বছর ঘুরলেই পাল্টে যায় দেয়ালে ঝুলে থাকা ক্যালেন্ডার। সময়ের পরিক্রমায় পারিপার্শ্বিক চিত্রের সাথে বদলে যাচ্ছে ক্যালেন্ডারের বাহার। বিশ্বে প্রতিটি সংস্কৃতি বা জাতির নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার থাকলেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইংরেজি বছরের ক্যালেন্ডারটি। এ বছর ইংরেজি সালের বয়স আরো এক বছর বেড়ে ২০১৯ থেকে ২০২০-এ পড়লো। চলুন, জেনে নেওয়া যাক সহস্র বছরের ইতিহাসে ক্যালেন্ডারের গল্পটি—
মোস্তাফিজ মিঠু
চন্দ্র-সূর্য হিসেব থেকে গণনা শুরু
মানুষ যেদিন বর্ষ গণনা করতে শিখলো সেদিন থেকে চাঁদের হিসেবের সাথে মিল রেখে শুরু করে বছর গোনা। এর অনেক পরে শুরু হয় সূর্যের হিসেবে বছর গোনা। সূর্য ও চন্দ্র গণনায় আবার পার্থক্য রয়েছে। সৌর গণনা ঋতুর সাথে সম্পর্কিত, আর অন্যদিকে চন্দ্র গণনা ঋতুর সাথে সম্পর্কিত নয়। এই হিসেবটি ঠিক কবে থেকে শুরু হয় সে সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য নেই। তবে বলা হয়, এই চন্দ্র-সূর্যের মধ্য দিয়ে একটি অলিখিত ক্যালেন্ডারের সূচনা হয়।
মিশরের সৌর ক্যালেন্ডার
সুমেরুয় সভ্যতা থেকে ক্যালেন্ডার তৈরির বিষয় শুরু হয় বলে ধারণা করা হয়। শুরু থেকেই মিশরবাসীরা হিসেব-নিকেশ থেকে শুরু করে জ্যোতিষ বিজ্ঞানের দিক থেকে ছিল এগিয়ে। আমরা যে সৌর ক্যালেন্ডারের বিষয়টি সম্পর্কে জানি এটি মিশর সভ্যতা থেকে প্রচলিত। মিশরের এই ক্যালেন্ডার আবিষ্কার নিয়ে বহু গবেষণাও হয়েছে। সেখান থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিস্টবছর শুরু হওয়ারও প্রায় ৪ হাজার বছর আগে থেকে মিশরীয়রা সৌর ক্যালেন্ডার ব্যবহার শুরু করে। মিশর সভ্যতা যে কত আগে আধুনিকতার চর্চা শুরু করে সেটি এখান থেকে বোঝা যায়।
রোমানদের ছিল ১০ মাসে বছর
সভ্যতার বেশিরভাগ উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার শুরু হয় ইউরোপ থেকে। যার মূলে ছিল গ্রিক ও রোমানরা। এই ক্যালেন্ডারের কাহিনিও তাদের হাত দিয়েই শুরু হয়। পরবর্তীতে ইউরোপের অন্যান্য অঞ্চলে এটি ছড়িয়ে পড়ে। আর এই জায়গায় রোমানদের চেয়ে গ্রিকরা ছিল এগিয়ে। গ্রিকদের কাছ থেকেই রোমানরা ক্যালেন্ডার পায়। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে রোমানরা তখন ১০ মাসে বছর হিসেব করতো। তার কারণ শীতের দু-মাস তারা বছর গণনার মাঝে ধরতো না। আমরা এখন যেমন জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ থেকে বছর গণনা শুরু করি তেমনি রোমানরা মার্চের ১ তারিখ থেকে নতুন বছর পালন করতো। সম্রাট রমুলেস ছিলেন রোমের প্রথম সম্রাট। তিনি খ্রিস্টপূর্ব ৭৩৮ থেকে ক্যালেন্ডার চালু করার চেষ্টা করেন।
রোমের একজন বিখ্যাত সম্রাট ছিলেন রমুলাস। তিনি ছিলেন রোমের প্রথম সম্রাট। তিনিই আনুমানিক ৭৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ক্যালেন্ডার চালু করার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে এই ১০ মাসের ক্যালেন্ডার চালু করা হয়। এরপর রোমান সম্রাট নুমা আরো দুটি মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি যুক্ত করেন। তিনিই জানুয়ারিকে বছরের প্রথম মাস হিসেবে যুক্ত করেন। কিন্তু হিসেব সেখানেও মিললো না। জানুয়ারি মাস ২৯ দিনে এবং ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনে। এমনকি এই ১২ মাসের বাইরে তিনি ‘মারসিডানাস’ নামে অতিরিক্ত একটি মাস যুক্ত করেন। মাসটি আবার ২২ দিনের। এই অতিরিক্ত মাসটি গণনা করা হতো ১ বছর পরপর ফেব্রুয়ারি মাসের ২৩ ও ২৪ তারিখের মাঝখানে। তবে এই হিসেবটি পরবর্তীতে পাল্টে ফেলা হয়। আমরা এখন যে লিপইয়ার পালন করি তার জন্ম রোমান থেকে।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডার
আমরা আজকে যে ক্যালেন্ডারের রূপটি দেখি তার শুরুটা রোমান থেকেই। যদিও পরবর্তীতে এর আরো আধুনিক রূপ পাওয়া যায়। কিন্তু মূল গঠনটি তৈরি করে দেয় রোমানরা। নতুন ক্যালেন্ডার চালু হয় রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের হাত ধরে। তিনি মিশরীয় ক্যালেন্ডার নিয়ে আসেন রোমে। আর সেখান থেকে নতুন ক্যালেন্ডারের সূচনা করেন। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ অব্দে জ্যোতির্বিদদের পরামর্শে নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসের মাঝখানে ৬৭ দিন এবং ফেব্রুয়ারি মাসের শেষে ২৩ দিনসহ মোট ৯০ দিন যুক্ত করে সংস্কার করা হয় নতুন ক্যালেন্ডার। পরবর্তীতে এ ক্যালেন্ডার পরিচিত হয় জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে মার্চ, মে, কুইন্টিলিস ও অক্টোবর মাসের দিন সংখ্যা ৩১ এবং জানুয়ারি ও সেক্সটিনিস মাসের সঙ্গে দু-দিন যুক্ত করে ৩১ দিন করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাস ২৮ দিনে গণনা হয়। এখানে যে মাসগুলোর কথা উল্লেখ করা হলো সেগুলো পরবর্তীতে পরিবর্তন করা হয়। এরমধ্যে জুলিয়াস সিজারের নামানুসারে প্রাচীন কুইন্টিলিস মাসের নাম বদলিয়ে রাখা হয় জুলাই। আরেক বিখ্যাত রোমান সম্রাট ছিলেন অগাস্টা। তার নামানুসারে সেক্সটিনিস মাসের নাম পাল্টিয়ে করা হয় আগস্ট।
খ্রিস্ট বা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার
আমরা ইংরেজি যে ক্যালেন্ডারটি অনুসরণ করি সেটি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার। এর শুরু হয় অনেক পরে। রোমের পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি জ্যোতির্বিদদের পরামর্শে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার সংশোধন করেন ১৫৮২ সালে। সেই বছর পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি প্রবর্তন করেন নতুন একটি ক্যালেন্ডার। তিনি হিসেব করে দেখেন, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে ১১ মিনিটের গরমিল রয়েছে। এই গরমিল সমাধানের জন্য গির্জার পক্ষ থেকে ১১ দিন যোগ করে প্রবর্তন করা হয় গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি, যা এখন আমরা অনুসরণ করি। কিন্তু এই ক্যালেন্ডার প্রচলন শুরু হওয়ার পর এ নিয়ে চলে অনেক দ্বন্দ্ব। বিশ্বের অনেকেই মনে করতে শুরু করে এটি ক্যাথলিকদের কোনো ষড়যন্ত্র। তবে ১৭৫২ সাল থেকে এই ক্যালেন্ডার ইউরোপের সব দেশ থেকে শুরু করে বিশ্বের অন্যান্য প্রভাবশালী দেশগুলোও অনুসরণ করতে থাকে। যার জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ে সারাবিশ্বে। যা এখন পর্যন্ত প্রচলিত।
