আটকে গেল বিএনপির ১৩ প্রার্থীর নির্বাচন

আপডেট : ২০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:৩৫

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অন্তত ১৩ জন প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ আটকে গেছে। পৃথক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার এবং এর আগে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট এসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র স্থগিত করার আদেশ দিয়েছেন।

এদিকে, বিএনপির আরো ৯জন প্রার্থী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। অবশ্য বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেছেন, ১৪ জন প্রার্থী কারাগারে। এর বাইরে ধানের শীষ প্রতীকে জামায়াতের ২২ জন প্রার্থীর নির্বাচনে অংশ নিতে পারা না পারার বিষয়টি নির্ভর করছে আদালত ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের ওপর। জামায়াতের এই ২২ প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল প্রশ্নে হাইকোর্টের দেওয়া রুলের বিষয়ে আগামী সোমবারের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে গতকাল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ।

বিএনপির যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ হারালেন— ঢাকা-১ (দোহার-নবাবগঞ্জ) আসনে খন্দকার আবু আশফাক, ঢাকা-২০ (ধামরাই) আসনে মো. তমিজউদ্দিন, জামালপুর-১ আসনে রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, মানিকগঞ্জ-৩ আসনে আফরোজা খানম রীতা, সিলেট-২ (বালাগঞ্জ) আসনে তাহসীনা রুশদীর লুনা, দিনাজপুর-৩ আসনে সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলম, চাঁদপুর-৪ আসনে আব্দুল হান্নান, রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দূর্গাপুর) আসনে নাদিম মোস্তফা, জামালপুর-৪ আসনে ফরিদুল কবির তালুকদার, ঝিনাইদহ-২ আসনে মো. আব্দুল মজিদ, ব্রাক্ষণবাড়িয়া-৪ আসনে মো. মুসলিমউদ্দিন, রাজশাহী-৬ আসনে আবু সাইদ চান ও জয়পুরহাট-১ আসনে ফজলুর রহমান। এই আসনগুলোর মধ্যে আটটিতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট কিংবা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক অন্য কোনো দলেরও কোনো প্রার্থী নেই। এই আটটি আসন হলো— ঢাকা-১, ঢাকা-২০, বগুড়া-৭, চাঁদপুর-৪, জামালপুর-৪, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪, ময়মনসিংহ-৮ ও রাজশাহী-৬। বিএনপি ওই আসনগুলোতে পুন:তফসিলের দাবি জানিয়েছে।

প্রার্থীদের প্রার্থিতা হারানোর পেছনে দ্লিত হওয়া, ঋণ খেলাপি এবং পৌর-মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করলেও তা গৃহীত না হওয়া এবং চাকরি থেকে অবসরের পর তিন বছর অতিবাহিত না হওয়ার কারণ ছিল উল্লেখযোগ্য।

দলের প্রার্থীদের প্রার্থিতা স্থগিত বা বাতিলের বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল বলেছেন, বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগে থেকেই এ নির্বাচন নিয়ে যে পূর্বাভাস দিয়েছিল, এখন সব একে একে ফুটে উঠছে। যতই ধানের শীষের পক্ষে জোয়ার উঠছে, ততই সরকার নতুন নতুন চক্রান্ত করছে। বিএনপির অনেক প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করেছে। এক্ষেত্রে সরকার আদালতকে ব্যবহার করছে। কিন্তু এরপরও আমরা দমে যাইনি। এখন আবার নতুন করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি সংলাপে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, তফসিল ঘোষণার পর আর কাউকে গ্রেফতার করা হবে না। কিন্তু তিনি তার কথা রাখেননি।

মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও এখানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিক গণফোরামের মফিজুল ইসলাম খান প্রার্থী আছেন। তিনি এই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। রাজশাহী-৫ আসনের বিএনপির নাদিম মোস্তফার প্রতীক বরাদ্দ বাতিল হলেও দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন থেকে বাদ পড়া নজরুল ইসলামকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দের নির্দেশ দেওয়ায় সেখানে বিএনপির প্রার্থী আছেন।

এদিকে, হাইকোর্ট গতকাল বিএনপির চার প্রার্থীকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দিতে ইসিকে নির্দেশ দিয়েছে। এর ফলে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মানিকগঞ্জ-১ আসনে এস এ জিন্নাহ কবিরের পরিবর্তে খন্দকার আব্দুল হামিদ ডাবলু, নাটোর-১ আসনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মঞ্জুরুল ইসলাম বিমলের পরিবর্তে কামরুন্নাহার শিরিন, বগুড়া-৩ আসনে আব্দুল মুহিত তালুকদারের প্রার্থিতা বাতিল করে ওই আসনে মাসুদা মমিনকে এবং নওগাঁ-১ আসনে সালেক চৌধুরীকে ধানের শীষ প্রতীক দিতে বলা হয়েছে।

বিএনপির পাঁচ প্রার্থীসহ সাতজনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নেওয়া সিদ্ধান্ত গতকাল স্থগিত করে হাইকোর্ট। একইসঙ্গে ওই সিদ্ধান্ত কেন বাতিল করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে আদালত। বিচারপতি জেবিএম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের অবকাশকালীন ডিভিশন বেঞ্চ গতকাল এই আদেশ দেন। হাইকোর্টের এই আদেশের ফলে বিএনপির পাঁচ প্রার্থীর সঙ্গে রংপুর-১ আসনে মো. আসাদুজ্জামান ও ময়মনসিংহ-৮ আসনে মাহমুদ হাসান সুমন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারছেন না। এই দু’জন আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটে অংশ নিয়েছিলেন। এর আগে স্বতন্ত্র প্রার্থী বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাহজানপুর) আসনে মোরশেদ মিল্টন ও সরকার বাদল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ হারান।

গতকালের আদেশের ব্যাপারে আইনজীবীরা জানান, সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে বিএনপির পাঁচজনসহ সাতজন প্রার্থী উপজেলা চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। কিন্তু পদত্যাগপত্র গৃহীত না হওয়ায় তাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করে রিটার্নিং অফিসার। এর বিরুদ্ধে আপিল করলে ইসি তাদের প্রার্থিতা ফিরিয়ে দেয়। ইসির এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন সংশ্লিষ্ট আসনের মহাজোটের সাত প্রার্থী। আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু।

আদালতের রায়ে যেই আটটি আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী শূন্য হয়ে গেছে সেসব আসনে পুনঃ তফসিল ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান গতকাল নির্বাচন কমিশনে গিয়ে এই দাবি জানান। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন,  এই অবস্থায় আমরা নির্বাচন কমিশনের কাছে দুটি প্রস্তাব করেছি। প্রথমত, আমাদের যে আটটি আসনে আদালতের রায়ে প্রার্থীশূন্য হয়ে গেছে, সেসব আসনে পুনঃতফসিল দেওয়া হোক অথবা আমাদের অন্য যে বৈধ প্রার্থী ছিলেন, তাদের মধ্য থেকে প্রার্থিতা দেওয়া হোক। নির্বাচন কমিশন আমাদের বক্তব্য শুনে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানিয়েছে।

এদিকে, বিএনপির যেই ৯জন প্রার্থী বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন তাদের মধ্যে ছয়জনকে তফসিল ঘোষণার পর গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকি তিনজন আগে থেকেই কারাগারে। এছাড়া পুরনো মামলায় গ্রেফতারের ভয়ে আত্মগোপনে থেকেও নির্বাচন করছেন বিএনপিসহ ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের কয়েকজন প্রার্থী।

সর্বশেষ বুধবার কুষ্টিয়া-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। উচ্চ আদালতের আদেশে জামিনে থাকা এই প্রার্থী কুষ্টিয়ার অবকাশকালীন আদালতে জামিন নিতে গেলে জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। এর আগে তফসিল ঘোষণার পর নরসিংদী-১ আসনের খায়রুল কবির খোকন, গাজীপুর-১ আসনের ফজলুল হক মিলন, চট্টগ্রাম-৯ আসনের শাহাদাত হোসেন, কুমিল্লা-৬ আসনের মনিরুল হক চৌধুরী ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের গাজী নজরুল ইসলাম পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। এদের মধ্যে গাজী নজরুল জামায়াত নেতা, বাকিরা বিএনপি দলীয় প্রার্থী। এছাড়া নির্বাচনী প্রচারণার সময় ঢাকা-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আবু আশফাককে আটক করা হলেও চার ঘণ্টা পর তকে ছেড়ে দেয় পুলিশ।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার  কিছুদিন আগে গ্রেফতার হন মাগুরা-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী মনোয়ার হোসেন, রাজশাহী-৩ আসনের আবু সাঈদ চান ও টাঙ্গাইল-২ আসনের প্রার্থী সুলতান সালাহউদ্দিন টুকু। প্রার্থী কারাগারে থাকায় এসব আসনে তাদের পক্ষে ঠিকমতো প্রচার কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি করেছে বিএনপি।

গত মঙ্গলবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় আসামি হয়েছেন কুষ্টিয়া-৪ (কুমারখালী-খোকসা) আসনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী। এরপর থেকে তিনি পলাতক। হবিগঞ্জ-১ আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী রেজা কিবরিয়া নিজ বাড়িতে এসে ঘেরাওয়ের মুখে পড়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। বুধবার এলাকায় ফিরে তিনি আবারও হামলার মুখে পড়েন। ভোলা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ নিজ বাড়িতে কয়েকদিন ধরে গৃহবন্দি হয়ে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন। ঢাকা-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী সালাউদ্দিন আহমদ প্রচারণায় নেমে কয়েক দফায় হামলার মুখে পড়ে অভিযোগ করেছেন, তিনি এখন নিজের জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কুষ্টিয়া-২ আসনে ধানের শীষ মার্কায় ২০ দল শরিক জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) প্রার্থী আহসান হাবীব লিংকন অভিযোগ করেছেন, তার বাড়িতে মঙ্গলবার হামলা হয়েছে। ফলে তিনি ও তার কর্মীরা নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন।