ফ্রান্স বিক্ষোভ যেন পিছু ছাড়ছে না

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২০, ২১:২৪

প্রস্তাবিত পেনশন সংস্কারের বিরুদ্ধে চাঙ্গা আন্দোলন  g  অনমনীয় ম্যাক্রোঁ

 তৌহিদ আজিজ

 

ফ্রান্সে বিক্ষোভ যেন কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছে না। গত বছরও বিক্ষোভে উত্তাল               ছিল দেশটি। তার আগের বছরও জ্বালানি ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে হলুদ জ্যাকেটধারীদের আন্দোলন রাজপথ প্রকম্পিত করেছিল। এতে হতাহতের সংখ্যাও কম ছিল না। এবারও নতুন বছরের শুরুতে সেই বিক্ষোভ আবার চাঙা হয়ে উঠেছে। তবে এবারের বিক্ষোভ সরকারের পেনশন সংস্কার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। এর বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনও। গত কয়েক দশকের মধ্যে এটিই দেশটিতে সবচেয়ে বৃহত্তম আন্দোলন। শনিবার বিক্ষোভকারীরা তাদের এই আন্দোলন-সংগ্রামের ৩১তম দিন পার করল। বিভিন্ন মুখোশ পরে তারা এই বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, সরকার যে পেনশন সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে তা আপামর জনসাধারণের স্বার্থের পরিপন্থি। এটি পাশ হলে সাধারণ মানুষের কল্যাণের পরিবর্তে অকল্যাণই বয়ে আনবে। কিন্তু অনঢ় প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি এই পেনশন সংস্কার প্রকল্প পাশ করার জন্যই উঠেপড়ে লেগেছেন। ম্যাক্রোঁর এই অনমনীয় মনোভাবের কারণে ইউনিয়নগুলোও তাদের কর্মসূচি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। এরই মধ্যে সিজিটি সামনে আরো বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে। আগামী ৯ তারিখ দেশ জুড়ে বিক্ষোভের কর্মসূচি দেওয়া হয়েছে। এর আগে প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, এ ব্যাপারে বিক্ষোভকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসে একটা সমঝোতার মাধ্যমে এর সমাধান করা হবে। কিন্তু সেই অবস্থা থেকেও সরকার পিছু নিয়েছে। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয়ের পরিবর্তন আনা হবে না। কেননা সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে তারা কোন সমাজ ব্যবস্থায় বসবাস করছে। কোনো বিষয়কে হরহামেশা ব্যক্তিগত বিষয়ে রূপান্তর করলে চলবে না। এতে বলা হয়, যে বয়সেরই হোক না কেন একদিন তাদের অবসরে যেতে হবে। আর এটা বাস্তবতা। আর সরকারও অনন্যোপায় হয়ে কৃচ্ছ সাধন নীতি পালনে বাধ্য হচ্ছে। কারণ তাদের কাছে এর চেয়ে বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই। অন্যদিকে বিক্ষোভকারীরা বলছে, সরকারের প্রস্তাবিত পেনশন সংস্কার ব্যবস্থা পাশ হলে সমাজে একটা বড়ো ধরনের  অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। কাজেই নতুন এই সংস্কার প্রস্তাব থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে। অন্যথায় গোটা ফ্রান্সের রোষানলে পড়বে। নতুন সংস্কার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে শ্রমিক সংগঠনগুলো বলছে, এতে করে কর্মীদের আগের চেয়ে কর্মঘণ্টা বেড়ে যাবে। এছাড়া তাদের অবসর ভাতাও কমে যাবে। তাদের দাবি, আলাদা আলাদা প্রকল্পের পরিবর্তে সবার জন্য এক ও অভিন্ন একটি প্রকল্প নেওয়া হোক।

ফরাসি প্রেসিডেন্টের নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী অবসর ভাতা নির্ধারণ করা হবে দৈনিক কাজের ভিত্তিতে। অর্থাত্ সরকারি বা বেসরকারি খাতের কর্মীদের ‘আর্নিং পয়েন্টের’ ভিত্তিতে এই ভাতা ধরা হবে। এতে করে যারা তাড়াতাড়ি অবসরে যাওয়ার চিন্তা করবেন তাদের ভাতা কমে যাবে। আবার কেউ নির্ধারিত সময়ে গেলে তার ভাতা পাঁচ শতাংশ কমে যাবে। বর্তমানে সেখানে অবসরে যাওয়ার বয়স ৬২ বছর। বয়সের এই সীমা বাড়ানো হতে পারে বলেও কথাবার্তা চলছে। এতে করে কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক যে এর ফলে তাদের দীর্ঘদিন কাজ করতে বাধ্য করা হবে। তার ওপর আবার অবসর ভাতা দেওয়ার ক্ষেত্রে রয়েছে নানা নিয়মের জটিলতা। তবে সবাই যে ঢালাওভাবে এর বিরোধিতা করছে তা নয়, কিছু শ্রমিক সংগঠন এর পক্ষেও কথা বলছে। তবে তাদের সংখ্যা খুবই কম। এদিকে এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশটির বর্তমান পেনশন ঘাটতি ২০২৫ সাল নাগাদ ১ হাজার ৭২০ কোটি ইউরোতে দাঁড়াবে, যা দেশটির মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ১৪ শতাংশ। খাতটির এ অর্থ বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। আজ সোমবার নতুন বছরের প্রথম ক্যাবিনেট বৈঠকে বসবেন ম্যাক্রোঁ। পরদিন বিষয়টি নিয়ে শ্রমিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা হওয়ার কথা। তবে কোনো পক্ষই এ নিয়ে তেমন একটা ছাড় দিবে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। আর সেই বিষয়টি মাথায় রেখেই বৃহস্পতিবার নতুন করে ধর্মঘটের ডাক দেওয়া হয়েছে।