জনসংখ্যা সমস্যা নয়!

আপডেট : ০৩ জানুয়ারি ২০২০, ২০:৪৬

g শফিকুর রহমান রয়েল

 

মহামারির প্রতিষেধক আসার পরই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার লাফিয়ে বাড়তে থাকে। উপরন্তু প্রতি বছরই আবিষ্কৃত হচ্ছে উন্নত খাদ্যশস্যের বীজ। যে কারণে খাদ্য সমস্যা আজ বিশ্ব জুড়েই আর আগের মতোই প্রকট নেই। বস্তুত মানব ইতিহাসের প্রায় পুরোটা জুড়ে ধরিত্রীর লোকসংখ্যা এতটাই ধীরগতিতে বেড়েছে যে, জনবিশারদের কেউ কেউ এমন কথাও বলেন, বেশির ভাগ জীয়ন্ত থাকলেও বসুন্ধরার খুব একটা সমস্যাতো হতোই না। ১ থেকে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দ, এ সময়টায় আদমসন্তানের সংখ্যা ২০০ মিলিয়ন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৬০০ মিলিয়ন। ইংরেজি ১৮০০ সাল নাগাদ টেনেটুনে ছোঁয়া গিয়েছিল ১ বিলিয়নের মাইলফলক। এরপরই ধরায় ঘটে জনস্ফীতি। প্রথমে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে; পরবর্তীতে বাকি ইউরোপের অধিকাংশে এবং ঘটনাক্রমে এশিয়ায়। ১৯২০ সালের শেষ দিকে এসে জনসংখ্যা দাঁড়ায় ২ বিলিয়ন। আরো ১ বিলিয়ন বাড়ে ১৯৬০ সালের কাছাকাছি সময়ে এসে। মোট সংখ্যাটা ৪ বিলিয়ন অতিক্রম করে ১৯৭৫ সালে। তার পর থেকে আজ অব্দি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় দ্বিগুণ। পৃথিবী নামক একমাত্র বসবাসযোগ্য গ্রহের অধিবাসী এখন ৭৬০ কোটি।

জনসংখ্যা একটি নগর, রাষ্ট্র বা অঞ্চলের ভবিষ্যত্ নির্ণায়ক হোক বা না হোক, ভূরাজনীতির ছাত্রদের কাছে এ দুটি খুবই কাছাকাছি বিষয়। যদিও অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির প্রথাগত পরিমাপগুলো বেশির ভাগ সময়েই অধিক মনোযোগ আকর্ষণ করে, বৃহত্ শক্তিগুলোর মাঝে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিযোগিতায় আরো কিছু বিষয় যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্রের কথাই ধরা যাক। ১৮৫০ সালে ২৩ মিলিয়ন লোকের বাস ছিল দেশটিতে, যা কি না তখনকার ফ্রান্সের চেয়ে ১৩ মিলিয়ন কম। এখন যুক্তরাষ্ট্রের লোকসংখ্যা ৩৩০ মিলিয়নের কাছাকাছি। ব্রিটিশ, ডাচ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ও ইতালিয়ান জনসংখ্যা মিলেও এর সমান নয়। শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে তাদের রয়েছে বিশ্বেও সর্ববৃহত্ দক্ষ শ্রমশক্তি। বিভিন্ন পরিমাপেও , যেমন এডাল্ট স্কুলিংয়ের মধ্যক বছরেও তারা এগিয়ে। সবচেয়ে উচ্চশিক্ষিত জনসংখ্যাও তাদেরই। ভূগোল ও প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়াও জনসংখ্যাগত সহায়কগুলোই ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর কেন সর্বশ্রেষ্ঠ অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে উত্থিত হলো এবং কেনইবা এখন পর্যন্ত নেই স্থানটি তারা ধরে রেখেছে।

তবুও অতীত নৈপুণ্য ভবিষ্যত্ ভালো ফলাফলের নিশ্চয়তা দিতে পারে না। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র নানাবিধ উপায়ে হেলাফেলা করে তার জনসংখ্যাগত তীক্ষতা ক্ষয় বা নষ্ট করে ফেলেছে। এমনকি ইউরোপ ও এশিয়ায় তাদের ঐতিহ্যবাহী মিত্রগুলোও জনসংখ্যার স্থবিরতা বা হ্রাস নিয়ে রীতিমতো সংগ্রাম করছে। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির ক্ষতি এখন পর্যন্ত সীমিত থাকার যে কারণটি চিহ্নিত, সেটি হচ্ছে প্রধান ভূরাজনৈতিক শত্রুরা তাদের চেয়ে আরো বেশি মারাত্মক জনসংখ্যা সমস্যা মোকাবিলা করছে। অতীতকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যতের কথা ভাবলে বলতেই হয়, জনসংখ্যা প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাস্তরের উন্নয়ন ঘটিয়ে নতুন কোনো দেশ মহাশক্তির সম্মান অর্জন করে নিলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

 ভবিষ্যত্ ভূরাজনৈতিক বিশ্বকে সামনে রেখে জনতাত্ত্বিকরা তাদের ইঙ্গিত উপস্থাপন করে। ওয়াশিংটনের কীভাবে প্রস্তুত হওয়া উচিত, সে ইশারাও দেওয়া রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের তীক্ষতা বজায় রাখতে আমেরিকার নেতাদের উচিত চলমান নেতিবাচক জনসংখ্যাগত ধারাকে পুরোপুরিই উলটে দেওয়া, যা এখন যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির ভিত্তিকেই নড়বড়ে করে দিচ্ছে।