গ্রামীণ জীবন বদলে যাওয়ার জাদুরকাঠি

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৩০

কেরোসিনের কুপি, মেঠোপথের সেই গ্রামীণ চিত্র বদলে গেছে অনেকটাই। বিদ্যুত্ গ্রামীণ জীবনের পরিবর্তনে অবিস্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে। আর হাল-আমলে এসে শহরের সঙ্গে গ্রামের দূরত্ব দূর করার অন্যতম নিয়ামক হয়ে উঠেছে মোবাইলভিত্তিক লেনদেন প্রযুক্তি। কয়েকদিন আগে নিজ গ্রামে গিয়ে মোবাইল ব্যবহার করে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর এক অসাধারণ উদাহরণ খুঁজে পেলাম। আমাদের গ্রামের স্কুলের শিক্ষক পল্লী বিদ্যুতের বিল পরিশোধ করছেন বিকাশ দিয়ে। একটা ছোট্ট চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়ার সময় দেখলাম দোকানি নিজের পল্লী বিদ্যুত্ বিল পরিশোধ করছেন একইভাবে। পাশাপাশি আরো অনেককে বিল দিতে সাহায্য করছেন। পাশের বাড়ির স্কুলপড়ুয়া বোনটি তার মায়ের মোবাইল একাউন্ট থেকে কয়েক মুহূর্তেই বিল পরিশোধ করছে। ঢাকায় চাকরি করেন এমন একজন বাসিন্দা গ্রামে বসবাসরত পরিবারকে নিশ্চিন্ত রাখতে ঢাকা থেকেই গ্রামের বাড়ির বিদ্যুত্ বিল পরিশোধ করছে।

আমাদের গ্রামে প্রথম যখন পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ এলো তখন একধরনের উত্সবের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কেরোসিন বাতি নির্ভর জনগোষ্ঠির জীবনে এডিসনের আবিষ্কার বৈদ্যুতিক বাতি বাস্তবিকই আশীর্বাদ হয়ে এসেছিল। তবে মাসে দেড়শ’ থেকে দু’শ’ টাকা বিল দিতে পল্লী বিদ্যুত্ সমিতির অফিসে বা ব্যাংকে যেতে হতো। ফলে মাঝে মাঝে অনেক বাড়িতে বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকত। ছোট্ট এই যন্ত্র মোবাইল বিশাল লম্বা লাইন, স্থানিক দূরত্ব, যাওয়া-আসার বাড়তি খরচ আর ভোগান্তি দূর করে দিয়েছে এক নিমিষেই। এখন দিনে-রাতে যেকোনো সময় গ্রামের বাসিন্দারাও বিদ্যুত্ বিল পরিশোধ করতে পারছে মোবাইল আর্থিক সেবা থেকে।

শহরের জীবনে প্রযুক্তির আশীর্বাদে নানান ধরনের অ্যাপ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে। গ্রামে মোবাইলের মাধ্যমে পল্লী বিদ্যুত্ বিল পরিশোধের এই চিত্রে মনে হলো প্রযুক্তির সুবিধা নিতে গ্রামবাসীও পিছিয়ে নেই। গ্রাম আর শহরের ব্যবধান দূর করতে মোবাইলভিত্তিক লেনদেনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ নেই। বছর কয়েক আগেও আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছি তখন ফরম তোলা, টাকা জমা দেয়া, ফরম জমা দেওয়ার জন্য সারাদেশের ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের মত সময়, টাকা খরচ করতে হয়েছে। তবে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। আমাদের অনুজ যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে চায় তারা গ্রাম থেকেই অনলাইনে ফরম পূরণ করছে, বিকাশে টাকা জমা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে না গিয়েই প্রবেশপত্র হাতে পেয়ে যাচ্ছে।

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৩ সালে আমি যখন পড়া শুরু করেছি তখন টাকা পাঠাতে আমার কৃষক বাবাকে নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হতো তবে ক্ষুদ্র এই যন্ত্র মোবাইল সেই যন্ত্রণা লাঘব করে দিয়েছে। মোবাইল আর্থিক সেবা প্রসারের পর আব্বা টাকা পাঠান তার সুবিধা মত সময়ে কোনো ঝামেলা ছাড়াই। আমার মত এমন সারাদেশের অসংখ্য মানুষের টাকা পাঠানোর ঝামেলাকে প্রায় নির্মূল করে দিয়েছে বিকাশ, রকেটের মত সেবাগুলো। গ্রামের যেসব শিক্ষার্থী উপবৃত্তি পায়, যেসব বয়স্করা ভাতা পান তারাও এখন পাচ্ছে মোবাইল একাউন্টে। দরিদ্র এ শ্রেণির জন্য এই সহজ সমাধান স্বস্তি নিয়ে এসেছে। 

গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংকের লেনদেনগুলো এখন মোবাইলভিত্তিক লেনদেনের কল্যাণে বাস্তবিক অর্থেই মুঠোবন্দি। বিকাশে বিদ্যুত্ বিল দেওয়ার মত জমির খাজনাসহ গ্রামের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সব সার্বিক আর্থিক সেবা মোবাইলভিত্তিক হয়ে ওঠার দিন হয়ত খুব দূরে নয়। 

n লেখক :শিক্ষার্থী,

 বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়