জয়িতা-৭১
ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজে প্রবেশ করে সবার প্রথম যা নজর কাড়বে, তা হলো ‘জয়িতা-৭১’ ভাস্কর্য চত্বর। ঢাকা জেলা পরিষদের অর্থায়নে নান্দনিক কারুকার্যের এ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন শিল্পী এহসানুল আহসান খান। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি তত্কালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এর উদ্বোধন করেন। ভাস্কর্যটিতে দেখা যায় দু’জন নারী বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। ভাস্কর্যের নিচের দেয়ালজুড়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ এবং নারী আন্দোলনের চিত্রগুলোতে দেখা মেলে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অগ্রণী ও প্রতিবাদী আন্দোলনের ঘটনাগুলো। এর চারপাশে সুবিস্তীর্ণ বাগান ও গাছপালা এর সৌন্দর্যকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। নিরাপত্তা ও ভাস্কর্য চত্বরের সৌন্দর্য রক্ষার্থে জায়গাটি সাধারণত বন্ধ থাকে। তবে বিশেষ দিনে সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও যেভাবে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন, ভাস্কর্যটি আমাদের সেই সময়ের নারী সমাজকে মনে করিয়ে দেয় এবং এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
জাগ্রত চৌরঙ্গী
জয়দেবপুর চান্দনা চৌরাস্তা, গাজীপুরে এটি অবস্থিত। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রথম স্মারক ভাস্কর্য হলো জাগ্রত চৌরঙ্গী। মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে ১৯৭১ সালে ১৯ মার্চ গাজীপুরে সংঘটিত প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ সংগ্রামের চেতনার আলোকে ও শহীদ হুরমত আলীসহ অন্যান্য শহীদদের স্মরণে নির্মিত হয় জাগ্রত চৌরঙ্গী। ভাস্কর্যটির উচ্চতা মাটি থেকে ১০০ ফুট। দু-পাশে ১৬ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ১১ নং সেক্টরের ১০৭ জন এবং ৩নং সেক্টরের ১০০ জন শহীদ সৈনিকের নাম খোদাই করা রয়েছে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২৬ মার্চ। ২৬ মার্চকে তাই আমরা স্বাধীনতা দিবস বলি। কিন্তু অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তো আরো আগেই শুরু হয়েছিল! ৭ মার্চের ভাষণেই বঙ্গবন্ধু বলে দিয়েছিলেন—‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’
অপরাজেয় বাংলা
নান্দনিক শোভামণ্ডিত ‘অপরাজেয় বাংলা’ ভাস্কর্যটিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে গর্বের সঙ্গে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেছেন বিশিষ্ট ভাস্কর সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ। এই ভাস্কর্যটিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ছাত্রসমাজসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণের দৃশ্য সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সর্বস্তরের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তারই অনুপম স্মারক ভাস্কর্য অপরাজেয় বাংলা।
১৯৭২-৭৩ সালে ডাকসুর উদ্যোগে অপরাজেয় বাংলার কাজ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৯৭৯ সালে। ৬ ফুট বেদির ওপর নির্মিত এর উচ্চতা ১২ ফুট, প্রস্থ ৮ ফুট ও ব্যাস ৬ ফুট। ১৯৭৯ সালের ১৬ ডিসেম্বর এ ভাস্কর্যের উদ্বোধন করা হয়। ভাস্কর্যটির ৩টি মূর্তির একটির ডান হাতে দৃঢ় প্রত্যয়ে রাইফেলের বেল্ট ধরা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি। ভাস্কর খালিদ এই ভাস্কর্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মরণে নিবেদিত এবং শুধু ৩ জন মুক্তিযোদ্ধাকে চিত্রায়িত করেননি, সামগ্রিক সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব প্রতিচ্ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। এই অনন্য সাধারণ ভাস্কর্যের মডেল ছিলেন আর্ট কলেজের ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা বদরুল আলম বেনু।
জননী ও গর্বিত বর্ণমালা
বাংলার ইতিহাসে একটি তাত্পর্যপূর্ণ দিবস ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাই একুশের চেতনা জাগ্রত করতে এবং তরুণ প্রজন্মকে দিনটির তাত্পর্য সম্পর্কে সচেতন করতে নির্মিত হয়েছে বেশকিছু ভাস্কর্য। এই ভাস্কর্যগুলো আমাদের ভাষা আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিকে ধারণ করে। এগুলোর মধ্যে একটি ‘জননী ও গর্বিত বর্ণমালা’। ঢাকার পরীবাগে নির্মাণ করা হয়েছে একুশের এ ভাস্কর্যটি। এটির নকশা করেছেন শিল্পী মৃণাল হক।
জননী ও গর্বিত বর্ণমালা ভাস্কর্যে দেখা যায় একজন মা তার মৃত সন্তানকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তার সামনে একটি সবুজ বৃত্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কয়েকটি বাংলা বর্ণ। পেছনে লাল বৃত্তে রয়েছে ‘২১’ এবং ‘ব’ ও ‘ক’। আমাদের ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস শুধু গৌরবের নয়, এই ইতিহাস করুণ, ত্যাগের ইতিহাস। সেই কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় জননী ও গর্বিত বর্ণমালা।
রাজসিক বিহার
২০০৮ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা নগরীর ৪০০ বছরপূর্তি উপলক্ষে কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের শেরাটন হোটেলের সামনে নির্মাণ করা হয় ‘রাজসিক বিহার’ নামক একটি ভাস্কর্য। শিল্পী মৃণাল হক এটির নির্মাতা। এক সময় ঢাকার নবাব-জমিদাররা পরিবার-পরিজন নিয়ে রাজসিক বিহারে বের হতেন। তাদের গাড়িতে দ্রুতগতিসম্পন্ন দুটি ঘোড়া থাকতো। তারা যখন রাস্তায় থাকতেন তখন অন্য ঘোড়ার গাড়ি বা লোকজন একপাশে সরে দাঁড়াতেন তাদের গাড়ির নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে। রাজসিক বিহার শিরোনামের এ স্থাপত্যে দেখানো হয়েছে নবাব সলিমুল্লাহ স্ত্রী, ছেলে ও পেয়াদাসহ এমনই এক বিহারে বেরিয়েছেন শহর দেখতে। এখানে মূলত রাজকীয় ভ্রমণে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহারের মাধ্যমে ঢাকার প্রাচীন ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়েছে।
সংশপ্তক
যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয় জেনেও লড়ে যান যে অকুতোভয় বীর সেই সংশপ্তক। ১৯৯০ সালের ২৬ মার্চ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সংশপ্তক’ ভাস্কর্য নির্মাণ করেন ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগানের সামনে এক পায়ে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে এক বীর মুক্তিযোদ্ধা। এ ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যুদ্ধে শত্রুর আঘাতে এক হাত, এক পা হারিয়েও রাইফেল হাতে লড়ে যাচ্ছেন এক বীর মুক্তিযোদ্ধা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে লেপ্টে গেছে, ঠিক তেমনি সংশপ্তক লেপ্টে গেছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের সঙ্গে। সাভারে অবস্থিত এই ভাস্কর্যটিও স্বাধীনতার মহান স্মৃতি আর গৌরবের মহিমায় মহিমান্বিত। দেশের জন্য প্রাণ উত্সর্গ করতে সদাজাগ্রত মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রামবাংলার আপামর জনতার স্বাধীনচেতা, অকুতোভয় মানসিকতার সাহসী প্রতিবিম্ব এই ভাস্কর্যটি।
