেয়ে তার জান। মাসে এক দু’বার মেয়ের কাছে গিয়ে থেকে আসে।

ট্রেতে দু’কাপ চা নিয়ে এল বেদানা। ষাটের কাছাকাছি বয়স। দেখলে মনেই হয় না এতটা বয়স হয়েছে। বেশ শক্তপোক্ত কর্মঠ মানুষ।

নাও মা, চা নাও।

আয়েশা চা নিল। আমেনা বেগমও নিলেন।

চায়ে চুমুক দিয়ে আয়েশা বলল, একটা কথা আপনাকে বলে রাখা ভালো আন্টি। যাতে আপনি পরে বিরক্ত না হন বা না ভাবেন যে কেন আপনাকে আগে বলিনি। 

কী কথা মা?

আমার ছেলেটার কথা। একটু অন্য টাইপের ছেলে। এগারো বছর বয়স। পড়ে ক্লাস ফাইভে। না না, দুষ্টুমি করে না। নিজেকে নিয়ে থাকে। ছবি আঁকে। মাটি দিয়ে এটা ওটা বানায়। ফুল পাতা দিয়ে বানায়। শহীদ মিনারের ছবি আঁকে, গ্রামের ছবি আঁকে, মুক্তিযুদ্ধের ছবি, পতাকার ছবি এসব নিয়েই থাকে।

ভালো তো! এই নিয়ে বলার কী আছে?

না মানে আপনার বাড়িতে এত গাছপালা। কখন কোনদিকে হাত দিবে সে, কোন গাছের ডালপালা ভাঙবে, ফুল ছিঁড়বে... মানে আমি আর ওর বাবা ওকে কিছু বলি না। আমাদের ধারণা ছেলেটা বড় হয়ে আর্টিস্ট হবে।

এগারো বছর বয়স বললে? ক্লাস ফাইভে পড়ে?

জি আন্টি।

নাম কী?

নয়ন।

আমেনা বেগম কেঁপে উঠলেন। নয়ন? নয়ন?

আয়েশা অবাক। জি আন্টি। ডাকনাম নয়ন। ভালো নাম...

না না অন্য কোনো নাম জানবার দরকার নেই। নয়ন, নয়ন...

আমেনা বেগম উদাস হলেন। স্মৃতিকাতর হলেন। আমার ছেলেটার নামও ছিল নয়ন। এগারো বছর বয়স। ক্লাস ফাইভে পড়তো।

তা-ই নাকি? আশ্চর্য মিল। আপনার সেই ছেলে কোথায়?

আমেনা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এই মাটিতে, ওই নদীতে, ফসলের মাঠে আর আকাশে মিশে আছে আমার নয়ন।

কথাটা বুঝতে পারল না আয়েশা। আমেনা বেগমের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

আয়েশাকে একাত্তর সালের সেই দিনটির কথা বললেন আমেনা বেগম। ... কবরস্থানে আশ্রয় নেওয়া নয়নদের দশজনকে গুলি করেনি জন্তুরা। চারদিক দিয়ে বেয়নেট চার্জ করেছিল। এলাকার সব মানুষ পালিয়েছিল। দশটি কিশোরের মরণ চিত্কার আর আর্তনাদ কেউ শুনতে পায়নি। কবরস্থানের মাটি তাদের রক্তে ভিজে গিয়েছিল। জন্তুরা চলে যাওয়ার পর একজন দুজন করে ফিরেছিল গ্রামের লোক। যার যার ছেলে নিখোঁজ ছিল তারা বেরিয়েছিল ছেলে খুঁজতে। মির্জা সাহেব আর মোস্তফার সঙ্গে আমিও বেরিয়েছিলাম। নয়ন ছিল আমার জীবন। তার ছিন্নভিন্ন শরীর কবরস্থানে পড়ে থাকতে দেখে আমি পাথর হয়ে গিয়েছিলাম...। নয়নের শোক নিয়ে আমি বেঁচে আছি। মির্জা সাহেব বেশিদিন বাঁচলেন না। বাড়িটা তখন এরকম ছিল না। বারান্দাঅলা টিনের ঘর ছিল। সেই বারান্দায় বসে ছেলের জন্য কাঁদতেন। কবরস্থানে গিয়ে বসে থাকতেন। আমিও যেতাম। দিন নেই রাত নেই, যখন ইচ্ছা চলে যেতাম কবরস্থানে। আমার নয়ন যেখানে পড়েছিল সেখানে গিয়ে বসে থাকতাম। নয়নের কবরে হাত বুলাতাম। যেন ছেলের বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছি...

দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললেন আমেনা বেগম। দিনে দিনে সেই কষ্টটা কমে গেছে মা। এখন মনে হয় অন্যকথা। ভাবি, আমি তো সার্থক মা। আমার বাদল মুক্তিযোদ্ধা আর নয়ন দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। মা হিসাবে আমার আর কী চাওয়ার আছে? নয়নের জন্য আমার মেয়েও খুব গৌরব করে। বাদল গৌরব করে। আমার নাতি-নাতনিরা গৌরব করে। তোমার নয়নকে বলো সে স্বাধীন বাংলাদেশে বড় হচ্ছে। সে তার মতো করে বড় হোক। স্বাধীনভাবে বড় হোক। তার ভালোলাগা নিয়ে বড় হোক। আর আমার কাছে নিয়ে এসো। আমি তাকে একটু দেখব।

সেদিন দুপুরের পরই নয়নকে দেখতে পেলেন আমেনা বেগম। বেদানা খুবই বিরক্ত হয়ে এসে বলল, নতুন ভাড়াইটার পোলাটা কলাপাতা কাটছে, লাল জবাফুল পাইড়া ওই যে দেখেন উঠানের কোনায় বইসা কী কী করতাছে। আমি না করছি। কথা শোনে নাই।

তা-ই নাকি। চল তো দেখি কী করে?

আমেনা বেগমের হাঁটতে অসুবিধা হয়। হাঁটুতে ব্যথা আছে। বেদানা বা রাজিয়াকে ধরে হাঁটেন। এখনো তা-ই করলেন। বেদানার বাহুর কাছটা শক্ত করে ধরে উঠানে এলেন।

উঠানের কোণে বড় একটা কলাপাতা চারকোণা করে কেটে মাটিতে বিছিয়েছে নয়ন। দশটা লাল টকটকে জবাফুল এখন সেই কলাপাতার ঠিক মাঝখানে গোল আর ঘন করে বসাচ্ছে। খুবই মন দিয়ে কাজটা সে করছে। কোনোদিকে খেয়াল নেই।

আমেনা বেগম মায়াবী গলায় ডাকলেন, নয়ন।

নয়ন চোখ তুলে তাকাল। কথা বলল না।

কী করছো? তোমার কথা আমি শুনেছি। তোমার মা বলেছে। এটা কী হচ্ছে?

হাতের কাজ শেষ করে নয়ন উঠে দাঁড়াল। হাসিমুখে বলল, বুঝতে পারনি?

না। জিনিসটা কী?

খেয়াল করে দেখো।

দেখছি, কিন্তু বুঝতে পারছি না।  

আরও খেয়াল করে দেখো। তাহলেই বুঝতে পারবে। খুবই সহজ।

এবার মুখ উজ্জ্বল হলো আমেনা বেগমের। শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, বুঝেছি বুঝেছি। বাংলাদেশের পতাকা। সবুজ কলাপাতার মাঝখানে গোল করে রাখা লাল জবাফুল। বাহ্। দারুণ।

মা বলেছেন, তোমার ছোটছেলের নামও ছিল নয়ন। তিনি মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। শুনে আমার খুব ভালো লেগেছে। নয়নদের বাড়িতে আরেক নয়ন। এক নয়ন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন আরেক নয়ন তাঁদের বাড়িতে কলাপাতা আর জবাফুল দিয়ে বাংলাদেশের পতাকা তৈরি করছে। নয়নরা দশ জন একসঙ্গে শহীদ হয়েছিলেন। এজন্য দশটা লালজবা।

নয়নের কথা শুনে তাকে বুকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলেন আমেনা বেগম। অনেকদিন পর ছেলের জন্য কাঁদছেন তিনি।