শিফারুল শেখ
পশ্চিমাদের কাছে চক্ষুশূল। মধ্যপ্রাচ্যে শিয়াদের কাছে একাধারে জেমস বন্ড, জার্মানির আরউইন রোমেল এবং লেডি গাগার সম্মিলিত এক চরিত্র। যুদ্ধ থেকে শুরু করে পররাষ্ট্রনীতি সবক্ষেত্রেই যার বিচরণ ছিল। বাইরের বিশ্বে ইরানের প্রভাব বিস্তারে যার মূল ভূমিকা ছিল তিনি কাসেম সোলেইমানি। ২০১৭ সালে টাইম ম্যাগাজিনের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় জায়গা করে নেওয়া ব্যক্তিটি যুদ্ধ ময়দানের ছবিতে, এমনকি মিউজিক ভিডিও আর অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। এসব তথ্য জানিয়েছেন মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএর সাবেক অ্যানালিস্ট কেনেথ পোলাক।
পোলাক লিখেছেন, ২০০১ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন হামলার সময় ইরানের ‘কুদস ফোর্সের’ নেতৃত্বে আসেন তিনি। বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে অংশ নিয়েছেন। ২০১৮ সালে ইরাকের সরকার গঠনেও ভূমিকা ছিল। ২০১৮ সালে এক জরিপে সোলেইমানির জনপ্রিয়তার হার ছিল ৮৩ ভাগ। তার চেয়ে পেছনে ছিলেন প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফও। যাকে হত্যার পরিণামের কথা চিন্তা করে পিছিয়ে এসেছিলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ, সেই সোলেইমানিকে হত্যা করলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইরান চরম প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সোলেইমানিকে হত্যায় দেশের রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হবে যুক্তরাষ্ট্র। অস্থির হবে মধ্যপ্রাচ্য।
g এখন হামলা কেন?
সাবেক মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পিজে ক্রাউলির মতে, বাগদাদে মার্কিন দূতাবাসে হামলার ঘটনা ট্রাম্প প্রশাসনকে চমকে দিয়েছিল। এজন্য সোলেইমানি দায়ী বলে তাদের বিশ্বাস। তাই তাকে টার্গেট হিসেবে পাওয়ায় প্রেসিডেন্ট হামলার অনুমোদন দিয়েছেন।
হার্ভাড কেনেডি স্কুলের বেলফার সেন্টার ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের সিনিয়র ফেলো উইলিয়াম টোবে মনে করেন, হামলার মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর সর্বোচ্চ চাপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। অর্থনৈতিক উত্তেজনা থেকে সামরিক উত্তেজনার পথ বেছে নিয়েছে তেহরান। প্রথমে তারা তেলের ট্যাংকার ও স্থাপনায় হামলা করেছে, পরবর্তীতে ঠিকাদারদের ওপরে। এছাড়া উত্তেজনা প্রশমনে তেহরানকে বাধ্য করা ও এই বার্তা দেওয়া যে, দেখো, এসব কাজ তোমাদের কোনো সুবিধা দেবে না। ইরান কোনো না কোনোভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। সামরিক হামলায় অনাগ্রহী ট্রাম্প পরিস্থিতি এড়াতে চেষ্টা করেছেন। সন্দেহ, তাকে অতীতেও এরকম হামলার কথা বলা হলেও তিনি সেটা বাতিল করেছেন। অবশেষে এই সপ্তাহে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, যথেষ্ট হয়েছে।
g ট্রাম্পের কৌশল কী?
ক্রাউলির মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটকৌশলে বিশেষভাবে দক্ষ নন। তিনি যেন মুহূর্তে বিশ্বাস করেন এবং তার অনুভূতি দ্বারা চালিত হন। অবাক লাগবে যদি তিনি পুরো ঘটনার পরে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে থাকেন। তার সামনে সম্ভবত ‘একজন খারাপ ব্যক্তিকে’ সরিয়ে দেওয়ার সুযোগ তুলে ধরা হয়েছে, যা বারাক ওবামা পাননি। তার সিদ্ধান্ত নিতে সম্ভবত এটাই শোনার দরকার ছিল। উইলিয়াম টোবে মনে করেন, ইরানের ওপর অনেক চাপ দেওয়া যাতে দেশটির সামনে আলোচনায় বসা এবং চুক্তিতে রাজি হওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তা খোলা না থাকে।
লুক কোফির মতে, ট্রাম্প নিজেকে বিরাট আলোচক হিসেবে মনে করেন এবং চুক্তিতে প্রধান ভূমিকা রাখতে চান। কিন্তু তিনি অনেকটা কোণঠাসা হয়ে গেছেন। কারণ ইরান তাদের দিক থেকেও চাপ দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে কেউ কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় না। তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা, তার হদিস বের করা, নজরদারি করা, সঠিক সুযোগ খুঁজে পাওয়া ইত্যাদি অনেক কিছু এর সঙ্গে জড়িত। সন্দেহ নেই যে ইরানিরা যদি একই রকম পরিস্থিতিতে আমেরিকান কাউকে পায়, তাহলে তারাও একই কাজ করবে। এটা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের একটা ডঙ্কা। তবে সেটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেবে না।
g ভবিষ্যতে কী ঘটতে পারে?
যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট নেতারাও মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা ও আরেকটি যুদ্ধের আশঙ্কা করছেন। ক্রাউলি বলছেন, ইরান হামলার জবাব দেওয়ার শপথ নিয়েছে। ইরানের পক্ষে অনেকেই পুরো অঞ্চল জুড়ে হামলা করার উত্স খুঁজবে। তারা আমেরিকার রাজনীতি ভালোই বোঝেন এবং ট্রাম্পের পুনরায় নির্বাচিত হওয়ার প্রধান চাবিকাঠি মার্কিন অর্থনীতি। সেটা বিনষ্ট করার সুযোগ থাকলে তারা তা করবে। উইলিয়াম টোবের মতে, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় হেরে ইরান সিদ্ধান্ত নিয়েছে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার। এর আগেও দেখা গেছে যে তেহরান বেশ বড়ো ধরনের ঝুঁকি নিয়েছে। সন্দেহ যে, তাদের সেই ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা আরো বাড়বে। আর লুক কোফি জানান, মনে হয় না যে ট্রাম্প রাজনীতিকে মাথায় রেখে এটা করেছেন। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে দেখতে গেলে এই হামলা তাকে তার সমর্থকদের মধ্যে আরো শক্তিশালী নেতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
g যুদ্ধে সুবিধা পাবেন ট্রাম্প!
জার্মানির ডয়চেভেলের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সিনেটে তার ইমপিচমেন্টের বিষয়টি আলোচনায় ওঠার কথা। এর আগে ইরাকে বিমান হামলায় জেনারেল কাসেম সোলেইমানিকে হত্যা করে নিজের দেশের সবার নজর অন্যদিকে ভালোভাবেই সরাতে পেরেছেন ট্রাম্প। সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও তার অভিশংসন চলার সময় ইরাকে হামলা করেছিলেন। ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা প্রত্যাশিতভাবেই অন্যায় হামলায় এলিট বাহিনীর প্রধানকে হত্যার বদলা নিতে চেয়েছেন। অন্যদিকে সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর টুইটার অ্যাকাউন্টে মার্কিন পতাকা শেয়ার করে একরকম আনন্দই প্রকাশ করেছেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ স্লোগানের মাধ্যমে উগ্রতা, বিভেদ আর ঔদ্ধত্যের প্রবক্তা হয়ে ওঠা ট্রাম্প। তিনি মার্কিন জাতীয়তাবাদকে আরো উসকে দিয়েছেন।
সৌদি আরব ও ইসরাইল খুশি! যুদ্ধে লাভ অস্ত্রবিক্রেতাদেরও। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে ইরান ও ইরাকের সাধারণ মানুষের। আশির দশকে প্রায় আট বছর নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করেছে। সেই যুদ্ধ শেষেও ইরাকের মানুষ বেশিদিন শান্তিতে থাকতে পারেনি। ২০০৩ সালের পর আট বছরের যুদ্ধে মেসোপটেমিয়া সভ্যতার দেশটি আজ বলতে গেলে একটা ধ্বংসস্তূপ। যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করছেন এমন বাংলাদেশিরা সংকটে পড়বেন। প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তো পড়বেই। প্রাক মধ্যযুগ, মধ্যযুগ, আধুনিক যুগ-যখন বিশ্বের যে প্রান্তে যত যুদ্ধ হয়েছে, তাতে আখেরে মানবতার ক্ষতিই হয়েছে।
