বর্তমান কিশোর-তরুণদের একটি অংশ নিজেকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে ডুবে থাকছে একাকিত্বে। ফলে আক্রান্ত হচ্ছে বিষণ্নতা নামক মারাত্মক ব্যাধিতে। গেল বছরের ১১ নভেম্বর আত্মহত্যা করে স্কুলছাত্রী ঐশী। মেয়ের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু নিয়ে ফেসবুকে এক হূদয়বিদারক স্ট্যাটাস দেন ঐশীর বাবা আহমেদ রাশিদ জয়। স্ট্যাটাসটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয় এবং যা বিষণ্নতা নিয়ে আমাদের ভাবতে বাধ্য করে নতুনভাবে। যখন তরুণদের বিশ্বজয়ের কথা, তখন কেন তারা বিষণ্নতায় ভোগে? কী এর প্রতিকার? আমাদের এবারের আয়োজনে বিষণ্নতার কারণ ও প্রতিকার নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত জেনে লিখেছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার
বর্তমান তারুণ্য নানা সৃজনশীলতায় ব্যস্ত থাকলেও তাদেরই একটা বড়ো অংশ ভুগছে বিষণ্নতায়। তারুণ্যের যে উচ্ছ্বাস একসময় যুদ্ধে যাওয়ার প্রেরণা ছিল, এই প্রজন্মের সেই উচ্ছ্বাসে মাতার বয়সটাই দখল করে নিয়েছে বিষণ্নতা নামক ব্যাধি।
বিশেষজ্ঞেরা বলেন, আত্মহত্যার পেছনের কারণ বিষণ্নতা, আবার এই বিষণ্নতাই কাউকে করে দেয় বিশৃঙ্খল। ফলে জন্ম নেয় সহিংসতার ঘটনা, উগ্রবাদ, মাদকাসক্তি বা বিভিন্ন নেতিবাচক কর্মকাণ্ড। কেন এই ব্যাধি? কেনই-বা এই সমস্যায় ভুগছে তারা? একই সঙ্গে উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে কিশোর-তরুণদের আত্মহত্যার প্রবণতা।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের এক জরিপ অনুযায়ী, যারা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে রয়েছে, তাদের মূল সমস্যা—বিষণ্নতা। বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা ও নির্যাতন, পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, অভাব-অনটন বিষণ্নতার কারণ। আর ঝুঁকিতে থাকা এই মানুষদের বড়ো অংশ তরুণ। মনোশিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক ডা. মোহিত কামাল বলেন, ‘তরুণ-তরুণীদের বিষণ্নতার কারণ হিসেবে চিহ্নিত—প্রেমে ব্যর্থতা বা প্রতারিত হওয়া এবং যৌন হয়রানির শিকার হওয়া। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের বহুল ব্যবহারও এমন ঘটনা ঘটাতে ভূমিকা রাখছে। পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর পরিবারের ভর্ত্সনার কারণে বিষণ্ন হয়ে পড়ে অনেক কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণী। কেউ কেউ বিষণ্ন হন একাকিত্বের কারণে, বা প্রত্যাশিত চাকরি না পেয়ে। স্কুলপড়ুয়া অনেক কিশোর-কিশোরীই আজকাল অতিরিক্ত চাপ সইতে পারে না। ফলে তাদের মধ্যে একপ্রকার বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়, আর এতে করে তাদের অনেকেই নিজেকে ধ্বংস করার জন্য উপায় খুঁজতে থাকে। কেউ কেউ মাদককে সঙ্গী হিসেবে বেছে নেয়। তবে সময়মতো কাউন্সিলিং করলে এ সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা যায়।’
বিষণ্নতার কারণে আত্মহত্যা করা ঐশীর বাবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করে লিখেছেন, তার মেয়েকে চিকিত্সকের দেওয়া ওষুধের মাত্রা ঠিক ছিল না, যা তার মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি করেছে। এমন অ্যান্টি-ডিপ্রেশন ড্রাগ আজকাল অনেকেই সেবন করছে। যদিও না করাই উত্তম, তারপরও যদি সেবন করতেই হয় অবশ্যই আগে ডাক্তারকে জিজ্ঞাসা করবেন, এই ওষুধ কেন দিচ্ছেন? এটা না খেলে কী হবে? খেলে কী সাইড এফেক্ট হবে? কতদিন খাবেন? এবং অবশ্যই ওষুধের প্যাকেটে থাকা লিফলেট পড়বেন। হলিফ্যামিলি রেডক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডা. সালমা ইয়াসমিন বলেন, ‘খুব অল্প বয়সেই এমনটা হওয়ার কারণ পারিপার্শ্বিক চাপ। স্কুলপড়ুয়া মেয়ে প্রতিদিন ভারী ব্যাগ কাঁধে নিয়ে প্রাইভেট টিউটরের কাছে ছুটছে। অবসরের ফুরসত নেই, নেই বিনোদন। পরীক্ষায় খারাপ করেছে? পাশের বাসার আন্টির কটুক্তি শুনতে হবে। বাবা-মা বকা দেবে। ফলে এইটুকু বয়সেই তারা বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করে। অনেকেই আছে যারা ছোটবেলা থেকে অন্তর্মুখী বা ইন্ট্রোভার্ট, সহজে কারোর সঙ্গে মিশতে পারে না। দেখা গেল স্কুলে বন্ধুরা খেলায় নিচ্ছে না, আড্ডায় যোগ দিতে পারছে না, এই বিষয়টিও একসময় তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। এদের জন্য বাড়তি যত্ন প্রয়োজন হয়।’
বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থী জুবায়ের আহম্মেদ বললেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাইকোলজিস্ট ও বিনামূল্যে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা রাখতে হবে, যেন যেকোনো মানসিক সমস্যা মোকাবিলায় শিক্ষার্থীরা সহায়তা নিতে পারে।’ প্রায় একই কথা বললেন সদ্য সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়া তরুণ চিকিত্সক ডা. ইসরাত জাহান। তিনি বললেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাউন্সিলিং ইউনিট রাখার পাশাপাশি ছেলেমেয়েদের উত্সাহ দিতে হবে, যেন তারা পরিবারের বড়োদের সঙ্গে আন্তরিক সম্পর্কে গড়ে তোলে, যেকোনো কথা শেয়ার করতে পারে। পরিবারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক থাকলে হতাশা তৈরি হবে না।’
হতাশা ও বিষণ্নতাজাত আরেক ভয়াবহ সমস্যা হলো মাদক। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশের পঞ্চাশভাগ তরুণ নানা রকম নেশায় আসক্ত। মাদকদ্রব্য ক্রেতাদের বেশির ভাগই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যারা এসব ব্যবসায়ীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে। পর্যায়ক্রমে ওই শিক্ষার্থীরা বন্ধুবান্ধবদেরও মাদক নিতে প্ররোচিত করে, এভাবে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে নেটওয়ার্ক। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক ও সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর তাসনুভা হক বলেন, ‘এখনকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে চাপ নেওয়ার ক্ষমতা একেবারেই কমে যাচ্ছে। সব সময় সবকিছু প্রত্যাশা অনুযায়ী হয় না, এ বিষয়টিও তারা সহজে মেনে নিতে পারে না। এ ছাড়া তারা সারাক্ষণ স্মার্টফোন বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকছে, সেখানে অন্য এক জগত্ তৈরি করে নেওয়ায় দূরত্ব বাড়ছে বাস্তব জগতের চারপাশের মানুষদের থেকে। নিজেকে একটা গণ্ডিতে আবদ্দ করে ফেলার ফলে অন্যের হাসিমুখ দেখেও তারা দুঃখ অনুভব করে, বিষণ্ন বোধ করে।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারহানা জামান বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখনো মানসিক রোগ বা রোগীর চিকিত্সার বিষয়টি সেভাবে প্রচলিত হয়নি। বিভিন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে যে কেউই ‘স্ট্রেসড’ হতে পারেন, মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারেন। সেক্ষেত্রে অন্যদের দায়িত্ব হলো তা থেকে তাকে মুক্ত হওয়ার উপায় দেখানো। আমরা তা করি না, বরং ‘কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা’ দেওয়ার প্রবণতা আছে আমাদের মধ্যে।’
কিছু তরুণ বোঝেন না, জীবনে নানা ঘাত-প্রতিঘাত আসতেই পারে। সেসবকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবিলা করাই জীবন। বিষণ্নতাকে মোকাবিলা করতে হবে। পরিবারের কারোর বিষণ্নতায় ভোগার ব্যাপার চিহ্নিত করলে সময়মতো চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়া ও কাউন্সিলিং করানোর ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। পরীক্ষায় ফল ভালো না করলে সন্তানের উপর চাপ সৃষ্টি না করে তাকে আবার দ্বিগুণ উত্সাহ দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। সাধারণত যেসব কারণে বিষণ্নতা তৈরি হয়, তা থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, তবেই ফিরবে কৈশোর ও তারুণ্যের উচ্ছ্বাস।
মডেল :নিশি, ছবি : তন্ময় মির্জা
