গোপাল রায়
রাজশাহী রেল স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফরমের একটু এগোলেই দেখতে পাওয়া যাবে এক থুত্থুরে বুড়ি প্ল্যাটফরমের ধুলোবালিতে শুয়ে খাবারের জন্য আহাজারি করছে। ‘বাবারে বাবারে আমারে চাট্টা খাবার দে’! নাম তার সোনাবানু। বয়স প্রায় ৭২ পেরিয়ে গেছে। চোখে তেমন দেখতে পারে না। আর হ্যাঁ হাঁটতেও তেমন একটা পারেই না। কেননা ভিক্ষা করতে গিয়ে ট্রেন থেকে নামার সময় পড়ে গিয়ে দুটো পা-ই ভেঙে গেছে। আর বিধাতার কি নির্মম পরিহাস দেখুন, কোমরে আবার বিশাল কুঁজ। বয়সের ভার, শরীরের কাহিল অবস্থা নিয়ে সোনাবানুর দিন-রাত কাটে রাজশাহী রেল স্টেশনের ১ নম্বর প্ল্যাটফরমে। বিছানা নেই, ঘুমান প্ল্যাটফরমের ধুলোবালির মেঝেতে। চাদর নেই, শীত নিবারণের বস্ত্র নেই, প্ল্যাটফরমের চারদিকে খোলা থাকায় শীতের হু হু বাতাসে থুতনি কাঁপিয়েই দিনরাত পার করে সোনাবানু।
হায়রে পৃথিবী! ভালোমতো ভিক্ষা করতে পারেন না বলে এখন কোনোদিন একবেলাও মুখে খাবার জুটে না। একদিন, দুই দিন, তিন দিন না খেয়ে থাকা এখন তার নিত্যদিনের রুটিন হয়ে গেছে! সোনাবানুর কাছে যেতে না যেতেই ক্ষুধাভর্তি হূদয়ের সকল শক্তি দিয়ে আবার কেঁদে কেঁদে বলেন :‘বাবারে বাবারে আমারে চাট্টা খাবার দে....!! তিন দিন থেকে কিছুই খাইনি।’ এ তো গেল সোনাবানুর কথা। এবার সবুজ আলীর (১৪) কথায় আসা যাক। রাজশাহী রেল স্টেশনের ৩ নম্বর প্ল্যাটফরমে দেখা মেলে চলাফেরা করতে অচল সবুজ আলীর। সবুজ আলী এ পর্যন্ত জানেই না যে, কে তার বাবা আর কে তার মা। মো. কামালউদ্দীন (৪২) নামের একজন বলল, ‘সুবুজ পুতিবন্দি হওয়াতে ওর বাপ-মাও স্টেশনে থুইয়া চলি যায়; আর কোনো খোঁজখবর নেয় না’। তিনি আরো জানালেন সবুজ আলী প্রতিবন্ধী হওয়াতে ভালোমতো ভিক্ষাও করতে পারে না, তাই প্রায় দিনই না খেয়েই থাকে। কথা বলতে না পারায় কাউকে বলতেও পারে না খাবারের কথা। সেখানেই আরেকজনের দেখা মেলে। নাম আবুবক্কর সিদ্দিক। বয়স প্রায় ৫৮-র বেশি। এই বৃদ্ধ চোখে দেখতে পারেন না। বয়স বেশি হওয়াতে চলাফেরাও করতে পারে না। যার ফলে ভিক্ষার ঝুলিটাও সবসময় ফাঁকাই থাকে। খাবারের কথা বললে, কেঁদে কেঁদে বলে, প্রায় না খেয়েই থাকেন তিনি। সারা দিন-রাতের ভিতর কোনোদিন রাতে জুটল তো জুটল, না জুটলে নেই। না খেয়েই থাকতে হয়।
শুধু কি রাজশাহী রেল স্টেশন? না, শুধু রাজশাহী রেল স্টেশন নয়। বাংলাদেশের যে কোনো প্রান্তেই নিজ অজান্তেই এমন হাজারো মানুষের সন্ধান মিলবে একটু লক্ষ্য করলেই। এই সুবিধাবঞ্চিত হতদরিদ্র দুস্থ গরীব মানুষদের মাথা গোঁজার যেমন ঠাঁই নেই, ঠিক তেমনি কোনো না কোনো দিন মুখে জোটে না দুমুঠো খাবারও। এই বিশ্বের নাগরিক হয়েও না খেয়েই কেটে যায় তাদের দিন-রাত। অন্ন, বাসস্থান যেমনটি নেই, ঠিক তেমনি নেই গায়ের বস্ত্রও। আর চিকিত্সা? চিকিত্সা তাদের জীবনের এক অজানা শব্দ। মশাদের তাণ্ডব থেকে শীতের হু হু করা ঠান্ডার প্রকোপ থেকেও রক্ষা পায় না এরা। তাদের জীবনের গতিধারা এক অনন্য জীবিকায় অতিবাহিত হয়। যা অন্য ১০ জনের মতো স্বাভাবিক নয়। তবে জনসাধারণ বা কর্তৃপক্ষ একটু খেয়াল করলেই এমন হাজারো বঞ্চিত মানুষের মুখে যেমন চড়বে অন্ন, তেমনি মিলবে বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিত্সা।
n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
