আমার জীবন আমার সংগীত

পিয়ানোর সুর বেজে উঠল

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:২৯

পর্ব তিন

 

জানুয়ারি মাস আমাদের সংগীতের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য মাস। এইমাসের ৩১ তারিখ সন্ধ্যা থেকে ১ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টা পর্যন্ত ‘বাংলা খেয়াল উত্সব’ চ্যানেল আই ১৫-১৬ ঘণ্টা ধরে সম্প্রচার করে। দেশ-বিদেশের শ্রোতা-দর্শক এই বাংলা খেয়াল উত্সব ঘরে বসেই টিভিতে দেখতে পারেন, বাংলাভাষায় শিশু-কিশোর, নবীন-প্রবীণ শিল্পীদের পরিবেশনায় উচ্চাঙ্গসংগীত উপভোগ করতে পারেন। আমাদের জাতীয় জীবনে এটা বড়ো পাওয়া, কেননা মাতৃভাষার জন্য আমরা বহু প্রাণ বিসর্জন দিয়েছি। ভাষা, নিজস্বতা রক্ষার জন্য যুদ্ধ করেছি, লক্ষ্য জীবনের বিনিময়ে জয়ী হয়েছি। শেষে ভাষার নামে আমাদের দেশের নাম হয়েছে বাংলাদেশ। তাই ‘বাংলা খেয়াল উত্সব’ আমাদের জাতীয় জীবনে গৌরবদীপ্ত একটি দিন।

আমি যখন অতি অল্প বয়সে বাংলাভাষায় খেয়াল, ধ্রুপদ গাইতে শুরু করি তখন শিল্পী-বোদ্ধারা বলতেন, ‘বাহ রাগপ্রধান ভালোই গাইছ, তবে এটাকে খেয়ালের মতো করে গেয়ো না। বাংলাভাষায় খেয়াল হয় না।’ আমি তাদের সঙ্গে তর্ক করে পারতাম না। বেশি কথা বলতে গেলে ‘চুপ করো’ বলে তাঁরা আমাকে থামিয়ে দিতেন।

আমি কিন্তু সব ধরনেরই গান নিয়মমাফিক শিখেছিলাম, চর্চা করতাম এবং গাইতাম। উচ্চাঙ্গসংগীতের ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরী, দাদরা, কাজরী, রাগাশ্রয়ী, গজল, রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত, বিভিন্ন অঞ্চলের লোকসংগীত, লালনগীতি, কীর্তন, ভজন, মারফতি-মুর্শিদী, হামদ-নাত, এই উপমহাদেশে প্রচলিত প্রায় সকল সংগীতধারা এবং গানেই আমার গুরুমুখী শিক্ষা ছিল। অতি শৈশব থেকেই আমি নিষ্ঠা সহকারে সংগীতের বিভিন্ন ধারায় চর্চার মাধ্যমে নিজেকে তৈরি করেছিলাম। সেই সময় গ্রামবাংলায় যাত্রা-লেটো, কৃষ্ণযাত্রা, সত্যপীরের অনুষ্ঠান, পালা-কীর্তন অনুষ্ঠানে আমি অংশগ্রহণ করতাম। আমার আব্বা এসব সংস্কৃতিকর্মে একাত্ম থাকার কারণে জন্ম থেকেই আমি সাংস্কৃতিক পরিবেশে বড়ো হয়েছি। আব্বা ছাড়াও সকল বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নিষ্ঠাবান গুরুদের কাছে শিক্ষার সুযোগ পেয়েছি। এটাই আমার জীবনের বড়ো সম্পদ।

রেডিও পাকিস্তান, ঢাকা কেন্দ্রে অডিশন দিতে গেলাম। দেখলাম স্টুডিওর বাইরে এক ব্যক্তি উচ্চস্বরে প্রার্থীদের নাম ধরে এক এক করে ডাকছেন। তিনি এতোই জোরে নাম ডাকতেন যে, ঐ ডাক শুনেই অনেকে ভয়ে অডিশন না দিয়ে রেডিও থেকে চলে যেতেন। তাঁরা বলতেন, আরো প্রস্তুত হয়ে পরেরবার অডিশন দেবেন।

১০-১২ বছর বয়সে লেখাপড়া-সংগীত শিক্ষার মাঝে যখন সময় পেতাম, বর্ধমান কোর্টে গিয়ে বিচারের এজলাশে আইনজ্ঞদের যুক্তি-তর্ক শুনতাম। এই বিচার কার্যক্রম দেখার বিষয়ে আমি অতি আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। তখন দেখেছিলাম কোর্টের বাইরের দরজায় দাঁড়িয়ে লাঠি হাতে বিশেষ ধরনের পোশাক পরিহিত একজন লোক কয়েদিদের নাম ধরে ডাকতেন। রেডিও পাকিস্তান, ঢাকায় অডিশনপ্রার্থীদের নাম ধরে ডাকও ঐ কোর্টের কয়েদিদের নাম ডাকার মতো মনে হয়েছিল, সম্ভবত সেই কারণে অডিশনে উচ্চস্বরে নাম ডাকের সময় প্রার্থীরা ভয় পেয়ে যেতেন। আমার কোনো ভয় ছিল না। সংগীতকর্মে আমি সবসময়ই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। মনে পড়ে আমি একবার ভারতে পাবলিক সার্ভিস কমিশনে সিনিয়র লেকচারার হওয়ার জন্য মৌখিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। পরীক্ষায় একজন অতিবৃদ্ধ শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি আমাকে প্রশ্ন করলেন, ‘আপতো কোমল আশাবরি জানতে হোঙ্গে?’ আমি বললাম, জি। তিনি বললেন, ‘দেখাইয়ে।’ যন্ত্র ছাড়াই গাইতে হবে, তাই খালি গলায় আমি কিছুক্ষণ কোমল আশাবরি দেখানোর মাঝেই তিনি বললেন, ‘আপ কিস্ ঢঙ্গসে দেখা রাহেহে?’ আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ‘আপতো কোই খাশ ঢাঙ্গসে দেখানেকে লিয়ে কাহা নাহী হায়, আপতো আশাবরি দেখানেকে লিয়ে কাহা থা। অভি আপ কোমল আশাবরি ধ্রুপদকে ঢংসে দেখানেকে লিয়ে কাঁহেতো ম্যায় ধ্রুপদকে ঢঙ্গসে আলাপ দেখায়েঙ্গে।’ আমি বিনীতভাবে তাঁর প্রশ্নের অসম্পূর্ণতা বুঝিয়ে দিয়েছিলাম। আমার ভুল আমি আলাপ বিস্তার দুই ঢং মিলিয়ে কোমল আশাবরি দেখাচ্ছিলাম। তাঁর ভুল ছিল তিনি কোনো বিশেষ ঢঙে আমাকে রাগটি দেখাতে বলেননি। তা বুঝতে পেরে তিনি বললেন, ‘লাড়কা বড়া আক্কালমান্দ।’ আমি পাশ করেছিলাম।

নিষ্ঠা এবং যথাযথ শিক্ষা সাধনার কারণে সংগীতের সূক্ষ্ম আলংকারিক উপস্থাপনায়ও কখনো ভয়-ভীতি অনুভব করিনি; তাই আমার নামের ডাক শুনেই স্টুডিওর ভেতরে গিয়ে একজন বয়স্ক বেঁটেখাটো যথেষ্ট স্বাস্থ্যবান ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম। তিনি তানপুরা নিয়ে বসে আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন স্কেল! কোন স্কেল!! কোন স্কেল!!! আমিও বললাম সি সার্ফ! তিনি বললেন ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি গান তাড়াতাড়ি গান। আমি বসে সুর ধরলাম। কিন্তু মনে হলো গলা স্পষ্টভাবে শোনা যাচ্ছে না। সমুখে বয়স্ক তবলাবাদক আমার দিকে চেয়ে আছেন। আমি তানপুরা শিল্পীর দিকে চেয়ে জানতে চাইলাম, এটি কি সি সার্ফ? স্কেল ঠিক
আছে? আমার কথা শুনে উনি বিরক্ত হয়ে বললেন, অবশ্যই সি সার্ফ। আমি তখন ঠিক আছে বলে আবার সুর ধরতে চাইলাম। কিন্তু গলায় জোরালো আওয়াজ বেরুচ্ছে না। স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি না। আমি আবার সংকোচিত হয়ে বললাম, এটা সি সার্ফ মনে হচ্ছে না। উনি রাগতভাবে বললেন, এটা পিয়ানোর সি সার্ফ স্কেলে মিলানো আছে। তাঁর ইশারায় মুখ ফিরিয়ে স্টুডিওর ভেতরে দেখলাম কালো রঙের একটি আপরাইট পিয়ানো। আমি তাঁর উদ্দেশে আবারও বললাম, নিশ্চয়ই পিয়ানোটা সুরে নেই, তাই স্কেল ঠিক নেই। তিনি রাগতভাবে আমার দিকে চেয়ে আছেন। সম্ভবত অডিশনপ্রার্থী শিল্পীদের মুখে এ ধরনের কথা শুনতে তারা অভ্যস্থ ছিলেন না। স্টুডিওর কন্ট্রোল রুম থেকে বিচারকের কণ্ঠ ভেসে এলো। রাগত স্বরে তিনি বলেছিলেন, ‘এই কানাই পিয়ানোর সঙ্গে তানপুরাটা চেক করে নাও না?’ তানপুরা শিল্পী একটু বিরক্ত হয়ে তানপুরা নিয়ে উঠলেন। আমিও উঠে পিয়ানোর বি-ফ্ল্যাটে চাপ দিলাম। মুহূর্তেই পিয়ানোর সুর বেজে উঠল। প্রমাণ হয়ে গেল তানপুরাটি বি ফ্ল্যাটের সুরে বাঁধা ছিল। রেকর্ডিং রুম থেকে ইতিমধ্যেই বিচারক আবদুল আহাদ (অনেক পরে পরিচয় জেনেছি) স্টুডিওর ভেতরে এসে বললেন, তোমরা তানপুরা আগে থেকে ঠিকমতো স্কেলে বেঁধে রাখো না কেন? তারপর তিনি আমাকে স্কেল এবং সুরের ধারণার জন্য প্রশংসা করলেন। বললেন, ‘আর গাইতে হবে না।’ আমি আমার গান শোনার জন্য অনুরোধ জানালে তিনি সংক্ষিপ্ত আকারে গাইতে বললেন। আমি নতুনভাবে তানপুরায় সুর বেঁধে মালকোষ ও পুরিয়া রাগে বন্দেশ গেয়েছিলাম। শ্রদ্ধেয় সুরকার সংগীতজ্ঞ আবদুল আহাদের সঙ্গে আগে আমার পরিচয় ছিল না। সেই প্রথম পরিচয়—আমার মনে আজো উজ্জ্বল হয়ে আছে। সেদিন অডিশনের পরে তানপুরা শিল্পী নিজেই আমাকে পরিচয় দিলেন, ‘আমি কানাই লাল শীল।’ আমি তাঁকে বললাম, আপনি তো বিখ্যাত মানুষ। দোতারায় তো আপনার জুড়ি নেই। আপনি আমার শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি। তিনি খুশি হয়ে বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না, আমাদের রেডিওর লাইভ প্রোগ্রামে ব্যস্ত থাকতে হয় বলে একটি অনুষ্ঠান শেষ করে অডিশনে তানপুরা বাজানোর জন্য বসতে হয়েছে। তাড়াহুড়ায় আমি সুর চেক করতে পারিনি। তবে আপনার সুরের জ্ঞান দেখে আমি অবাক হয়েছি, গান শুনে খুব ভালো লেগেছে। সেদিন আমার সঙ্গে তবলায় সঙ্গত করছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ তবলাশিল্পী ওস্তাদ সাখোয়াত্ হোসেন খান। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার গানের অতি উচ্চ প্রশংসা করলেন। পরে ঢাকা রেডিওতে উচ্চাঙ্গসংগীত পরিবেশনে ওস্তাদ সাখোয়াত্ হোসেন, ওস্তাদ মোবারক আলী, ওস্তাদ ফুলঝুরি খান নিয়মিতভাবে আমার খেয়াল গানের সঙ্গে সঙ্গত করতেন। আমার বিষয়ে তাঁদেরও উচ্চ প্রশংসায় আমি বুঝেছিলাম উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রতি তাঁরা কতোটা একাত্ম ছিলেন। রাগ-রাগিণীর শুদ্ধতা, ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরী গানের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উপস্থাপন সম্পর্কে অনেক খ্যাতিমান জ্ঞানীগুণী বলে পরিচিত বিশিষ্ট ব্যক্তিও যে সচেতন ছিলেন না কিংবা তাঁদের জানা ছিল না, এটা সংগীত অনুষ্ঠানে বিভিন্ন বক্তব্যে প্রমাণ হতো। আজ বহুকাল পরেও সেই অবস্থা থেকে খুব একটা সরে আসতে পেরেছি বলে মনে হয় না।

আমাদের জ্ঞানীগুণীদের মূল্যায়নে তাই কলাকে মুলা, চড়ুইকে উটপাখি, বিড়ালকে বাঘ বলে অনেকেই প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। এরকম ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান দলের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে—এটাই আশঙ্কার বিষয়। একই কারণে উচ্চাঙ্গসংগীত শুদ্ধরূপে রাগ রূপায়ণে বিশৃঙ্খলা এবং যথেচ্ছাচার প্রতি মুহূর্তেই প্রকাশিত হচ্ছে। 

এত কিছুর পরেও শৈশবকাল থেকে সংগীত শিক্ষায়, সৃজনশীল কর্মে এবং আমার সংগীতকর্ম বিকাশের প্রধান ক্ষেত্র তখনকার রেডিও এখনকার বেতার এটা আমি সর্বক্ষণ মনে করি। রেডিও পাকিস্তানে আমার প্রথম উচ্চাঙ্গসংগীত অনুষ্ঠানে আমি ভৈরব রাগে বিলম্বিত এবং মধ্যলয়ের হিন্দি খেয়াল গেয়েছিলাম। তবলায় ছিলেন ওস্তাদ সাখোয়াত হোসেন খান, এস্রাজ সঙ্গত করেছিলেন ওস্তাদ ফুলঝুরি খান। গান পরিবেশনের পর সকলেই প্রশংসা করলেন। তখন ঢাকায় সংগীত রসিকদের আগ্রহ বুঝতে পারলাম পরের দিন সকালে। আমি তখন পুরনো ঢাকায় থাকি, আমার বোন জামাই আহমদ আলী, আমার বোন আর তাদের ছেলে শিশু ‘রো’। হঠাত্ সকালে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে রো আগে গিয়ে দরজা খুলে দৌড়ে এসে আমাকে জানায়, ‘মামুজান আমার মতো ছোটো একটি ছেলে খুব তোমাকে চাচ্ছে।’ আমি দরজায় যেতেই এক বয়স্ক ব্যক্তি আমাকে সালাম দিয়ে জানালেন, ‘আপনাকে যেতে হবে।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, কোথায় যেতে হবে। তিনি হাতজোড় করে বললেন, ‘সানজিদা আপা, ওয়াহিদ ভাই আপনাকে দাওয়াত করেছেন আজ সন্ধ্যায় তাদের ওখানে খেতে হবে।’ আমি বললাম, আমি তো চিনি না কোথায় যাব। তিনি বললেন, ‘আমি এসে নিয়ে যাব।’ তিনি সন্ধ্যায় এসে আমাকে নিয়ে গেলেন। গিয়ে দেখি একজন মধ্যবয়স্ক ব্যক্তি খেয়াল গান পরিবেশন করছেন, কয়েকজন বসে শুনছেন, আমি যেতেই গান থেমে গেল। সানজিদা খাতুন, ওয়াহিদুল হক এগিয়ে এসে আমার গানের প্রশংসা করলেন। এক ব্যক্তি চেয়ারে ওখানে বসেছিলেন, তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন—তিনি সংগীত পরিচালক আবদুল আহাদ। তিনিও আমার গানের প্রশংসা করলেন, আমাকে গান গাওয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। আমি তানপুরা বেঁধে গান শুরু করলাম। গান শেষে সকলেই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। আহাদ ভাই বললেন, ‘আপনি মেহেরবানি করে রেডিওতে কাল একবার আমার সাথে দেখা করবেন।’ পরে ঢাকার কাবাব, খিচুরি, বেগুন ভাজা সহকারে আপ্যায়ন। সেইদিন থেকেই সন্জীদা খাতুন ওয়াহিদুল হক, ‘সন্জীদা আপা-ওয়াহিদ ভাই’ হয়ে আপনজন হয়ে গেলেন। তাঁরা আমাকে ছায়ানটে চতুর্থ-পঞ্চম বর্ষের শিক্ষার্থীদের উচ্চাঙ্গ সংগীত শেখানোর জন্য আমন্ত্রণ জানালেন। আমি সানন্দে ছায়ানটের সঙ্গে একাত্ম হয়ে গেলাম।

রেডিওতে গিয়ে আবদুল আহাদ সাহেবের সঙ্গে আমি দেখা করলাম। উনি কিছু না বলেই আমার হাত ধরে রেডিওর আঞ্চলিক পরিচালকের অফিসঘরে নিয়ে গেলেন; আঞ্চলিক পরিচালককে বললেন, এই ছেলেটি আজাদ রহমান খুব গুণী, আমি তার উচ্চাঙ্গসংগীত পরিবেশনা শুনে অবাক হয়েছি, খুবই আকর্ষণীয়ভাবে ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা, ঠুমরী এমনকি তার রচিত বাংলাভাষায় উচ্চাঙ্গসংগীত অতি উচ্চ মানের। আমার জানা মতে, এই বয়সে এত পা িত্য নিয়ে ভালো গান করতে পারেন এমন কাউকে পাওয়া যায় না। আমি কলকাতাতেও এ ধরনের কোনো ব্যক্তিকে দেখিনি, আমাদের রেডিওতে তাঁর পরিচালনায় সপ্তাহে একটি করে উচ্চাঙ্গসংগীতের অনুষ্ঠান প্রচার করলে ভালো কাজ হবে। শুদ্ধভাবে ধ্রুপদ, খেয়াল রেডিওতে প্রচারিত হলে উচ্চাঙ্গসংগীতের প্রসার ঘটবে। পরিচালক সাহেব রাজি হয়ে গেলেন। বললেন, আপনি যখন বলছেন নিশ্চয়ই এটা হতে পারে। আপনি শুরু করার জন্য যা যা প্রয়োজন তা আমাকে জানান। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আমার কাছে জানতে চাইলেন কী লাগবে? আমি বললাম উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী কারো সঙ্গে আমার পরিচয় নাই। কয়েকজন কণ্ঠশিল্পী যদি স্টুডিওতে আসেন তাহলে অনুষ্ঠানে পরিবেশনের জন্য তাঁদের গান তুলে দেব। সেই অনুযায়ী পরের দিন স্টুডিওতে তিনজন নারী কণ্ঠশিল্পীর গান শুনলাম। একজন বয়স্ক মহিলা, তিনি মিঞা মল্লার  রাগে খেয়াল শোনালেন। আমি বললাম, আপনার মিঞা মল্লার ঠিক হচ্ছে না। উনি অতি গম্ভীর হয়ে চুপ করে বসে রইলেন। সিদ্ধান্ত হলো পরের দিন রেডিওতে এসে তাঁরা গান তুলে নেবেন।

পরের দিন আমি স্টুডিওতে ঢুকে দেখি বয়স্ক মহিলা কণ্ঠশিল্পী গম্ভীরভাবে চেয়ারে বসে আছেন, তাঁর পাশে একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি লাঠি হাতে অন্য একটি চেয়ারে বসা। অন্য দুইজন শিল্পী নিচে কার্পেটে বসে আছেন। আমি স্টুডিওর ভেতরে যেতে দরজা খুলে আরো কয়েকজন লোক ভেতরে ঢুকে বৃদ্ধ ব্যক্তিকে আমার দিকে ইশারা করে আমাকে দেখাতে লাগলেন। বৃদ্ধ হঠাত্ উঠে দাঁড়িয়ে রাগত স্বরে বলতে শুরু করলেন, ‘এ লাড়কা তুম হামারা সাগরেদ কো গালদ্ কাহা?’ আমি বললাম, ‘জি-আ..প?’ অন্যরা আমাকে বললেন, ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ, ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ। আমি সালাম দিলাম। উনিও বললেন, ‘সালাম’, আবারও বললেন, ‘কিঁউ গলদ কাহা হৈ?’ আমি বললাম, ‘ও গলদ গাতি হৈ।’ উনি আরো রেগে গেলেন। বললেন, ‘তুম গা কর দেখা সকতে হো?’ আমি বললাম, ‘জরুর’, উনি চিত্কার করে বললেন, ‘দেখাও।’

আমি কিছু না বলে কার্পেটে বসে তানপুরায় সুর বেঁধে মিঞা মল্লার শুরু করলাম। আমি বললাম মা রে পা, জ্ঞা মা রা সা, ণ্া ধ্া ন্া সা...এইভাবে না গিয়ে সা রা মা পা না র্সা বললে সেটা মিঞা মল্লার না হয়ে বিন্দাবনি সারং রাগ হয়ে যাবে। আমি গেয়ে বলে বলে স্বর বিস্তার দেখালাম। উনি অবাক হয়ে চেয়েছিলেন। উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন। হাত থেকে লাঠি খসে পড়ে গেল। আমার হাত ধরে উঠিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে কোলাকুলি করলেন। বলতে থাকলেন, ‘ইয়ে লাড়কা বড়া কাবিল লাড়কা হ্যায়, ইয়ে তো ঠিকহি ক্যাহ্ রাহা হ্যায় বেটা তুম সাহি কাহা হ্যায়, মিঞা মল্লার কা রূপ ঠিক ঠিকসে দেখায়া হ্যায়, ইয়ে হামারা বেটা হৈ।’ সেই থেকে ওস্তাদ গুল মোহাম্মদ খানের আমি বেটা হয়ে গেলাম। সেই সূত্রে আমার থেকে ওস্তাদ ইয়াসিন খানের বয়স বেশি হলেও সে আমার ছোটো ভাই হয়ে গেল। ইতিমধ্যে জনাব আবদুল আহাদ এভাবেই আমার বড়ো ভাইয়ের মতো হয়ে গেছেন।