প্রাচীন এই নগরীতে যেমন রয়েছে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর অসংখ্য নিদর্শন তেমনি রয়েছে যুগ যুগ ধরে বদলে যাওয়ার চিহ্ন। আর এই ৪০০ বছরকে মানুষের সামনে থরে থরে সাজিয়ে রেখেছেন এই ভাস্কর্য। যে কেউ একপলকেই ফিরে যাবেন বিগত সময়ে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না
আহসান জোবায়ের
দেয়াল আকৃতির ঊর্ধ্বমুখী অর্ধ গোলাকার ভাস্কর্যের দুই পাশে খোদাই করে ঢাকার বিভিন্ন সময়ের যাতায়াত ব্যবস্থার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এমধ্যে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ঢাকার চিরপরিচিত বাহন ঘোড়ার গাড়ি, রিকশা প্রভৃতি। মানে এক ভাস্কর্যের ভেতরেই অনেককিছু। যানজট কিংবা সময় স্বল্পতার কারণে যাদের ঢাকার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাগুলো দেখার ফুরসত মেলে না তারা এই ভাস্কর্যের মাধ্যমেই সেগুলো সম্পর্কে ধারণা পাবেন।
এই ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়েছে মিরপুরের শহীদবাগ এলাকায়। একই ভাস্কর্যে স্থান পেয়েছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন আহসান মঞ্জিল, লালবাগ কেল্লা, জাতীয় জাদুঘর, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জাতীয় সংসদ ভবনসহ ঢাকার নানা স্থাপত্য। স্থানটি ক্যান্টনমেন্ট এলাকার কাছে। যা বর্তমানে সাগুফতা নামেই পরিচিত। কোলাহলমুক্ত এ এলাকাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে ভাস্কর্যটির কারণে নগরবাসীর প্রিয় হয়ে উঠেছে এরইমধ্যে।
ঢাকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক নির্দশন তুলে ধরা হয়েছে মিরপুরের পল্লবীর শহীদবাগে অবস্থিত ‘শতবর্ষের ঢাকা’ নামের এই একটি ভাস্কর্যে। এই ভাস্কর্যে চোখ ফেললেই এক নিমেষে দেখা যাবে রাজধানী হিসেবে যাত্রা শুরুর পর পুরো ঢাকার চারশ’ বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সাংস্কৃতিক নির্দশন। শুধু তাই নয়, সময়ের পরিক্রমায় জীবনাচরণের পরিবর্তিত রূপও তুলে ধরা হয়েছে এই ভাস্কর্যের পরতে পরতে। সেখানেই দেখা মিলবে মানুষ আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া। দেখা যাবে তথ্য-প্রযুক্তি খাতের অতি জরুরি উপকরণ কম্পিউটার, ল্যাপটপ ও মোবাইল।
ঢাকা বাংলাদেশের প্রাণ। ৪০০ বছরের পুরনো এই শহরটি ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আরো দ্রুতগতিতে প্রসার লাভ করেছে। অনেকেই ঢাকাকে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা এবং অন্যান্য যেকোনো কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। কিন্তু অনেকেই হয়তো বুঝতে পারেন না যে, ঢাকা বিশ্বের দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি। শহরটিতে অসামান্য সুন্দর কিছু শৈল্পিক নিদর্শন রয়েছে, যা ৪০০ বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। এই শহরটি প্রতিষ্ঠার প্রায় শুরু থেকেই বঙ্গের রাজধানী ছিল। এটি ছিল রাজা-বাদশাদের তীর্থভূমি। শহরের অনেক অলিগলিতে এখনও তাদের শাসনামলের অনেক নিদর্শন চোখে পড়ে।
‘পুরান ঢাকা’ নামে পরিচিত ঢাকার পুরনো একটি স্থান, যা অষ্টাদশ এবং ঊনবিংশ শতাব্দির ঐতিহ্য এবং নিদর্শন বহন করছে। লালবাগ কেল্লাও যথারীতি পুরান ঢাকায় অবস্থিত। সপ্তদশ শতাব্দিতে বাংলার সুবেদার মুহাম্মদ আজম শাহ এটি নির্মাণ করেন। ৩০০ বছরেরও বেশি সময় পার করে আজো এটি স্বগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে। সেটিও স্থান করে নিয়েছে এই ভাস্কর্যে। ঢাকাতে অসংখ্য সুন্দর সুন্দর স্মৃতিস্তম্ভ এবং স্থাপনা রয়েছে, যা এই জাতির সংগ্রামের ইতিহাসের কথা বলে। মাতৃভাষার জন্য যারা জীবন দিয়েছিলেন তাদের সম্মানার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভেতরে নির্মাণ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। জাতীয় সংসদ ভবন ঢাকা শহরের অনিন্দ্য সুন্দর একটি দর্শনীয় স্থান। লুই আই কান যার স্থপতি, সেটিও শোভা পাচ্ছে সেখানে।
এর সবই পাওয়া যাবে এক ফ্রেমে। তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকার সৌন্দর্য বর্ধনের অংশ হিসেবে ২০০৬ সালের ১৮ জুন এই ভাস্কর্য তৈরির কাজ শুরু করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্যাটেলিয়ন (১৬ ইসিবি)। কাজ শেষ হয় ২০১২ সালে। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৭০ কোটি টাকা। স্থাপনার কাছেই দেখা মেলে পাথরে খোদাই করা একটি সাইনবোর্ডের। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, সড়কের সৌন্দর্য বর্ধন ও ঢাকার ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরতেই ‘শতবর্ষের ঢাকা’ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দর্শনার্থীদের নজর কাড়ছে ভাস্কর্যটি। এক মুহূর্তে ঢাকা দর্শনের পাশাপাশি ভাস্কর্যটির চারপাশের দৃশ্যও দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ব্যাংকার ফাহিম সিদ্দীক জানান, চারশ’ বছর ধরে ঢাকা শুধু এক জায়গায়ই থেমে নেই। বদলেছে নগর ঢাকা, বদলেছে তার নাগরিক জীবনের ধারা। মোট কথা, অসংখ্য ঐতিহ্যের সম্মিলন ঘটেছে ইট-পাথর আর সিমেন্টের তৈরি এই নির্দশনে। তিনি বলেন, ‘আমি অভিভূত একপলকে ঢাকার পুরো স্থাপনা, ঐতিহ্য ও জীবনধারার পরিচয় পেয়ে।’ শুধু ফাহিম নন, অনেকে আসেন পরিবার নিয়ে শহীদবাগ চত্বরে। বাড্ডা থেকে আসা এক দর্শনার্থী আবু তালেবের ভাষ্য, ‘আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে এটি সম্পর্কে জানতে পারি। এদিকে কাজে এসেছিলাম। তাই নয়নাভিরাম এই স্থাপনা দেখে গেলাম। যারা এটি তৈরি করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।’ যারা ঢাকার বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখার ফুরসত পাননি তারা এই ভাস্কর্য দেখলে মোটামুটি একটা ধারণা পেয়ে যাবেন বলে মনে করেন তিনি।
প্রাচীন এই নগরীতে যেমন রয়েছে দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর অসংখ্য নিদর্শন তেমনি রয়েছে যুগ যুগ ধরে বদলে যাওয়ার চিহ্ন। আর এই ৪০০ বছরকে মানুষের সামনে থরে থরে সাজিয়ে রেখেছেন এই ভাস্কর্য। যে কেউ একপলকেই ফিরে যাবেন বিগত সময়ে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।
ছবি: তন্ময় মির্জা
