আর মাত্র ৮ দিন পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তীব্র শীতের মধ্যেও সারাদেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে প্রার্থীরা সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত বিরামহীন প্রচারণা চালাচ্ছেন। নিজ নিজ এলাকায় গণসংযোগে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত করছেন। তবে এবার আওয়ামী লীগের ডিজিটাল প্রচারণা ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। রাজধানীর পাড়া-মহল্লায় গানে গানে নৌকায় ভোট প্রার্থনা করা হচ্ছে। এটি ভোটারদের আকৃষ্ট করছে। পথে পথে মাইকে ভেসে আসছে চেনা-অচেনা শিল্পীর কণ্ঠে শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের কথা। পাড়া-মহল্লায় প্রার্থীদের নির্বাচনী অফিসগুলোতেও অবিরাম বেজে চলেছে নৌকা মার্কায় ভোট চাওয়ার গান। মাঝে-মধ্যে বাজানো হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের গানও। বিশেষ করে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীদের সেইসব কালজয়ী গান-যে গানে মুক্তিযোদ্ধারা উদ্দীপ্ত হতেন রণক্ষেত্রে। আবার ট্রাকে করে ঢোল-বাদ্য নিয়ে বাউল শিল্পীরা নৌকার পক্ষে গান গেয়ে ভোট প্রার্থনা করছেন।
এদিকে নির্বাচনী প্রচারণার অংশ হিসেবে আজ শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর গুলশান-২ নম্বরে ইয়ুথ ক্লাব মাঠে আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় বক্তব্য রাখবেন দলের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাজধানীতে এটা প্রধানমন্ত্রীর প্রথম জনসভা। আগামী ২৪ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় কামরাঙ্গীর চর মাঠে প্রধানমন্ত্রীর আরেকটি জনসভা অনুষ্ঠিত হবে।
সরেজমিন ঢাকার ১৫টি আসনের অনেক জায়গায় ঘুরে গানে গানে ভোটের প্রচার চোখে পড়েছে। ভোটের গানে শেখ হাসিনা সরকারের বড় বড় উন্নয়নের কথা উঠে এসেছে। বিশেষ করে পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র, খাদ্য নিরাপত্তা, নারীর ক্ষমতায়ন, উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়া, বিদ্যুত্ খাতে ব্যাপক সাফল্য প্রভৃতি বিষয় গানে স্থান পেয়েছে। এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতাকে ধরে রাখতে শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় আনার জন্য দেশবাসীর কাছে ভোট প্রার্থনা করা হচ্ছে। নৌকা প্রতীকের পোস্টারেও ছেয়ে গেছে ঢাকার অলিগলিসহ সব জায়গা।
সচেতন ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের ভোটে মানুষের উত্সাহ-উদ্দীপনা বেশি। কারণ এবার সব দলই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এ জন্য সব দলের মানুষের মুখে শুধু ভোটের আলাপই হচ্ছে। ভোট কাকে দেবেন এবং কেন দেবেন-এমন বিচারশক্তি এখন বাংলাদেশের সব মানুষের মধ্যেই চলে এসেছে। তাই এবারের ভোটে কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ মানুষটিও নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। কোথাও কোথাও কোনো কোনো দল নিয়ে বিরূপ মন্তব্যও করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ প্রাধান্য পাচ্ছে নৌকার প্রচারণায়: আওয়ামী লীগের প্রচার অভিযানে বলা হচ্ছে, একমাত্র নৌকাই দেবে উন্নয়ন। এক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে প্রাধান্য পাচ্ছে বিশ্বজুড়ে নতুন উচ্চতায় থাকা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশাল ইমেজ। সব ধরনের নির্বাচনী ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টারসহ ডিজিটাল প্রচারণায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ১০ বছরে দেশের ব্যাপক উন্নয়নের সফলতা তুলে ধরছেন মহাজোটের প্রার্থীরা। বঙ্গবন্ধু কন্যার জীবনাদর্শ, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার গ্রহণযোগ্যতা ও অর্জনের বিষয়গুলো তুলে ধরা হচ্ছে। ‘আমার ভোট আমি দেবো, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দেবো’, ‘তারুণ্যের প্রথম ভোট, স্বাধীনতার সপক্ষে হোক’, ‘রক্তভেজা বাংলায় রাজাকারমুক্ত সংসদ চাই’, ‘অবরোধের নামে পেট্রোল বোমায় পুড়িয়ে মানুষ হত্যাকারীদের প্রত্যাখ্যান করুন’, ‘সমৃদ্ধির বাংলাদেশ গড়তে শেখ হাসিনার বিকল্প নেই’ -এমন শ্লোগান ও লিফলেট ভোটারদের ঘরে-ঘরে পৌঁছে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ।
চলচ্চিত্র অভিনেত্রী অপু বিশ্বাসের পর এবার আওয়ামী লীগের পক্ষে নৌকা মার্কায় ভোট চেয়েছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম নায়ক শাকিব খান। গতকাল এক ভিডিও বার্তায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতি দিয়ে শাকিব বলেন, কবিগুরুর কবিতার মধ্যে খুঁজে পাই আমাদের মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিচয়। তিনি দেশের ১৬ কোটি মানুষকে পরম মমতায় আগলে রেখেছেন। আর তাই তো পুরো পৃথিবীর মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’।
আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচটি ইমাম আগামী নির্বাচনকে ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেননি এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি, ভোট দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে বিজয়ী করতে তাদের জন্য এবার সুবর্ণ সুযোগ।’
ভোটের মাঠে মহাজোট প্রার্থীরা:প্রচণ্ড শীতের মধ্যেও নির্বাচনী প্রচারণায় কোনো কমতি নেই। রাজধানীর ১৫টি আসনে মহাজোটের প্রার্থীরা সকাল থেকে প্রচারণাযুদ্ধে নেমে পড়ছেন। যাচ্ছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। পোস্টার, মিছিল, মাইকিং, গণসংযোগ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা, পথসভাসহ সব ক্ষেত্রেই নৌকার প্রচার চোখে পড়ার মতো। গতকাল সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঢাকা-১০ আসনে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। ঢাকা-১১ আসনে এ কে এম রহমতুল্লাহ এমপি ও ঢাকা-১৩ আসনে সাদেক খানও দিনভর গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। প্রচারের কিছু সময় রিকশায় চড়েও ঘোরেন সাদেক খান। ঢাকা-১৭ আসনে চিত্রনায়ক ফারুক ভাষানটেকে নির্বাচনী প্রচারণা চালান। ঢাকা-৯ আসনে সাবের হোসেন চৌধুরী, ঢাকা-১৪ আসনে আসলামুল হক, ঢাকা-১৮ আসনে সাহারা খাতুনসহ রাজধানীর বিভিন্ন আসনের মহাজোট প্রার্থীরা সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম এবং আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামায়াতের তুলনামূলক কর্মকাণ্ড উপস্থাপন করে নৌকা মার্কার প্রচারণা চালিয়েছেন।
প্রচারণা প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, মহাজোটের প্রার্থীদের পক্ষে এবার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দেশের এত উন্নয়ন করেছেন বলে দেশবাসী নৌকার প্রতি আস্থা রাখছেন। তাই সর্বস্তরের মানুষ এবার আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। সারাদেশে বিজয় মঞ্চে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ করছেন।
প্রসঙ্গত, সম্প্রতি লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট গ্রুপের পর্যবেক্ষণেও বলা হয়েছে, জোয়ার নৌকার পক্ষে এবং ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগই জয় পাবে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ-প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় একটি জরিপের তথ্য উল্লেখ করে বলেছেন, আওয়ামী লীগ এবার ১৬৮ থেকে ২২০টি আসন পাবে।
