কবির প্রসববেদনা সীমাহীন। এ বেদনার কোনো ক্ষণ নেই, নেই কোনো সময়সীমা। কেবল সৃষ্টি সম্পূর্ণ হলেই তার মুক্তি। সৃষ্টির কোনো নিয়ম নেই বলে কবি স্বাধীন, আবার সৃষ্টি হয়ে গেলে তা একটি নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়। কবির ভাবনার সুশৃঙ্খল বিন্যাসই কবিতা। কবি যা যেমন করে দেখেন তা-ই উপস্থাপন করেন। এই দেখার মাঝে তার স্বাধীন সত্তা বিরাজ করে, কবি এখানে কারো ধার ধারেন না, কাউকে পরোয়া করেন না। এই ভাবনার একটা যৌক্তিক মানদণ্ড থাকে। যে পথ তিনি দেখালেন, সেই পথ যেন মসৃণ হয়, নির্বিঘ্ন হয়, পথিক যেন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। এজন্য কবিকে খুব সতর্ক থাকতে হয়। বিন্যাসের বিষয়টা কবির শব্দ ও উপমার খেলা। উপযুক্ত শব্দচয়ন ও রুপময় উপমা দিয়ে কবি তার কবিতা এমন করে শিল্পবোধে বেঁধে ফেলেন যে, তা পড়ামাত্রই পাঠকের হূদয় স্পর্শ করে, পাঠকের মাঝে সেটির কখনো মৃত্যু হয় না। হ্যাঁ, সব পাঠক কবিতার মর্মকথা উদ্ধারে সক্ষম হবে না, কিন্তু কেউ কেউ তো হবে। আবার মর্মার্থ উদ্ধার না করেও তো তারা কবিতার দেহসম্ভারে বিনোদন পেতে পারে—শব্দ আর উপমার খেলায়। বেশিরভাগ মানুষই তো সাগরের ওপরটা দেখে মুগ্ধ হয়, ভেতরটা খোঁজে কিছু মানুষ।
সৃষ্টি বড়ো জটিল প্রক্রিয়া। সৃষ্টিলগ্ন যখন শুরু হয় তখন কবি অস্থির, অশান্ত হয়ে ওঠেন—ছটফট করতে থাকেন। একধরনের অদ্ভুত পাগলামি তার মাঝে প্রতিভাত হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত না তার সমালোচক মন তার ভাবনাকে সায় দিচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এ পাগলামি চলতে থাকে। এ এক বিরাট যাতনা, অদ্ভুত বেদনা। যে সৃষ্টি করে কেবল সে-ই বোঝে। এবার শব্দ আর উপমার খেলা—সে তো আরো জটিল ব্যাপার। এর ব্যথা দুর্লঙ্ঘনীয়। কখনো কখনো একটা শব্দ ও একটা উপমার জন্য কবিকে সময়ের পর সময় প্রতীক্ষা করতে হয়। দিন কেটে যায়, মাস কেটে যায়, তবুও সেই কাঙ্ক্ষিত শব্দ কিংবা উপমা ধরা দেয় না। এই সবকিছু যখন ঠিকঠাকমতো হবে, তবেই তা হবে সৃষ্টি।
আজ আর লিখতে মন চাইছে না। অনেক হয়েছে। এবার একটুখানি আড্ডা প্রয়োজন। আড্ডা এখনো পর্যন্ত পৃথিবীতে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিনোদন। মন প্রফুল্ল হয়। যে একঘেয়েমির শিকলে বাঁধা পড়ে থাকে মন, সেই শিকল ছিঁড়ে যায়, মন মুক্ত হয়। আড্ডা শেষে চৈত্রের দুপুরের গনগনে সূর্যের মতো শক্তি আর ক্ষিপ্রতা নিয়ে আবারও কাজে নিবিষ্ট হয় মন।
কপাট খুলে পা ফেলতেই সামনে এসে দাঁড়ালেন, তার বউয়ের খালাত বোনের স্বামী মাসকান সাহেব।
কী হে কবি, কোথায় যাচ্ছো এই পড়ন্ত বিকালে? হাঃ হাঃ হাঃ! কবির মতো করে বললাম। কোথাও না, এই, বন্ধুদের সাথে একটু আড্ডা-টাড্ডা দিই এ সময়। আজ ঘরেই আড্ডা হোক, কী বলো?
হোক, দুলাভাই বলে কথা!
মাইশা ছুটে এল।
দুলাভাই! কেমন আছেন?
ভালো, ভালো। তোমরা আশপাশে আছো বলেই তো আমি ভালো থাকি। হাঃ হাঃ হাঃ!
ভেতরে আসেন। আর তুমি দুলাভাইকে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে কথা বলছো?
আরে তা হবে কেন? কবির সাথে কথা বলবো, তার আবার ভেতর কী আর বাইর কী!
কবিকে কিছু বলতে হলো না। গাড়ির ড্রাইভার ফল-মিষ্টির প্যাকেটগুলো রেখে চলে গেল।
এত সব কী এনেছেন দুলাভাই?
আরে শালীর বাসায় এসেছি, ফলমূল, মিষ্টি ছাড়া কি চলে?
তাই বলে এত!
আরে শালী বলে কথা! ব্যাপারটাই তো আলাদা! তো কবি, কেমন চলছে লেখালেখি?
ভালো।
কিন্তু আমি তো ভালো দেখি না।
কিছুটা অবাক চোখে তাকায় কবি।
তোমার কবিতা পত্রিকায় ছাপা হয় না, কোনো পুরস্কার পাও না, বইমেলায় তোমার বই কেউ কেনে না, মানুষ তোমাকে চেনে না, সাহিত্যবোদ্ধারা চেনে না—কবি হিসেবে তোমার কোনো স্বীকৃতি নেই।
বোঝান দুলাভাই, ওকে বোঝান। অযথাই কবিতা লিখে কী হবে? দ্যাখো দ্যাখো, শুধু তোমার বউ-ই বলে না, অন্যরাও বলছে।
স্মিত হাসল কবি।
দুলাভাই, আপনি যা বললেন তার কোনোটার জন্য আমি কবিতা লিখি না।
তাহলে কেন লেখো?
প্রথমত, ভেতরের একটা যস্ত্রণা, অসীম যন্ত্রণা, যা আমাকে কলম ধরতে বাধ্য করে; আর দ্বিতীয়ত, আমার ভাবনাগুলো মানুষকে জানানো। এই ভাবনাগুলো একেকটি বিনোদন, যা মানুষের মনকে তৃপ্ত করে, আর সেই মন তখন কল্যাণের দিকে ধাবিত হয়।
কিন্তু তোমার বই তো কেউ পড়ে না?
আমিও তো সেই কথাই বলি দুলাভাই। বউ খামচি দিয়ে বসল।
এটা আপনাদের ভুল ধারণা। আমি সৃষ্টি করি, সৃষ্টির কোনো মৃত্যু নেই। অবশ্যই কেউ না কেউ পড়ছেই, অথবা কাউকে না কাউকেও পড়তেই হবে। যদি একজন মানুষও আমার বই পড়ে আনন্দ পায়, আমার কবিতার মর্মকথা ধারণ করে, লালন করে অন্তরে, তাতেই আমার সাফল্য।
এটা কোনো কথা হলো নাভিদ! তুমি কি জানো, এখন এদেশে কবিরা কী করছে? পুরস্কার পাওয়ার জন্য, মিডিয়ায় নিজেকে তুলে ধরার জন্য, বইয়ের কাটতি হওয়ার জন্য দিন-রাত লবিং করছে, সাহিত্যবোদ্ধাদের দরজায় ধরনা দিচ্ছে। আরো কত কি করছে তারা! শোনো শোনো, টাকা থাকলে সব করা যায়, সব পাওয়া যায়। জানো, এখনই আমি টাকা ছিটাবো, কবিরা দল বেঁধে ছুটে আসবে, তাদের বই আমার নামে চালিয়ে দিবে। এই তো সব কবি! তুমি পুরস্কার নিবে? আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। টাকা দিয়ে পুরস্কার কিনে আনা যায়।
ওরা কেউ কবি নয়। কবির প্রধান পরিচয় হচ্ছে—সততা ও মানবতা।
না না, ওরা কবি হবে কেন, তুমি শুধু একাই কবি! লেখো, তুমি কবিতা লেখো, আমার আপত্তি নেই, কিন্তু এ সংসারটা তো চলতে হবে? যে কয় টাকা বেতন পাও, মাস চলে না, ধারদেনা করতে হয়। এটা জীবন! বাবা-মা তোমাকে মেধাবী দেখে আমাকে বিয়ে দিয়েছে। তাদের বিশ্বাস, তুমি ভালো একটা কিছু করবে। চাকরির বয়স ফুরিয়ে যাচ্ছে, তোমার কোনো চেষ্টা নেই। কবিতা থেকে দুটো পয়সা এলে তাও একটা কথা হতো!
কথার শেষ বাক্যে কণ্ঠ জলের প্রবাহে ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল।
মাইশা কিন্তু ঠিক কথা বলেছে নাভিদ। তোমাদের নতুন সংসার, এখন আবেগই বেশি কাজ করছে। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। ক’দিন পরেই সংসারে বাচ্চাকাচ্চা আসবে, সংসার বড়ো হবে, খরচ বেড়ে যাবে। তোমার প্রতিষ্ঠান আর চাকরির বেতনের যে অবস্থা, তাতে তা পাল্লা দিয়ে তোমার খরচের সাথে এগোতে পারবে না। শোনো, তোমরা হয়তো আমাকে বলতে লজ্জা পাচ্ছো,
আমি বিষয়টা বুঝি, তাই আমি নিজেই এসেছি—তুমি আগামীকালই আমার ফ্যাক্টরিতে জয়েন করছো। এ নিয়ে কোনো কথা হবে না। ভালো একটা পজিশন দিব, বেতনও বেশি। মাইশা, কী, ঠিক আছে তো?
দুলাভাই আমি ওকে বলেছিলাম আপনার কথা, ও যেতে চায়নি, আর আমিও আপনাকে বলতে পারিনি—কেমন কেমন লাগছিল; হ্যাঁ, এখন আর কোনো কথা হবে না—তুমি আগামীকাল জয়েন করছো। এটাই শেষ কথা। আর যদি না করো, আমি আমার বাবার বাড়ি চলে যাবো।
কবি হ্যাঁ, না, কিছুই বলল না।
রাত বেশ গভীর। ঘুম আসছে না কবির। বউ ঘুমোচ্ছে বিভোরে। উঠে বারান্দার গ্রিলে ঠেস দিয়ে চেয়ারে বসে সিগারেট ধরাল। মনের মাঝে ওই তখন থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে শব্দটি—স্বীকৃতি। কবিও মানুষ, ওরাও মানুষ, অথচ ভাবনায় কত ফারাক! পুরস্কার পেলে, মিডিয়ায় নাম ফুটলে, পত্রিকায় লেখা ছাপা হলে, বই বিক্রি হলে, মানুষজন চিনলে তবেই কবি হিসেবে আমার স্বীকৃতি, নচেত্ আমি কবি নই। কী হাস্যকর একটা ব্যাপার! ঠিক আছে, এসব যদি সত্পথে এমনি এমনিই এসে কবি-সত্তায় যুক্ত হয়, ভালো, এসব কবিকে আরো উদ্দীপ্ত করবে, এগিয়ে যাওয়ার পথে শক্তি জোগাবে—কিন্তু এসব কি কবির স্বীকৃতির মানদণ্ড? কবিকে স্বীকৃতি দেবে কে? কার সেই অধিকার আছে? কার সেই সাধ্য আছে? কবিকে স্বীকৃতি দেবে কবি নিজেই। সে যখন নিজের বিচারে কবি, তখনই সে কেবল কবি। অন্যরা কে স্বীকৃতি দিল না দিল, তাতে কিছুই আসে যায় না কবির। সৃষ্টি যদি হয়ে থাকে, সময়ই তাকে টেনে বের করবে, মানুষ মূল্যায়ন করবে। সৃষ্টির বিনাশ নেই। হে জ্বলন্ত চাঁদ, তুমি যেমন সত্য, আমি কবিও সত্য; প্রকৃতি যেমন সত্য, আমি কবিও সত্য; মানুষ যেমন সত্য, আমি কবিও সত্য।
দুই.
ফ্যাক্টরিতে যোগদান করল কবি। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি। এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে। বেতন ভালো। কবির একদম ইচ্ছা ছিল না, শুধু বউয়ের ইচ্ছার কাছে, জেদের কাছে তাকে আত্মসমর্পণ করতে হলো। তার ইচ্ছা, শিক্ষকতা করবে আর লেখালেখি চালিয়ে যাবে। এখন একটা প্রাইভেট স্কুলে পড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ে তার বিভাগে প্রভাষক পদে আবেদন করেছিল। ফলাফল খুব ভালো তার। প্রথম শ্রেণিতে তৃতীয়। গুণগত দিকটা বিচার করলে ওই চাকরি থেকে তাকে সরানোর কোনো উপায় নেই, কিন্তু রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে সে শিক্ষক হতে পারল না। তাকে অনেকেই বলেছিল,
শুধু মেধা আর রেজাল্ট দিয়ে কাজ না-ও হতে পারে, লবিং করো। সে সত্যের পূজারী। কোনো অনৈতিক কাজ সে করবে না। মেধায় হলে হবে, না হলে নয়। দশজনের কথাই ফলে গেল। চারজন শিক্ষক নিলেও তাকে নিল না। প্রথম দুই জন আর তার পরের দুইজনকে নেওয়া হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অনৈতিক আচরণে তার সার্টিফিকেট ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছা করে। এটা কি বিশ্ববিদ্যালয়? এখান থেকে বিদ্যা গ্রহণ করে সে অন্যায় করেছে। কিন্তু জীবিকার কী হবে? জীবন চলবে কী করে? একটা কিছু তো করতেই হবে। যদিও কবির কাছে জীবিকার চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি, কিন্তু কখনো কখনো জীবিকা জীবনের চেয়ে বড়ো হয়ে ওঠে, তাই হার মানতেই হয়। সংসারের আর্থিক টানাপোড়েন কবি টের পায়, উপলব্ধি করে, এ এক চরম বাস্তবতা, আবার তার বাসনায় লালিত স্বাধীন সত্তাকে বিসর্জন দিতে চায় না—এ দুইয়ের মাঝে দোদুল্যমান কবির জীবন। জীবিকার আহামরি ঝকমকে কোনো অবস্থানের স্বপ্ন দেখে না কবি। একটুখানি হেলেদুলে স্বাচ্ছন্দ্যে সংসারটা চললেই হলো।
এদিকে হাই স্কুল আর কলেজের নিয়োগ-নিবন্ধন পরীক্ষায় পাস করে বুকে স্বপ্ন নিয়ে বসে আছে—ডাক আসবেই। আবার ভেবে রেখেছে, সামনের বিসিএস-টা এবার পড়াশোনা করেই দেবে- সরকারি কলেজের জন্য। এটাই কবির ইচ্ছা, এটাই কবির স্বাধীনতা। এইখানেই সে নোঙর ফেলতে চায়। তাই অন্য কোনো চাকরির পরীক্ষায় সে অংশগ্রহণ করে না।
পৃথিবীর সাড়ে সাতশো কোটি মানুষ বেঁকে বসলেও তা নিয়ে যতটা অস্থিরতা, যতটা দুশ্চিন্তা কাজ করবে, বাঙালি ঘরের বউ বেঁকে বসলে তার দ্বিগুণ অস্থিরতা, দ্বিগুণ দুশ্চিন্তা ভর করবে, সবকিছু এলোমেলো হবে, সব ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে; আবার একটুখানি উচ্ছল জীবন-যাপনের স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়ে বউ ঘর ছেড়ে চলে যাবে, একজন কবি হিসেবে তা কী করে বয়ে বেড়াবে? কবিও তো একজন মানুষ। এসব ভেবে-টেবেই সে যোগদান করেছে।
তিন.
দেখতে দেখতে কয়েক মাস পার হয়ে গেল। কবির রোজগার ভালো। সংসারে এখন আলো জ্বলে। বউ হাসে, সংসার হাসে, যে অনাগত প্রাণ পৃথিবীতে আসার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেও হাসবে। শুধু হাসি আর হাসি। কিন্তু কবি কি হাসে? মোটেও না। কবি অভিনয় করে। বউয়ের হাসিমাখা মুখটার সামনে সে হাস্যোজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ভেতরটা আঁধারে ঢেকে যায়। আবার কখনো কখনো বউ হাসার আগে সে হেসে ওঠে। বউ তাকে যতটা ভালোবাসে তাতে ধন্য সে। তার ভালোবাসাও কম নয়। পৃথিবীর সব আয়োজন শেষে ঘরে ফিরে যদি বউয়ের হাসিমুখ দেখা যায়—এ তো এক পরম পাওয়া, একেবারে অমৃত। তাই কবির এ অভিনয় চলবে—হয়তোবা অনির্দিষ্টকাল ধরে। কবির প্রকৃত হাসির খোরাক—আকাশ, তারা, নক্ষত্র, চাঁদ, মেঠো পথ-ঘাট, ফসলের মাঠ, নদী-নালা, খাল-বিল—এসবের সাথে তার আর সাক্ষাত হয় না। কতদিন অতিক্রান্ত হলো, সে আর এগুলো চোখে দেখে না। আবার পড়াশোনা, লেখালেখি গেছে কমে। রাতের বেলা ক্লান্ত, অবসন্ন হয়ে বাসায় ফিরে আর কি পড়াশোনা হয়, লেখালেখি হয়? কবির বিনোদন মানুষ, কবির বিনোদন প্রকৃতি, কবির বিনোদন লেখালেখি—এরা সবাই কবির কাছ থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে। কী করে হাসবে কবি? কবির প্রাণ যে আড়ষ্ট—জীবিকার এ নির্মম শিকলে।
চার.
আজ একটা ঘটনা ঘটে গেল। ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে গেছে। বিদ্রোহের আগুন, বিপ্লবের আগুন। ফ্যাক্টরির শ্রমিকরা এক হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বেতন না বাড়ালে তারা আর কাজ করবে না। এত বৈষম্য তারা আর মানবে না। মালিক তো হতভম্ব। হঠাত্ করেই কী হলো ওদের? সবাই তো ঠিকঠাক কাজ করছিল, হঠাত্ করে খেপে গেল কেন? ঘটনাটা ঘটেছে কবিতা নিয়ে। এই কবিতাই আগুনটা লাগিয়েছে। দিন দশেক আগে এই কবি একটা কবিতা লিখে তার ডেস্কে ভুলে ফেলে আসে। ফ্যাক্টরির শ্রমিকদের নেতা কী একটা কাজে এসে ওই কবিতা তার চোখে পড়ে। ব্যস, সে হস্তগত করে ফেলে। কবির আর মনে ছিল না ওই কবিতার কথা। আজ দশ দিন পর শ্রমিকরা সমুদ্রের জোয়ারের মতো ফুঁসে উঠেছে।
কবিতাটি এই—
মানুষ হবো
বিষয়টা আর্থিক বলেই বিষয়টা মানুষের
পুঁজিবাদী বিশ্ব—
অর্থের মাঝেই মানুষের মুক্তি।
অর্থের কারণেই তুমি আজ মালিক
আমরা শ্রমিক,
আবার একই কারণে তুমি উচ্চবিত্ত
আমরা নিম্নবিত্ত—
এতে কোথাও কোনো সমস্যা নেই,
সমস্যাটা হচ্ছে—ব্যবধান;
এই ব্যবধান এতটাই বড় যে
রীতিমতো এটা একটা বৈষম্য।
একদিন তোমার পকেটে দশ টাকা ছিল
আমাদের ছিল এক টাকা,
আজ তোমার পকেটে আছে ত্রিশ টাকা
আমাদের আছে দুই টাকা—
এ এক বিশাল ব্যবধান।
আমরা যেখানে ছিলাম
সেখানেই রয়ে গেছি,
তোমরা উঠছো তরতর করে ওপরে,
আর এই ওঠার সিঁড়িটা গড়ে দিচ্ছি আমরাই।
বিশ টাকা খরচ করার পরও
তোমাদের থাকছে দশ টাকা,
আর আমাদের নুন আনতে পানতা ফুরায়—
এই বৈষম্য মানা যায় না
মানুষ এটা মানতে পারে না;
হ্যাঁ, এবার আমরা মানুষ হবো—
বেতন বাড়াও, বাড়াতে হবে
এ বৈষম্য মানি না, মানবো না—
দুনিয়ার মজদুর এক হও।
ফ্যাক্টরির মালিক কবির দুলাভাই এই বিস্ফোরণের উত্স উদ্ধার করে মাইশাকে ফোন দিলো—
শোনো, তোমার স্বামী কী করেছে! কবিতা লিখে শ্রমিকদের উস্কে দিয়েছে। তাদেরকে আন্দোলনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এখন শ্রমিকরা জোট বেঁধেছে, বেতন না বাড়ালে আর কাজ করবে না। এই কাজটা করা কি তার ঠিক হয়েছে?
সে এটা করতে পারলো!
হ্যাঁ, করেছে তো। এখন আমি কী করে শ্রমিকদের সামলাবো? এত বড়ো অপরাধ সে কী করে করতে পারলো? আমি ওকে খুব বকাবকি করেছি। না মাইশা, এরকম করলে তো ওকে আর রাখা যাবে না। ওকে বোঝাও—যা করেছে তা তো করেছেই, এরকম কাজ যেন আর না করে।
মাইশা আর কিছুই বলল না।
সন্ধ্যা নেমেছে। কিছুটা ছাই ছাই রঙের সন্ধ্যা। আঁধারের হালকা একটা প্রলেপ চারপাশ ঘিরে ধরেছে। কবি এসে বসেছে নদীর পাড়ে সান বাঁধানো বেঞ্চে। নিশ্চুপ সিগারেট টানছে। ভেতরটায় তোলপাড় হচ্ছে। সত্য কথা বলার জন্য, মানবতার কথা বলার জন্য এরকম বকাবকি খেতে হলো!
কী এক পুঁজিবাদী সন্ত্রাস! মানুষে মানুষে এত বৈষম্য, এত ব্যবধান কী করে হয়! মাইশার কথা ভাবছে। সে নিশ্চয় রেগে যাবে। বকাবকি করবে। এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। আমার কাছে জবাব চাইবে। আমার কথা সে বুঝতে চাইবে না। আমি যেখানে কাজ করি, টাকা নিয়ে সংসার চালায়, সেখানে তো দ্রোহ সৃষ্টি করার অধিকার নেই আমার; সমস্যা যদি কিছু থেকে থাকে সেটা মালিক বুঝবে, আমি কে? আমার তো কোনো সমস্যা নেই। এই কথাগুলোই বলবে সে।
পাশে এসে গা ঘেঁষে বসল মাইশা। কবি একবার দেখেই চোখ নামিয়ে নিল। মাথা নিচু করে আছে। বউয়ের চোখে আর চোখ রাখতে পারছে না। মাইশা তার মুখটা তুলে ধরল নিজের মুখের কাছে।
কাল রিজাইন করবে।
কবি চেয়ে আছে অপ্রতিভ হয়ে। জলে ছলছল করে উঠল বউয়ের চোখ।
আমার কবি, সত্য কবি। টেনে নিল বুকের ভেতর।
স্ত্রীর বুক এত মধুর, এত কোমল, এত প্রেমময়—এমন করে এই প্রথম অনুভব করল কবি।
সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসছে শ্রমিকের কণ্ঠ—
বেতন বাড়াও, বাড়াতে হবে
এ বৈষম্য মানি না, মানবো না
এ ব্যবধান মানি না, মানবো না
