আমার বয়স যখন মাত্র ১৮ বয়স ২ মাস, তখন আমার একটি নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ আসে। নির্বাচনটি ছিল ইউনিয়ন পরিষদের উপ-নির্বাচন। জীবনের প্রথম ভোট দেওয়ার মজাই আলাদা ভেবে পাঞ্জাবি পরিধান করে ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত হলাম। কিন্তু মুহূর্তেই পরিস্থিতি খারাপ হয়ে গেল। আমি যে কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করব, সেখানে পক্ষ-বিপক্ষে গণ্ডগোল লেগে গেল। দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে কয়েকজন আহত হলো। তত্ক্ষণাত্ গাড়ি ভর্তি পুলিশ-প্রশাসন আসতে লাগলো।
যাই হোক, পরিস্থিতি ঠান্ডা হওয়ার পর ভোট প্রদানের লাইনে দাঁড়ালাম। এলাকার পরিচিত অনেকেই আমাকে দেখে অবাক যে আমিও ভোট দিচ্ছি!
আমি মনে করি, ‘নির্বাচন’ শব্দটার সাথে ‘জনগণের উন্নয়ন’ শব্দটা ওতপ্রতোভাবে জড়িত। নির্বাচন আসলেই জনগণ উন্নয়নের ফাঁক-ফোকর খোঁজে। প্রার্থীরা ভোট চাইতে গেলে, ভোটাররা তাদের দাবি-দাওয়াসমূহ পেশ করে। জনপ্রতিনিধিরাও ভোট ও সমর্থন পাওয়ার জন্য উন্নয়নের আশ্বাস দেয়। সর্বাংশে তা বাস্তবায়ন হয় না বলে জনগণকে হতাশ ও বিভক্ত হতে হয়। এবং একই কারণে প্রতিটি নির্বাচনে জনগণ নতুন প্রার্থীদের প্রতি আকৃষ্ট হয়। বিপরীতটাও হয়। বিগত যে প্রতিনিধি সত্যিকার অর্থে জনগণের জন্য নিবেদিত থাকেন, সে এলাকায় তার প্রতিদ্বন্দ্বী মেলানো কষ্টকর। এবং এমন নেতার গুনগান দেশব্যাপী সমাদৃত। কিন্তু বর্তমানে ‘মারিং-লুটিং’ নির্বাচনিক পরিবেশে সত্, যোগ্য ও আদর্শ নেতা খুঁজে পাওয়া বড়ই মুশকিল বলে আমার মনে হয়। জনগণের বিপরীতমুখী আচরণে সত্, যোগ্যরাও ভরসা পায় না। তাই নির্বাচন আসলে বাধ্য হয়েই টাকা দিয়ে ভোট কিনতে নেমে পড়ে। কথা হলো, এই ধারণার বিলুপ্তি না ঘটলে দেশে হাজার হাজার সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন কখনও সাধিত হবে না।
বাংলাদেশে ঘন ঘন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কখনও জাতীয় নির্বাচন, কখনও সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। আর উপ-নির্বাচন তো লেগেই থাকে! সকল নির্বাচনই দেশের মানুষের উপর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাব ফেলে। তবে জাতীয় নির্বাচন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। এই প্রভাব আন্তর্জাতিক মহল পর্যন্ত গড়ায়। জাতীয় নির্বাচনে প্রত্যেকেই প্রত্যাশা করে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। ক্ষমতাসীনরা বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে। আর পরাজিত বা বিরোধীরা বলেন, ভোট ডাকাতি, ভোট কেনাবেচা ও জোরপূর্বক ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিকালে আমার প্রশ্ন, নির্বাচন পরবর্তীতে এই ধরনের অভিযোগ কতটা যুক্তিযুক্ত? সব সরকারের আমলেই কমবেশি এমনটা হয়। তাহলে আমরা কোন যুক্তিটাকে প্রাধান্য দিবো? বলতে পারেন, আপনি কী নির্বাচন বিষয়ে অবগত ছিলেন না? আসলে বিষয়টি তা নয়। আমাদের দেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে বাকবিতণ্ডার কোনো শেষ নেই। প্রতিটি নির্বাচনই যেন প্রশ্নমুখী হয়ে যায়। প্রশ্নমুখী নির্বাচনের কোনো গুরুত্ব থাকে না। নির্বাচন পরিচালনাকারীদের দোষারোপ করা হয়। আসল কথা হলো, বিতর্কিত নির্বাচনের ফলাফল কখনোই শুভ হয় না। জনগণের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই দেশে বিতর্কিত নির্বাচন সর্বদা পরিহারযোগ্য বলে আমি মনে করি।
গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে সময়মতো ও সংবিধানের আলোকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক, এমনটা প্রত্যাশা। যেকোনো নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নাশকতা, ভাংচুর কিংবা অযথা মামলা-মোকদ্দমা কাম্য নয়। নির্বাচনী সকল বিধিবিধান গ্রাহ্য করেই প্রার্থীদের ভোট যুদ্ধে আসা প্রয়োজন। জনগণের ভোট কিনে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে যারা নির্বাচনে আসবে, তাদেরকে বয়কট করা বাঞ্ছনীয়। জাতীয় নির্বাচনের কথা বলি আর ছোটো-খাটো যে কোনো নির্বাচনের কথাই বলি, জনগণকে প্রার্থী নির্বাচনে সত্ হতে হবে। ভোট বিক্রি করে জনপ্রতিনিধির কাছে উন্নয়ন প্রত্যাশা বড্ড বোকামি। সত্, যোগ্য ও আদর্শ নেতা খুঁজে প্রার্থীতা দিলে দল, মত, নির্বিশেষের জন্য তিনি উপকারে আসবেন, সত্য। দেশে নানা রাজনৈতিক দল থাকবে, নানা মতভেদ থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে এবং এসবের মধ্যে থেকে জনগণকে যোগ্য নেতাকে নির্বাচিত করে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন ও জনগণের অধিকার আদায় করে নিতে হবে। একজন ভোটার তার ইচ্ছামত রাজনৈতিক দলকে সমর্থন করতে পারে। তবে এটা বিবেচনায় আনতে হবে, সমর্থিত রাজনৈতিক দল দেশ ও দেশের জনগণের জন্য কতটুকু নিবেদিত ছিল এবং থাকবে। সর্বোপরি, সাধারণ জনগণ যদি নিরপেক্ষতার মাপকাঠিতে দল সমর্থন করে জনপ্রতিনিধি বাছাই করে, তাহলে সকলের ভাগ্যোন্নয়ন শতভাগ নিশ্চিত হবে। তাই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জিতুক, কিংবা বিএনপির প্রার্থী জিতুক কিংবা অন্য কোনো দল জিতুক না কেন সর্বপ্রথম জনগণ যেন জিততে পারে সেটাই হোক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রাসঙ্গিক ভাবনার উপজীব্য বিষয়।
n লেখক: বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউবিটি), ঢাকা।
