(পূর্ব প্রকাশের পর)
‘আলী যখন আল ইয়ামনে বিচারক নিযুক্ত হন, তখন মহানবি তার বিদায়কালে তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, যখন দুই পক্ষ একসঙ্গে বসবে তখন তাদের একজনের পক্ষে কখনো রায় দেবে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত অন্য পক্ষের সমস্ত কথা বা আর্জি না শোনা হয়। সম্ভবত এটাই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।’
বিচারকার্যপ্রণালির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন খলিফা ওমর কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত কাডি শুরায় (Qadi Shurah) আনয়ন করেছেন, তাহলো সাক্ষীদের পৃথকভাবে হাজির হওয়ার অধ্যাদেশ জারি করা। এর আগে সাক্ষীরা একসঙ্গে বিচারকক্ষে হাজির থাকতেন এবং একে অপরের সব কথা শুনতে পেতেন। পঁচাত্তর বছর ধরে শুরাহ (Shurah) কর্তৃক বিচারকার্যের দায়িত্ব পালন করেছেন। খলিফা ওমর, আবু মুসা আল আশারিকে বসরার বিচারক নিয়োগের পর তাকে যে নির্দেশাবলি দেওয়া হয়েছিল, তার সারাংশ নিম্নে দেওয়া হলো—“(ক) ন্যায়বিচার প্রশাসনের একটি মহান অধ্যাদেশ, যা বিশ্বনবি অনুসরণ করে গেছেন, তা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে; (খ) যদি একটি মামলা তোমার কাছে দায়ের করা হয়, তা যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবেন, তারপর বাস্তবায়ন করবেন। বিচারের রায় যতই সত্য হোক না কেন, তা বাস্তবায়ন না হলে অর্থহীন হয়ে যায়। (গ) উভয় পক্ষের সঙ্গে সমান আচরণ করতে হবে, যেন কোনো মতেই কোনো দরিদ্রপক্ষ তোমার সুবিচার থেকে বঞ্চিত না হয় এবং অত্যাচারীরা কোনোক্রমেই যেন আপনার পক্ষপাতিত্বে আশান্বিত না হয়। (ঘ) প্রমাণ করার দায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে বাদীর এবং বিবাদী শপথপূর্বক তা অস্বীকার করতে পারে। (ঙ) উভয় পক্ষই কোর্টের বাইরে নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করে নিতে পারে এবং এই আপসের শর্ত হবে কোনোক্রমেই যেন তা ধর্মীয় বিশ্বাস বা নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ না করে; (চ) বিচারের পুনর্বিবেচনা করা নিষেধ নয়, যদি সেটা আপাতদৃষ্টিতে সত্য বলে মনে হয়, কেননা কোনো অন্যায় বিচারের রায়কে আঁকড়ে ধরে থাকার চেয়ে প্রয়োজনে তা বাতিল করা বাঞ্ছনীয়; (ছ) কোনো কোনো প্রশ্নের ব্যাপারে আইন এবং পূর্ববর্তী নজিরের (কোরআন ও সুন্নাহ) অনুপস্থিতিতে একই ধরনের মামলার মতো কিছু বাদ দেওয়া যেতে পারে এবং যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণের পর, অধিকারের কাছাকাছি এবং আল্লাহর যেটা প্রিয় সে রকম বিচারের রায় ঘোষণা করা যেতে পারে; (জ) বাদী পক্ষকে সাক্ষী সংগ্রহের জন্য সময় দিতে হবে, এর পরও যদি সে তার মামলা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, তবে তার দাবি বা আর্জি খারিজ করা যেতে পারে; (ঝ) প্রত্যেক মুসলমানকেই সাক্ষী হিসেবে গ্রহণ করা যায়, যদি না সে কোনো দিন নীতিবহির্ভূত কারণে শারীরিক শাস্তি ভোগ করে থাকে অথবা মিথ্যা সাক্ষী রূপে কুখ্যাত। আবার কোনো ব্যক্তি তার নিজের আত্মীয়স্বজন বা পরিবারের জন্য সাক্ষ্য দিতে পারবে না এবং বিচারক কখনই উদ্ধত মেজাজে কথা বলবেন না এবং সত্য কথা বলার জন্য কখনো অসন্তোষ প্রকাশ করবেন না। আল্লাহর সব জান্তা এবং সবকিছুই শুনতে পান এবং তার সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে।”
ইসলামের আদর্শ কখনো বলে না যে একজন মানুষ সম্পূর্ণ ত্রুটি মুক্ত হবেন অথবা তিনি ভুল করতে পারেন না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, মুহাম্মদ (স.) তার অনুসারীদের উত্সাহিত করতেন তার বিরুদ্ধে সাধারণ মামলা করার জন্য এবং আমরা সবাই জানি যে, প্রতিটি মামলার রায় বাদীদের পক্ষেই যেত।
তিনি তার অনুসারীদের বার বার বলতেন যে, তিনি একজন মানুষ। তারও ভুল-ত্রুটি হতে পারে, অনিয়ম হতে পারে। সেই ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটলে তারা (অনুসারীরা) যেন তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। মহানবি (স.) এ ধরনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলাও করেছিলেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলায় রায় বাদীদের পক্ষেই যেত। তিনি কত বড় উদার মনের ও মহত্ ব্যক্তি ছিলেন তা সহজেই অনুমেয়।
খলিফা উসমান (Uthman), সুবিচারের জন্য একটি বিশেষ ধরনের ভবন (Daral-Qada) তৈরি করেছিলেন। ওবায়েদ আল্লাহ আল হাসান আন বারি এবং ইবনে ওমরকে যুগ্মভাবে বসরার বিচারক নিযুক্ত করা হয়েছিল। তারা বিচারকের আসনে একসঙ্গে বসতেন, তাদের সামনে শুনানি হতো এবং তারা একসঙ্গে রায় দিতেন। বলা বাহুল্য, প্যানেল অর জাজেসের বিচারব্যবস্থা আমাদের দেশে এখনো প্রচলিত। হিজরির একদশক পর, তার বিদায় হজ্জের সময় মুহাম্মদ (স.) হুকুম জারি করেছিলেন যে, জীবন, সম্পদ এবং সম্মান—মানুষের এই তিনটি প্রাথমিক অধিকারকে অবশ্যই শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখতে হবে।
ডি সান্টিলানা (De Santillana) ইসলামের আইনের কাছে অন্যদের ঋণের মূল্যায়ন করেছেন—“আরবের আইন থেকে আমরা যে ভালো দিকটা গ্রহণ করেছি, তার মধ্যে কিছু আইনগত প্রতিষ্ঠান যেমন সীমিত অংশীদারিত্ব (Qirad) এবং বাণিজ্যিক আইনের কিছু কৌশলগত দিক। কিন্তু এমনকি এগুলো যদি বাদও দেওয়া যায়, তবুও সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, আরব আইনের উঁচু নৈতিক মানের কিছু দিক, আমাদের বর্তমান ধারণাসমূহের প্রবৃদ্ধিতে অনুকূল প্রভাব বিস্তার করেছে। এতেই রয়েছে এর অন্তর্নিহিত উত্কর্ষ।” ইসলাম ইউরোপিয়ানদের ভূমিদাস প্রথা অনুসরণ করেনি। পারস্য এবং তুর্কিস্তানে নগরজীবনের উন্নয়ন এবং জাতিভেদ প্রথা বিলোপ এবং জমিদারির বিশাল সম্পদের সুষমবণ্টন নিশ্চিত করা হয়েছিল।
(সমাপ্ত)
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড, ঢাকা
