তালেব রানা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুক্রবার ইরাকের বাগদাদে বিমান হামলায় ইরানের প্রভাবশালী ও শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি বেড়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সৃষ্ট অস্থিরতায় সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেলের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হয়। তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি বেড়ে যায় তিন মার্কিন ডলার। গত সেপ্টেম্বরে সৌদি আরবের সরকারি তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর তেলের দাম এটিই সর্বোচ্চ।
আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইরানের দ্বিতীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে পালটা আঘাত করবে তেহরান। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক জন তিরমান সম্প্রতি আল-জাজিরাকে বলেন, বিভিন্ন উপায়ে জেনারেল সোলেইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ নিতে চাইবে ইরান। তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে না গেলে তাদের সমর্থক বিভিন্ন দেশের মিলিশিয়া বাহিনী দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে চাইবে। এছাড়া হরমুজ প্রণালিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে ইরান। সেক্ষেত্রে তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়বে।
এই জ্বালানি তেল বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি! তেলের সরবরাহ ঝুঁকিতে পড়লে দাম হু-হু করে বাড়বে। তেলের দাম বেড়ে গেলে জোর ধাক্কা খাবে বিশ্ব অর্থনীতি। মুখ থুবড়ে পড়বে বিকাশমান অর্থনীতির দেশগুলোর উন্নয়নও। ১৯৭৩ সালে যখন আরব রাষ্ট্রগুলো কিছু ধনী দেশের কাছে তেল বিক্রিতে অসম্মতি জানিয়েছিল, তখন মাত্র ছয় মাসে ব্যারেলপ্রতি দাম ৩ ডলার থেকে বেড়ে ১২ ডলারে গিয়ে ঠেকেছিল। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয়। ১৯৭৮, ১৯৯০ ও ২০০১ সালে তেলের দাম বাড়ার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিয়েছিল। অনেক অর্থনীতিবিদ বিশ্বাস করেন যে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পেছনেও আসলে তেলের রেকর্ড পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধি কাজ করেছিল। তাই তেল থাকলে সচল থাকে অর্থনীতিও। স্থিতিশীল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের তেলের অবাধ ও নির্বিঘ্ন সরবরাহ এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে এই অস্থিরতার বীজ বুনেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কে অবনতি হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে করা বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোর পরমাণু চুক্তি থেকে ২০১৮ সালে ট্রাম্প প্রশাসন বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক খারাপ হয়েছে। ইতিমধ্যে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে এনেছে ট্রাম্প সরকার। কোনো দেশ যাতে ইরান থেকে তেল কিনতে না পারে, সেজন্যও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইরান হুমকি দিয়ে আসছিল যে তাদের তেল রপ্তানি বন্ধ হলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেবে।
এই হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল যায় এশিয়া, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকাসহ অন্যান্য জায়গায়। হরমুজ প্রণালির একদিকে আছে আরব দেশগুলো। এসব দেশের মধ্যে আমেরিকার মিত্র দেশগুলো রয়েছে। হরমুজ প্রণালির অন্য পাশে রয়েছে ইরান। হরমুজ প্রণালির সবচেয়ে সংকীর্ণ যে অংশ, সেখানে ইরান ও ওমানের দূরত্ব মাত্র ২১ মাইল। পৃথিবীতে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল রপ্তানি হয়, তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ, অর্থাত্ প্রতিদিন ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। গত জুন থেকে মাত্র এক মাসের ব্যবধানে হুরমুজ প্রাণালিতে প্রায় ছয়টি তেল ট্যাংকারে হামলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ এই হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা হয়েছে। তবে ইরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এসব ঘটনায় তেলের দাম বেড়েছিল।
১৯৮০-র দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় ইরাক ও ইরান পরস্পরের তেল রপ্তানি বন্ধ করতে চেয়েছিল। তখন জ্বালানি তেল বহনকারী ২৪০টি তেলের ট্যাংকার আক্রান্ত হয়েছিল এবং ৫৫টি ডুবে গিয়েছিল। ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, তাহলে পৃথিবী জুড়ে জ্বালানি তেলের দাম বাড়বে। গুরুত্বপূর্ণ এই রুট বন্ধ হলে বিশ্ব তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দেবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিশ্বে তেলের চাহিদা পূরণে বড়ো ভূমিকা রাখছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। এসব দেশে অস্থিরতা, সংঘাত মানে নিশ্চিতভাবে বিশ্বের অর্থনীতিতে বড়ো ধাক্কা। তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যেকোনো সংঘাতের মূল্য শুধু দুই দেশকে নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও দিতে হবে। কারণ তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে পৌঁছায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
