শিশুদের বন্ধু দাদুভাই

আপডেট : ০৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৯:৩০

হাসিতে হাসিতে পা রেখেছেন চুরাশিতে। এখনো হাসছেন, হাসাচ্ছেন; লিখছেন, লিখাচ্ছেন...। সময়ের হিসাবে তাঁকে বুড়োই বলতে হয়। কিন্তু চোখ যে ‘টগবগে যুবক’ ছাড়া আর কোনো শব্দই তাঁর সম্পর্কে মানতে নারাজ! তিনি হলেন ‘ছড়ার লাট’ রফিকুল হক দাদুভাই। ছড়াকার আহমাদ উল্লাহ ছন্দের তুলিতে দাদুভাইকে এঁকেছেন এভাবে—‘হাত নাড়িয়ে ছন্দ বানান/মুখে মুখে কাটেন,/ দীর্ঘ দিবস ছড়ার রাজ্যে/বুক ফুলিয়ে হাঁটেন।/ রফিক তিনি বন্ধু সবার/জুঁই চামেলি রক্ত-জবার,/মানতে যদি না চান তবে/পুথি-পত্তর ঘাঁটেন।’

গেল ৮ জানুয়ারি ছিল দাদুভাইয়ের ৮৪তম জন্মদিন। ‘বয়স বাড়ে’ বা ‘বার্ধক্য’ শব্দগুলো জীবন থেকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘আমি আর বুড়ো হবো না।’ জানতে চাইলাম ‘কেন’? বললেন, ‘বুড়ো হওয়ার বয়স পার হয়ে গেছে তাই। হাঃ হাঃ হাঃ...।’

১৯৩৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের কুচবিহারে জন্ম হলেও দাদুভাই বেড়ে উঠেছেন এপার বাংলার রংপুরে। বাপ-দাদারা ছিলেন সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার। বাবা ছিলেন ফারসি ও আরবি ভাষার পণ্ডিত। খুব অল্প বয়স থেকেই জানার দারুণ আগ্রহ ছিল। শৈশবের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে দাদুভাই বলেন, ‘এই যে আজকের রফিকুল হক দাদুভাই বিখ্যাত সাংবাদিক ও সাহিত্যিক, এটা বোধহয় আমার রক্তেই ছিল। কিংবা বলা যায়, জন্মসূত্রেই সাংবাদিক হওয়ার গুণ অর্জন করেছি আমি।’ এর কারণ তিনি এভাবে ব্যাখ্যা করেন, ‘শিশু মানেই অতিরিক্ত এবং উদ্ভট সব প্রশ্ন করে। কিন্তু আমি ‘অতি বেশি অতিরিক্ত’ প্রশ্ন করতাম। অতি উদ্ভট প্রশ্ন তো বটেই। যেমন বাবাকে বলতাম, বাবা এটা কী? বাবা বলতেন—গাছ বা পাখি। এটা খায় কী? থাকে কোথায়? এর বাবা-মা কী করে? নানুবাড়ি কোথায়? দাদা-দাদু কী করে—এমন হাজারো বিরক্তিকর প্রশ্ন করতাম। বাবা শিশু মানস বুঝতেন। তাই কখনোই বিরক্ত হতেন না।’

দাদুভাই বলেন, ‘আক্ষরিক অর্থেই আমাদের শৈশব ছিল দুরন্ত। মাঠে-ঘাটে ছুটোছুটি, নদী-খেতে লুটোপুটি, বাড়িতে না বলে অনেক দূরে মাছ মারতে যাওয়া এবং গ্রামীণ খেলায় মেতে থেকে আমরা বড়ো হয়েছি। আমাদের প্রজাদের সঙ্গে মেশার সুযোগ হয়েছে খুব বেশি। মানুষের সঙ্গে মেশার কারণেই মানুষ নিয়ে ভাবার এবং মানুষ নিয়ে কাজ করার একটি দরদে ভেজা হূদয় পেয়েছি।’

‘ভূত দেখেছেন কখনো?’ প্রশ্ন শুনেই হো হো করে হেসে উঠলেন দাদুভাই। বললেন, ‘ভূত আর কী দেখব, আমি নিজেই তো ভূত। ছোটবেলায় বহু মানুষকে নানানভাবে ভূতের ভয় দেখাতাম। কখনো গভীর রাতে গাছে উঠে মানুষকে ঢিল মেরে নাকি সুরে কথা বলে, আবার কখনো গ্রামীণ রাস্তায় সাদা কাপড় মুড়ো দিয়ে লাশ সেজে পথচারীদের ভয় দেখাতাম। মানুষ যখন ভূত! ভূত! বলে চেঁচিয়ে উঠত, আমিও তাদের সঙ্গে ওই ভূত! কই ভূত! বলে চিল্লিয়ে উঠতাম...।’

‘‘দাদুভাই’ নামের গল্পটি জানতে চাই।’

‘‘দাদুভাই’ নামটি ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরের রোকনুজ্জামান খান দাদাভাইয়ের দেওয়া। দাদাভাই তখন কচি-কাঁচার আসরের সম্পাদক। হঠাত্ ইত্তেফাক বন্ধ হয়ে গেলে দৈনিক পূর্বদেশের শিশুপাতার সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। এখানে তিনি দাদুভাই নামে কাজ শুরু করেন। ইত্তেফাক আবার শুরু হলে তিনি সেখানে ফিরে যান। আর আমি দাদুভাই নামে শিশুপাতা ‘চাঁদের হাট’ সম্পাদনা শুরু করি। আজো আমি দাদুভাই নামেই বেঁচে আছি এবং মানুষের হূদয়ে বেঁচে থাকতে চাই।’

দাদুভাই একজন শিশু সংগঠকও। এ সময়ের শিশু অর্থাত্ তোমাদের প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘আজকের শিশুরা আনন্দময় শৈশব থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত। বাবা-মা এবং স্কুলের চাপে শিশুরা শিশুর মতো বেড়ে উঠতে পারছে না। এটা দেশ-জাতি এবং ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য মারাত্মক হুমকি।’

পাশাপাশি দাদুভাই এও বলেছেন, ‘ছোট্ট বন্ধুরা, তোমরা মোবাইল-ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকো। এগুলো তোমাদের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনবে। বেশি বেশি বাইরে খেলাধুলা করো। বেড়াও। দৌড়াও। মানুষের সঙ্গে মেশো। আর অনেক বেশি পড়ো! পড়ো! এবং পড়ো! আমাদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআন শুরুই হয়েছে ইকরা মানে পড়ো শব্দ দিয়ে। তাই জীবনে বড়ো হতে চাইলে, ভালো কিছু করতে চাইলে পড়ার কোনো বিকল্প নেই।’

রফিকুল হক দাদুভাই [৮ জানুয়ারি ১৯৩৭]