রম্য গল্প
অয়েজুল হক
রাত বারটায় মিতু লিখেছে, ‘শুভ নববর্ষ; আই লাভ ইউ জান।’ হাসান সকালে ঘুম থেকে জেগে মেসেজ দেখে ধড়ফড়িয়ে ওঠে। দু হাত দিয়ে ভালোমতো চোখ দুটো কচলিয়ে নিশ্চিত হয়। হ্যাঁ, মেসেজটা ঠিকই আছে। ছয় মাস সাধনা করে যে মেয়েটার টিকিটা ছোঁয়া যায়নি, সে লিখেছে, জান! আই লাভ ইউ! অবাক ব্যাপার! এটাই নববর্ষের শ্রেষ্ঠ উপহার। সঙ্গে সঙ্গে রিপ্লাই দেয়, ‘গুড নাইট মিতু। আই লাভ ইউ।’
একটু পরেই মিতুর ফোন, ‘কী মেসেজ লিখেছেন!’
—উত্তর দিয়েছি।
ওপাশে বজ্রকণ্ঠ, ‘এখন সকাল দশটা বাজে, লিখেছেন গুডনাইট!’
—কাল রাতের মেসেজের রিপ্লাই দিয়েছি।
—তা ‘আই লাভ ইউ’ লেখার মানে কী?
—তুমি ‘আই লাভ ইউ জান’ লিখতে পারলে আমি ‘আই লাভ ইউ’ লিখতে পারব না?
—দেখুন ফাজলামির কিন্তু সীমা আছে।
হাসানের বুকের ভেতরে ধড়াস করে ওঠে। মশার মতো পিনপিনে গলায় বলে, ‘সাগরের যখন সীমা আছে, ফাজলামির সীমা থাকাও স্বাভাবিক। কেন কী করেছি?’
—বোঝেন না! দিনের পর দিন জ্বালাতন করছেন। আপনি কী মানুষ না পাগল?
—বুঝলাম না। মানুষ না পাগল! মানুষই তো পাগল হয়। পাগল কী মানুষ না?
—একদম বাজে বকবেন না। আর শুনুন, এরপর ফোন করলে বুঝতে পারবেন কত ধানে কত চাল!
মেয়েটা ফোন কেটে দেয়।
হাসান কূলকিনারা খুঁজে পায় না। মিতুকে আবার ফোন করা দরকার। বছরের শুরুতে এমন অপমান সহ্য করা যায় না। তাকে বলতেই হবে কেন গতকাল রাতে লিখল—শুভ নববর্ষ, আই লাভ ইউ জান। আবার কল করে। দু বার রিং বাজার পর ফোন রিসিভ হয়। বুড়ো কণ্ঠের কর্কশ গলা। বুড়োদের কর্কশ গলা মানায় না। কাকের কা-কা মনেহয়।
—হ্যালো কে?
—আমি হাসান।
—কী সান?
—কোনো সান না। সান, মুন—এগুলো হলে কী প্রেম নিবেদন করে বেড়াতাম।
—তুমি কী চাইছেন?
বয়সের ভারে লোকটা আপনি-তুমি গুলিয়ে ফেলছেন। হাসান বলে, ‘আমি মিতুকে চাচ্ছি।’
—চাচ্ছি মানে! মিতু কী চাউল, পেঁয়াজ নাকি! ভিক্ষুক চাইল আর দিয়ে দিলাম। আমার একমাত্র আদরের পেত্নী।
—পেত্নী!
—পেত্নী মানে নাতনি। আমি পেত্নী ডাকি, কারণ রাত-বিরাতে সে আমাকে ভয় দেখায়। গতকাল রাতে লোডশেডিং হলো। মিতু ভেউ দিল। দিনকাল ভালো না। আমি বুড়ো মানুষ, ভয়ে অস্থির। অন্ধকারে চিত্কার করছি। আলো কই। মিতুই আবার মোবাইলে আলো জ্বালিয়ে আমার কাছে রেখে গেল। কারেন্ট আসার পর আমি আর মোবাইলের আলো নেভাতে পারি না। টিপতে টিপতে কী হলো কে জানে। একটু পরেই ফোন। তুমি কী আমার কথা শুনছেন?
এবার হাসান কিছুটা অবাক হয়। লোকটা আপনি-তুমি গুলিয়ে ফেলছেন! না এটা তার কথা বলার সিস্টেম? প্রথমে বলবে তুমি একেবারে শেষে আপনি তে গিয়ে শেষ করবেন। হাসান জবাব দেয়, ‘হু, শুনছি।’
—একটা মেয়ে। এই আমার নাতনির বয়সী হবে। আমাকে বলে আমিও আপনাকে ভালোবাসি, নতুন বছরে স্বাগত। আমি তো অবাক। এ যুগে সস্তা দরের ভালোবাসা চলছে। আমাদের সময় এসব ছিল না। তুমি বলো আমার কী ভালোবাসার বয়স আছে। অর্ধেক বডি মাটির নিচে অর্ধেক উপরে। কী সান কথা কী শুনছেন?
—জি, শুনছি। আর শুনুন, কী সান না, আমার নাম হাসান।
—ও আচ্ছা। বয়স হয়েছে তো শুধু ভুল করি। কিছু মনে কোরো না।
—মনে করার কিছু নেই। মিসটেক।
—মিস টেক! উনি কী বিদেশি কোন তরুণী?
—মিসটেক হলো ভুল, তরুণী হতে যাবে কেন?
—মিস শুনেই না তোমার নানির কথা মনে পড়ে গেল। কী অপরূপ দেখতে। বিয়ের আগে, তখন ব্রিটিশ আমল। মিস আর মিসেসের ছড়াছড়ি। ওকে সবাই ডাকত মিস কুলসুম নামে। নতুন বছর আর এখনকার কড়া শীতে আমাদের বিয়ে হলো। আমি তো প্রথম দেখাতেই অজ্ঞান।
বুড়োর সঙ্গে কথা না বললে বোঝা যাবে না, একজন বয়োবৃদ্ধ মানুষ এত কথা বলতে পারে।
হাসান বলে, ‘তারপর আপনার জ্ঞান ফিরল কখন?’
মিতুর গলা শোনা যায়, ‘জ্ঞান আর ফেরেনি।’
এই মেয়েটাকে মোবাইল কোম্পানির কাস্টমার কেয়ারে বসিয়ে দিলে কী হতো কে জানে! কেউ একজন ফোন করল, ‘ম্যাডাম আমার মোবাইলে কী একটা সমস্যা...’
মিতু খ্যাঁকানো গলায় বলবে, ‘তা আমি কী করতে পারি? ইশ, ওনার মোবাইলে একটা সমস্যা...’
—এটা মোবাইল কোম্পানির কাস্টমার কেয়ার না?
—হ্যাঁ, তো কী হয়েছে?
ধমকে লোকটা খানিক ভড়কে যাবে। ভাববে কাস্টমার কেয়ারের মেয়েরা এমন হয়! হয়তো তার ভুল হয়েছে। মিসটেক।
মিতুর গলা শোনা যায়, নরম সুর তার গলায় নেই, শুনুন আমার ইয়ে আছে।
—ইয়ে আছে! ঠিক বুঝলাম না।
—যার জন্য ঐ এসএমএস লেখা। বুঝেছেন।
—জি, বুঝেছি।
—নানা টেপাটেপি করে মেসেজটা বেশ কয়েক জনকে ফরোয়ার্ড করে দিয়েছেন। এজন্য কেউ ফোন করলে তাকে ধরিয়ে দিচ্ছি। মিসটেক সে করেছে, আমি কেন যন্ত্রণা পোহাতে যাব।
—হুম, শাস্তি হিসেবে ওনার কানের সাথে মোবাইলটা লটকিয়ে দিতে পার।
আবার মিতুর গর্জন, একদম রসিকতা করবেন না। আপনি ভুল জায়গায় নক করেছেন। গ্রেট মিসটেক।
কল কেটে দেয়।
হাসান ওপরের দিকে তাকায়। আকাশ দেখবে। নতুন বছরের আকাশ। সে এখন চার দেয়ালের মাঝে আবদ্ধ। ওপরে জমাট বাঁধা সিমেন্ট বালি। মিতুর কথা মনে পড়ে, যদিও ছাদের সিমেন্ট বালির মতো জমাট বাঁধা শক্ত তার মন। বিড়বিড় করে বলে, ‘মিসটেক। মিতুর নামটা মিস টেক হলে মন্দ হতো না।’ g
