দুর্গম জনপদ বোবারথল

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২০, ১৮:০২

 

ইসমাইল মাহমুদ

সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলার ভারতীয় সীমান্তবর্তী একটি পাহাড়ি জনপদ ‘বোবারথল’। ১০টি পাহাড়ি গ্রাম নিয়ে প্রতিষ্ঠিত দুর্গম বোবারথল জনপদের বাসিন্দাদের মনে যুগ যুগ ধরে শান্তির কোনো সুবাতাস নেই। নেই আধুনিক জীবনযাত্রার ছোঁয়া। বর্তমান আধুনিক জীবনব্যবস্থা থেকে শতবছর পিছিয়ে রয়েছে পাহাড়ি এ জনপদের বাসিন্দারা। মাত্র ৫ বছর পূর্বেও এ জনপদের চিকিত্সা বলতে ছিল শুধুমাত্র গ্রাম্য কবিরাজের তাবিজ ও পানিপড়া। বোবারথল জনপদের ১০ গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সর্বোচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তির শিক্ষা দৌড় ছিল এইচএসসি পর্যন্ত। পরিবার পরিকল্পনা কী তা এখনও জানেন না এই ১০ গ্রামের প্রায় অর্ধেক মানুষ। প্রতিটি পরিবারে তাই শিশুদের ছড়াছড়ি। গ্রামের বাসিন্দাদের অর্থনৈতিক অবস্থা অথৈবচ। বর্তমান বাজারে একটি আনারসের মূল্য যেখানে ২৫ থেকে ৩০ টাকা সেখানে অত্যন্ত নাজুক যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে বোবারথল গ্রামের বাসিন্দাদের উত্পাদিত আনারস ওই গ্রামে বিক্রি হয় ২ টাকা থেকে ৩ টাকা। একটি কমলা বিক্রি হয় ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা। একটি কাঁঠাল পাওয়া যায় ৩ টাকা থেকে ৫ টাকায়। শাকসবজি পাওয়া যায় প্রায় পানির দামে। যা বর্তমান সময়ে দেশের কোনো স্থানেই কল্পনা করা যায় না। চরম অবহেলিত বোবারথল পাহাড়ি জনপদ যেন একটি অভিশপ্ত জনপদের নাম।

বড়লেখা উপজেলা সদর থেকে বোবারথল গ্রামে যেতে হলে ৮ কিলোমিটার পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হয়। আর এ পথে পেরোতে হবে ১২টি সুউচ্চ টিলা। যার প্রত্যেকটির উচ্চতা সমতল ভূমি থেকে ৩শ’ থেকে ৪শ’ ফুট। কোনো কোনো টিলা আবার একেবারে খাঁড়া। টিলার চূড়ায় ওঠতে একটু বেখেয়াল হলে ঘটতে পারে মারাত্মক দূর্ঘটনা। মাঝে-মধ্যে রয়েছে ঘন ঝোপঝাড়। এর ওপর রয়েছে বিষধর সাপ, বন বিড়াল, পাহাড়ি কুকুর, ভাল্লুক-উল্লুকসহ নানা জাতের হিংস্র বন্যপ্রাণীর উত্পাত। এতসব ঝক্কি-ঝামেলা নিয়ে বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে বোবারথল গ্রামের বাসিন্দারা পারতপক্ষে শহরের পথ মাড়ান না।

বোবারথল জনপদের প্রবীণ ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, ১৯৬৪ সালের পূর্বে বোবারথল দুর্গম পাহাড়ে মানুষের বসবাস সম্ভব তা ছিল কল্পনারও অতীত। ঘন জঙ্গলে পা পড়েনি কোনো মানুষের। বোবারথল ও এর আশেপাশের এলাকা ছিল বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এ পাহাড়ে যাতায়াতের কোনো পথ ছিল না। সেটি ছিল সমতল ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ। তবে অনেকে দাবি করেন ওই সময়ে বোবারথল পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু টিলার ওপরে পাকিস্তান ইপিআর ক্যাম্প ছিল। ক্যাম্পটির ইপিআর সদস্যদের খাবারসহ সবকিছু আনা-নেওয়া হতো হেলিকপ্টারের সাহায্যে। ইপিআর সদস্যদের শাস্তিমূলক বদলি করা হতো সড়ক যোগাযোগবিহীন বোবারথলে। আর হেলিকপ্টারের সাহায্যে তাদের সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করা হতো।

দুর্গম ও সড়ক যোগাযোগবিহীন বোবারথলে বসতি স্থাপন সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৬৪ সালে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে সংঘটিত হয় ভয়াবহ দাঙ্গা। সে দাঙ্গায় সর্বস্ব হারিয়ে কিছু ভারতীয় নাগরিক (মোহাজের) সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য বোবারথলে এসে আশ্রয় নেন। প্রথম বছরেই হিংস্র বন্যপ্রাণীর হামলায় বেশকিছু আশ্রয়গ্রহণকারী মারা যান। ওপাড়ে ভয়াবহ দাঙ্গা, এপাড়ে বন্যপ্রাণীর হামলা। তারপরও ভারতীয় নাগরিকরা শত দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে জীবনকে হাতে নিয়ে নিজ দেশে না ফিরে থেকে যান দুর্গম বোবারথলে। শুরু হয় তাদের আরেক সংগ্রামী জীবন। সভ্যতার আলো ও আধুনিক জীবনব্যবস্থা থেকে অনেক পিছিয়ে থাকা বোবারথলে এরইমধ্যে তাদের কেটে গেছে প্রায় ৬৫ বছর। সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাবিহীন বোবাথলের অনেক বাসিন্দা কোনোদিনই শহরের আলো ঝলমলে জীবন সচক্ষে প্রত্যক্ষ করতে পারেননি। গ্রামটির বাসিন্দাদের অসুখ-বিসুখে গ্রাম্য কবিরাজ ছাড়া কোনো উপায় নেই। আধুনিক ও প্রাথমিক চিকিত্সাসেবা ভাগ্যে ঝোটেনি অনেক বাসিন্দার। শুধুমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে তারা প্রায় অবরুদ্ধ জীবনযাপন করছেন।

মাত্র ৩ থেকে ৭ বছর পূর্বেও গ্রামটির অধিকাংশ বাসিন্দাই জানতেন না পরিবার-পরিকল্পনা কী। বছর বছর শিশু জন্মায় এমন পরিবার অসংখ্য। এমনও অনেক পরিবার আছে যে পরিবারে সদস্য সংখ্যা ১০-এর অধিক। গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বোবারথল গ্রামের কৃষক অলি মিয়ার পরিবার গ্রামের সবচেয়ে বড় পরিবার। অলি মিয়া-নুরজাহান দম্পত্তির বিয়ে প্রথম ১৬ বছরে জন্ম নিয়েছে ১১ শিশু। এ ব্যাপারে অলি মিয়ার ভাষ্য, ‘আল্লায় বাচ্চা দিলে আমরা কিতা (কি) করতাম (করবো)।’ বাচ্চা প্রসবকালে এক সময় ওই গ্রামের অনেক মহিলা মারা যেতেন। হূদরোগ, যক্ষ্মা, শ্বাসকষ্টসহ সব রোগের চিকিত্সক ছিলেন মাত্র ১ জন। সর্বরোগের চিকিত্সক সিরাজ আলী কবিরাজ। তার তাবিজ আর পানি পড়াই ছিল গ্রামটির বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা। সিরাজ আলী কবিরাজের পিতাও ছিলেন বোবারথল জনপদের সর্বরোগের চিকিত্সক। তিনি মারা যাওয়ার পর সিরাজ আলী কবিরাজ বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এ পেশায় আসেন। কিন্তু গত ৫ বছর যাবত্ এ অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বোবারথল জনপদের ১০টি গ্রামের জন্য সরকার ৪টি ইপিআই সেন্টার স্থাপন করেছে। গ্রামের ডাক্তার আপা ইপিআই কর্মী নাজমা বেগম গ্রামের মানুষকে তাবিজ-পানি পড়ার বিকল্প হিসেবে আধুনিক এলোপ্যাথিক ওষুধের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। স্বাস্থ্য সচেতনার সব বিষয়ে ‘ডাক্তার আপা’ গ্রামের বাসিন্দাদের সম্যক ধারণা দিয়েছেন। ডাক্তার আপা নাজমা বেগমের কার্যক্রমে প্রথমে গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে মৃদু আপত্তি ওঠে। অনেকেই প্রকাশ্যে ডাক্তার আপা নাজমা বেগমের বিরোধীতা করে বলেন, হারা (সারা) জীবন হামরা (আমরা) কবিরাজর (কবিরাজের) পানি পড়াত (পড়ায়) ভালা অইছি (হইছি)। অহন (এখন) ইতা (এসব) কিতা (কি) হুনি (শুনি)।’ কিন্তু আস্তে আস্তে তাদের ভুল ভাঙতে শুরু করেছে। গ্রামের বাসিন্দাদের প্রাথমিক চিকিত্সা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা চলছে দ্রুতগতিতে। সেইসঙ্গে চলছে শিশুদের ঠিকাদানসহ নানা কার্যক্রম।

১০টি পাহাড়ি গ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বোবারথল জনপদে চিত্ত বিনোদন ও খেলাধুলার কোনো ব্যবস্থা নেই। পুরো ১০ গ্রামজুড়ে টেলিভিশন রয়েছে মাত্র ৫টি। কয়েক বছর আগে ২টি সাদাকালো টেলিভিশন চলতো ব্যাটারির সাহায্যে। এগুলোও ছিল দুটি দোকানে। সে সময়ে প্রতিদিন বোবারথল বাজারে অবস্থিত আছিরদ্দিন মিয়ার চায়ের দোকান এবং ষাটঘরি গ্রামে আব্দুর রহমানের দোকানে টেলিভিশন দেখার জন্য ভিড় জমতো। দুটি দোকানে বিটিভির বাংলা সিনেমা জনপ্রতি ৩ টাকা, সাপ্তাহিক নাটক জনপ্রতি ২ টাকা, সিরিজ নাটক জনপ্রতি ১ টাকা হারে টিকেটের মাধ্যমে দেখতেন ১০ গ্রামের বাসিন্দারা। এখন কয়েকটি বাড়িতে এসেছে টেলিভিশন। সমগ্র বোবারথল জনপদের শিশুদের কাছে লাঠিম, দৌড়, মার্বেল, ডাংগুলি, হা-ডু-ডু, গোল্লাছুট, কানামাছি ইত্যাদি খেলাই তাদের অবসরের উপকরণ। সারাদিন হাঁড়ভাঙা খাটুনির পর বোবারথল জনপদের বাসিন্দারা আড্ডা মেরেই সময় পার করেন। বোবারথল জনপদের ১০ গ্রামের মধ্যে সর্বোচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি মো. আব্দুস শহীদ। উত্তর ষাটঘড়ি গ্রামের মতলিব মিয়ার পুত্র মো. আব্দুস শহীদ গ্রামের বাইরে গিয়ে সিলেট জেলার বিয়ানীবাজার উপজেলার একটি বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে বিয়ানীবাজার সরকারি কলেজ থেকে ১৯৮৪ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। বোবারথল জনপদে একটি মাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও সেখানে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল অপ্রতুল। ১০ গ্রামের বাসিন্দাদের শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করার কোনো পদক্ষেপ ছিল না। তখনকার সময়ে অনেক অভিভাবক মনে করতেন শিক্ষিত হয়ে কী হবে? গ্রামের কেউতো আর জজ ব্যারিস্টার হবে না। কাজ করেই খেতে হবে। তাই শিক্ষার দরকার নেই। কিন্তু এখন পরিস্থিতি অনেকটা পাল্টেছে। শিশুরা বিদ্যালয়মুখী হচ্ছে। তবে এর হার এখনও আশাপ্রদ নয়।

বোবারথন জনপদে একটি উচ্চ বিদ্যালয় রয়েছে। এটিরও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলছে কোনোমতে। কয়েকবার এ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ করা হলেও দুর্গম এ পাহাড়ি জনপদে কোনো শিক্ষক পাঠদানে যেতে রাজি হননি। শুধুমাত্র শিক্ষকের অভাবে প্রায় ১ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতল ভবন পড়ে রয়েছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।